কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে একটি মাদরাসা ও হিফজখানার ওপর পাহাড়ধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির অবসান ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানায়, যা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য যাচাই শেষে চূড়ান্তভাবে নিহতের সংখ্যা ৫ জন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৫-এর ব্লক এ-৩ এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদরাসা ও হিফজখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুর রউফ খবরের কাগজকে বলেন, “দুর্ঘটনার পর আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সে সময় বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য পেয়েছিলাম এবং সেটিই সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এ ঘটনায় চূড়ান্তভাবে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের সংখ্যাটি সংশোধন করে এ তথ্যই সঠিক হিসেবে গণ্য করতে হবে।”
নিহতরা হলেন, ক্যাম্প-৩-এর জি/৮৩ ব্লকের বাসিন্দা শাহিদা (১৩), ক্যাম্প-৩-এর এফ/১ ব্লকের বাসিন্দা উম্মে নেজাতুল (১৩) ও উম্মে সালমা (১২), ক্যাম্প-৫-এর এ/৮ ব্লকের বাসিন্দা ওমাইচা বিবি (১৩) এবং ক্যাম্প-৫-এর এ/১১ ব্লকের বাসিন্দা রাশিদা (১৬)।
আহতরা হলেন, ক্যাম্প-৩-এর এফ/৭৫ ব্লকের বাসিন্দা আসরা (৯), ক্যাম্প-৩-এর এফ/১ ব্লকের বাসিন্দা বেগম জান (১৫), ক্যাম্প-৫-এর এ/৭ ব্লকের বাসিন্দা ফারেসা বিবি (১২), ক্যাম্প-৩-এর জি/৮৩ ব্লকের বাসিন্দা জান্নাত আরা বিবি (৮), ক্যাম্প-৩-এর এফ/৬৬ ব্লকের বাসিন্দা নূর ফাতেমা (১০), ক্যাম্প-৫-এর এ/২ ব্লকের বাসিন্দা নুর সেহেরা (১২), ক্যাম্প-৫-এর এ/২ ব্লকের বাসিন্দা আব্দুল মোনাফ (১৭) এবং ক্যাম্প-৩-এর এফ/৭৫ ব্লকের বাসিন্দা নূর কায়েস (১০)।
১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (১৪ এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মৃত্যুঞ্জয় দে সজল বলেন, দুর্ঘটনার সময় মাদরাসায় শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল। পাহাড়ধসে হতাহতদের সবাই শিক্ষার্থী। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং ঘটনার সার্বিক বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ডলার ত্রিপুরা জানান, পাহাড়ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় রোহিঙ্গা যুবক মো. ইদ্রিস জানান, দুর্ঘটনার সময় মাদরাসায় ৩০ থেকে ৫০ জনের বেশি ছাত্রী কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে ভবনের ওপর পড়ে গেলে কয়েকজন ছাত্রী বেরিয়ে আসতে পারলেও অনেকে কাদা ও মাটির নিচে চাপা পড়ে।
তরুণ রোহিঙ্গা ফটোগ্রাফার ইয়াসিন আব্দু মোনাব বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক ও উদ্ধারকারী দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে দীর্ঘ সময় অভিযান চালানো হয়।
এর আগে গত রবিবার রাতে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক তিনটি পাহাড়ধসের ঘটনায় ৮ রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছিল।
কক্সবাজারে গত চার দিনে ভারী বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, বন্যা পরিস্থিতি এবং পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে মোট ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা এবং ৪ জন স্থানীয় নাগরিক।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেলে কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত চার দিনের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, রবিবার ২৪০ মিলিমিটার, সোমবার ১২৯ মিলিমিটার, মঙ্গলবার ৬৯ মিলিমিটার এবং বুধবার সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আরও ৯২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চার দিনে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩০ মিলিমিটার।
তিনি বলেন, “আরও ২ থেকে ৩ দিন পর্যন্ত ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।”
তারেকুর রহমান/নাঈম