বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বৈরি আবহাওয়া, টানা বৃষ্টিপাত এবং উত্তাল নদ-নদীর প্রভাবে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জনজীবন এখনও স্বাভাবিক হয়নি। কয়েকদিন ধরে হাতিয়া-মূল ভূখণ্ড নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় প্রায় আট লাখ মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী এবং দিনমজুররা।
হাতিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাজুড়ে বৈরি আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে। টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল- চরঘাসিয়া, ঢালচর, জাঙ্গলার চর ও নিঝুমদ্বীপের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
এছাড়া সুখচর ইউনিয়ন ও চরইশ্বর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় বেড়িবাঁধ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
যদিও কিছু ট্রলার ও সি-ট্রাক সীমিত আকারে চলাচল করছে, তবে ফেরি বন্ধ থাকায় ভারী যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স ও সাধারণ যাত্রীদের চলাচলে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নলচিরা, চেয়ারম্যানঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে শতাধিক যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন আটকা পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় কাজে মূল ভূখণ্ডে যেতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
টানা বৃষ্টির কারণে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি জমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় ছোট যানবাহন চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে খাল দখল ও অপরিকল্পিত ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। কয়েকদিন ধরে কাজ না থাকায় অনেক পরিবারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নলচিরা ইউনিয়নের দিনমজুর সৌরাভ হোসেন বলেন, প্রতিদিন কাজ করলে তবেই পরিবারের জন্য খাবার কিনতে পারি। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি আর ফেরি বন্ধ থাকায় কোনো কাজ নেই। এখন সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়ে গেছে।
সোনাদিয়া ইউনিয়নের পূর্ব চরচেঙ্গা গ্রামের নির্মাণশ্রমিক মো. আমির হোসেন বলেন, মূল ভূখণ্ডে কাজ করতে যাওয়ার কথা ছিল। ফেরি বন্ধ থাকায় যেতে পারিনি। কয়েকদিন ধরে ঘরে বসে আছি। হাতে কোনো আয় নেই, অথচ সংসারের খরচ থেমে নেই।
জাহাজমারা ইউনিয়নের দিনমজুর জাকের হোসেন বলেন, “আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের একদিন কাজ না থাকলেই সমস্যা হয়। কয়েকদিন ধরে আয় বন্ধ থাকায় ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে। দ্রুত ফেরি চালু হলে আমরা আবার কাজে ফিরতে পারব।
বৈরি আবহাওয়ার কারণে সাগরে মাছ ধরা কার্যক্রমও প্রায় বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে অধিকাংশ জেলে ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছেন। ফলে স্থানীয় মৎস্য খাতেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং বাজারে মাছের সরবরাহেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
নলচিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, আবহাওয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। এখন দ্রুত ফেরি চলাচল চালু করা প্রয়োজন। তা না হলে দ্বীপবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন,আবহাওয়া ও নৌপথ নিরাপদ হলেই ফেরি চলাচল পুনরায় শুরু করা হবে। একই সঙ্গে বৈরি আবহাওয়া চলাকালে অপ্রয়োজনে নৌপথে চলাচল না করার জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
হানিফ উদ্দিন সাকিব/এসএন