
একজন বিশিষ্ট পত্রলেখক সম্প্রতি এই কাগজের পাতায় বিভিন্ন ভরাট ও দখল করা খাল পুনরুদ্ধার করার নানা উপকারিতা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ঢাকা শহরে, মরহুম স্থপতি মোবাশ্বির হাসানের মতে, খালের সংখ্যা ছিল ১৭৩। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টার মতেও কমবেশি এ সংখ্যা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে উল্লিখ করা হয়েছে। শহরের যেসব স্থানে, ধরা যাক ১৯৭০ সাল থেকেই এসব খাল বিদ্যমান ছিল, সেসব স্থানে এগুলোর কাজ ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং আশপাশের বিভিন্ন জনবসতিতে পতিত বৃষ্টির পানি পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে মূলত বুড়িগঙ্গা নদীতে পৌঁছে দেওয়া। ফলে শহরের কোথাও কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। এ ছাড়া খালের পাশে সবুজ বনানী, অবকাশ যাপনের জন্য পার্ক এবং খালের পানিতে নানাবিধ দেশজ মাছ ও অন্যান্য জলজপ্রাণী বিচরণ করে নগরে তাপ, অক্সিজেন, ছায়া ইত্যাদির চমৎকার ভারসাম্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ করত।
বছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শহরের চারদিকের বিভিন্ন জেলা থেকে জীবন ও জীবিকা যাপনের লক্ষ্যে আরও মানুষ প্রবেশের ফলে খালগুলোর একাংশ ক্রমে ভরাট হয়ে পড়ে। আরেক বৃহৎ অংশ পূর্ণ হয় এই বর্ধিত জনসংখ্যার উৎপাদিত গৃহস্থালি ও অন্যান্য শক্ত বর্জ্য ফেলার কারণে। তার পরও কোনো কোনো খালের মধ্যাংশে ক্ষীণকায়া পানির স্রোত বহন করে তাদের পূর্ব স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করে চলছিল। শহরের জনসংখ্যা ৩৫ লাখ থেকে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ ৩ কোটি ২৬ লাখে উন্নীত হওয়ায় এসব খালবিলের ভগ্নাবশেষও আর তাদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারেনি। সর্বত্রই হয়েছে নির্মাণকাজ। ইট, পাথর, সিমেন্ট, রড, লোহা, প্লাস্টিক, রাবার, পলিথিন ইত্যাদির মহাসম্মেলনে এসব খালকে পূর্ণ আবৃত করে প্রথমত নানা ধরনের ভবন তৈরি হয়। চাহিদার কারণে রিহ্যাব কোম্পানির শুভাগমনের পর, আগে যে স্থানে এক বা দোতলা বাড়িতে ১০ জন মানুষ বসবাস করতেন সেখানে আকাশচুম্বী ২৬, ৩২, ৪০ এমনকি ৫২ তলা ইমারত, টাওয়ার ও ভবন নির্মিত হয়েছে। সেখানে বসবাস করছেন এই ৩ কোটি ২৬ লাখ মানুষের একটি বৃহৎ অংশ। সেখানে সংযুক্ত হয়েছে পয়ো, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অন্তর্জালের বিশাল বিশাল টাওয়ার। অল্প স্থানে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সংস্থাপন হওয়ার ফলে কাঁচা মাটি, অনাবৃত স্থানের মতো কোনো কিছু আর অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগও খুব ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তেমনি বিপুল জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম আয়তনের ড্রেন তৈরি করতে হয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত স্থান ছিল না। সেখানে স্তূপীকৃত বর্জ্য আর নড়ছে না। তেমনি বৃষ্টির পানিও না সরতে পারার ফলে আধা ঘণ্টার বারিপাতেই সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধপূর্ণ জলাবদ্ধতা। পয়োবর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং চিকিৎসাবর্জ্য একসঙ্গে মিলিত হয়ে তরল ও ঘনীভূত স্রোত এমনকি নিউমার্কেটের মতো চমৎকার এলাকাটিতেও বুকপর্যন্ত উঠে আসছে। নগরবিদ ও স্থপতিদের মতে, ভরাট খালগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে হবে।
প্রথমত, প্রত্যেক মালিক তাদের মালিকানা আইনত প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতিতে নিজ নামীয় খারিজ খতিয়ান ও দলিল রেজিস্ট্রির মতো একান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাগজ সরকারের সংশ্লিষ্ট কার্যালয় অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে জারি করেছেন। এ ছাড়া অনেকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। উত্তরাধিকারীর নামে এই সম্পত্তির বা এর অংশবিশেষ হস্তান্তর করেছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগের সমুদয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। ভূমি কর, পৌর কর এবং আয়কর পরিশোধের পদ্ধতিতে এই সম্পত্তির নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু এই খালের ওপর প্রতিষ্ঠিত সম্পত্তিগুলোকে অবৈধ প্রমাণ করে উৎখাত করা ছাড়া খালটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত গন্তব্য হচ্ছে এই ভূমিকে সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানে প্রত্যাবর্তন করানো। যার অর্থ একটি রিসেট বাটনে চাপ দিতে হবে। যার মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি, খারিজা পর্চা, কর পরিশোধ–এই তিনটি মৌলিক প্রক্রিয়াকে আইনত অকার্যকর করতে হবে। দেশে গড়ে ১১টি শুনানি ছাড়া কোনো ভূমির সেটেলমেন্ট স্থির করা যায় না। এ ছাড়া দখল করা খালের ওপর কারখানা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মোটরগাড়ির কারখানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, দরগাহ, সিনেমা হল, ক্লাব, বিপণিবিতান ইত্যাদিও রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ করে ধর্মীয় সহানুভূতিসম্পন্ন স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করতে হবে, যা ওয়াকফ আইনের পরিপন্থি। এমনিতে সাধারণভাবে ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত বৈধতা বা অবৈধতা আদালতে প্রমাণ করতে এমনকি ৩২ বছর পর্যন্ত সময় লাগে।
