টানা কয়েকদিনের মুষলধারে বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়ায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি তীব্র গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা অতিক্রম করায় উপজেলার অন্তত ৬০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে চকরিয়ার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, আমনের বীজতলা ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট।
বুধবার (৮ জুলাই) সকালের দিকে পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৫ দশমিক ৩ মিটার, যা বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। তবে দুপুরের পর বৃষ্টি ও ঢলের তীব্রতা বাড়ায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, মাতামুহুরী নদীর চিরিংগা সেতু পয়েন্টে পানির বিপৎসীমা ৫ দশমিক ৮ মিটার।
এদিকে, মাতামুহুরীর উজানে বান্দরবানের লামা শহর পয়েন্টে নদীর পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজান থেকে নেমে আসা এই বিপুল পরিমাণ ঢলের পানি চকরিয়া হয়ে বঙ্গোপসাগরে নামার পথে তীব্র স্রোতের সৃষ্টি করেছে, যা চকরিয়ার বন্যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত দেড় দশকে চকরিয়ায় এমন ভয়াবহ ও টানা বৃষ্টিপাত দেখা যায়নি। হঠাৎ ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে নিমিষেই তলিয়ে গেছে জনপদ।
কৈয়ারবিল ইউনিয়নের বাসিন্দা সাজ্জাদ হোছাইন বলেন,গত ১৫ বছরে এই রকম টানা ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢল আমরা দেখিনি। ইউনিয়নের সিংহভাগ এলাকা এখন পানির নিচে। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে চকরিয়াবাসী চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
একই ধরনের তথ্য দিয়ে কাকারা ইউনিয়নের মাঝেরফাঁড়ি গ্রামের বাসিন্দা রশিদুল আমিন জানান, ভোর ৫টা থেকেই চকরিয়ায় বিরতিহীন বৃষ্টি হচ্ছে। সরকারি হিসাবের চেয়েও বাস্তব ক্ষেত্রে নদীর পানি অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লোকালয় ও ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ছে।
উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢলের পানিতে চকরিয়ার বরইতলী, ফাঁসিয়াখালী, কৈয়ারবিল, কাকারা, লক্ষ্যারচর, সুরাজপুর-মানিকপুর, হারাবং, খুটাখালী, চিরিংগা, ডুলাহাজারা এবং মাতামুহুরী সাংগঠনিক উপজেলার সাহারবিল, পূর্ব বড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, ভেওলা মানিকচর, পশ্চিম ভেওলা ও বদরখালী ইউনিয়নসহ অন্তত ৬০টি গ্রাম এখন প্লাবিত। পানি বৃদ্ধির কারণে বেশ কিছু গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দুর্গতদের সহায়তায় চকরিয়া উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার দৈনিক খবরের কাগজকে বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে মাতামুহুরী নদীতে পানি বাড়ছে এবং প্রতি মুহূর্তেই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। আমরা প্রতিটি ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, মাতামুহুরী নদীর ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের অংশগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেড়িবাঁধের কোনো অংশ যাতে ভেঙে না যায়, সে জন্য পাউবোর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
রাজু দাশ/এসএন