কথা হলো ১৭৩টি খালের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বেআইনি দখল, নির্মাণ ও হস্তান্তর-সংক্রান্ত কাজগুলো অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করতে কত বছর সময় লাগবে? তা বিবেচ্য। ক্রেতাদের মধ্যে আইনপ্রণেতা, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী এবং সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালীও রয়েছেন। রয়েছেন রেজিস্ট্রেশন ও ভূমি অফিসের পদস্থ ব্যক্তিরা। তাদের উপস্থিতিতে কোনো কর্তৃপক্ষ এই কর্মসম্পাদন করতে পারবেন কি না, তা বিবেচ্য। এক নম্বর খাস খতিয়ানকে ব্যক্তিগত ভূমি হিসেবে প্রথমত যারা বিক্রি করেছেন সময়ের দীর্ঘ পরিসরে তারা অনেকে মৃত, অনেকে বিদেশে বসবাসরত। অন্যদিকে ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সিংহভাগ অবসরে গেছেন। তাদেরও শনাক্ত করা একটি তুঘলকি কারবার হবে। আর রাজউকের যেসব কর্মকর্তা এসব নির্মাণের নকশা ও পরিকল্পনা অনুমোদন এবং নির্মাণ তদারকি করেছেন তাদের অধিকাংশই হয় মৃত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত। অথচ দায়ী প্রত্যেকেই। অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রের কোয়ারসিভ বা বলপ্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এদের উৎখাত করতে গেলে কিংবা আদালতে মামলা করলে হাইকোর্টের একটি বাধার সম্মুখীন হতে হবে। যাতে বলা আছে দখল করা ভূমির প্রকৃতি যাই হোক উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কাউকে তার দখল করা স্থান থেকে উৎখাত করা যাবে না। কাজেই জলাবদ্ধতা, ছায়া, গাছপালা, তথা সুন্দর পরিবেশের চেয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।
খাল পুনরুদ্ধার করতে হলে খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় সমাহিত যে মাটিসহ বিভিন্ন বর্জ্য রয়েছে সেগুলো খনন করতে হবে। এগুলো এবং বহুতল স্থাপনাগুলো ভেঙে অপসারণ করতে হবে। এই বর্জ্য এবং ভগ্নাবশেষ রাখার শূন্যস্থান কোথায় আছে তাও নির্ণয় করতে হবে। ১৭৩টি খাল থেকে খনন করা এবং প্রাপ্ত এই বর্জ্যের আয়তন কয়েক লাখ ঘনফুট হবে। এই খরচ এবং শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? আবার সময়ের দীর্ঘ পরিসরে হস্তান্তর, বিক্রয় ইত্যাদি সূত্রে যে উত্তরাধিকারীদের উত্থান হয়েছে তাদের দাবি বা প্রমাণ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ এবং নতুন করে বসবাসের জমি দিতে হবে। আমাদের বাজেট প্রতি বছরই ডেফিসিট। সামান্য ৫ কাঠা, ১০ কাঠা, হুকুম দখল করা জমির ক্ষতিপূরণ মামলা নিষ্পত্তি করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সেগুলোর ক্ষতিপূরণ দিতে গড়ে ১০-১২ বছর লাগে। যেমন কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েক হাজার পরিবারের দখল করা ভূমির ক্ষতিপূরণ ৬৭ বছরেও পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে দিতে পারেনি।
খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি যেহেতু পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে করা প্রয়োজন, সে প্রসঙ্গে অগ্রগতি তো দূরের কথা ১৯৭২ সাল থেকে তাতে অধোগতি হয়েছে। সর্বশেষ পরিবেশ উপদেষ্টাকে এ বিষয় জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি জলাশয়ও উদ্ধার করতে না পারলেও অন্তত এ-সংক্রান্ত কিছু নীতিমালা দিয়ে গেছেন। এই কথাটি একান্ত অসত্য, কারণ ভূমি-সংক্রান্ত যেকোনো নীতিমালা আসলে দিয়ে গেছেন ব্রিটিশ শাসকরা। তারা ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভের (সিএস) মাধ্যমে জমিকে নালা জমি, চালা জমি, বসতভিটা ও পুকুর এবং ওয়াকফ ইত্যাদি শ্রেণিতে ভাগ করে গেছেন। আমরা জনসংখ্যার প্রচণ্ড চাপে সেই সিএস খতিয়ানকে লঙ্ঘন কর জমির যেকোনো শ্রেণির ওপর বসতবাড়ি ও ভবন নির্মাণ করার অনুমতি দিয়েছি। ফলে জলাশয়, পুকুর ও বনভূমি বলে কোনো কিছু আর প্রায় অবশিষ্ট নেই বলেই এই খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। কাজেই নতুন করে কোনো নীতিমালা দেওয়ার আবশ্যকতা নেই। সেই ব্রিটিশদের প্রণীত সিএস খতিয়ান অনুসরণ করাই একমাত্র সমাধান এবং তা করতে হলে এক সন্তানবিশিষ্ট পরিবার গঠন করে জনসংখ্যা জরুরিভাবে হ্রাস করার পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা শহরের খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তেমন একটা সফলতার মুখ দেখবে না।
লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]


