এ দেশ কি মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে রক্ষা করবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন। একটা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ না থাকা। আমাদের শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ ছিল–এই বেদনা জাগিয়ে তিনি চলে গেলেন। সমাজকে প্রশ্ন করার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেলেন, সেটাই আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে।...

নিঃশব্দে চলে গেলেন প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক। সারাজীবন সরব ছিলেন প্রতিটি প্রশ্নে, ব্যাখ্যা করেছেন, নিজের মতো তুলে ধরেছেন, ভাবিয়েছেন চারপাশের মানুষকে। আর শোনা যাবে না তার বেদনা আর বিষাদে মেশানো কণ্ঠস্বর। তার বেদনা শ্রোতাদের হতাশ করত না বরং ভাবিয়ে তুলত, জাগিয়ে রাখত এবং এই প্রত্যয় তৈরি করত যে, বেদনার কারণগুলো দূর করতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা একাডেমিতে, টিএসসিতে, জাদুঘরে কিংবা প্রকাশ্য সভায় আর কখনো আমরা শুনব না ইতিহাস ও রাজনীতির বিশ্লেষণ, তীব্র সমালোচনা আর ভবিষ্যতের আশাবাদ মেশানো তার অনবদ্য আলোচনা। তার হার না মানা জীবন ছিল আমাদের অনেকের কাছে সাহসের দৃষ্টান্ত। কণ্ঠস্বরের তীব্রতার চাইতেও যুক্তির শক্তি যে প্রবল ছাপ ফেলে তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। ক্লাসে এবং আলোচনাসভায় যারা তার কথা শুনেছেন তারাই স্বীকার করবেন যে, তার যুক্তিধারা প্রভাবিত করেছে তার ছাত্র ও শ্রোতাদের।
সংখ্যার হিসাবে তার বয়স ছিল ৮৫ বছর। কিন্তু কর্তব্যবোধ দ্বারা তাড়িত মানুষের কাছে বয়স কেবলমাত্র সংখ্যা। মানুষের জীবন তাদের কাছে দেওয়া এবং নেওয়ার সংযোগ সেতু। সমাজের কাছ থেকে নিয়ে যে জীবন গড়ে ওঠে, বিকশিত হয় সেই জীবনকেই আবার ব্যয় করতে হয় সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে। ফলে সমাজের কাছে দায়বদ্ধ মানুষের তো বয়স হিসাব করার সময় থাকে না বরং কতটা কাজ বাকি আছে, কতটা পথ আরও চলতে হবে সেই ভাবনা তাদের অনুক্ষণ তাড়া করে। তাদের জীবনে কি ব্যর্থতা আসে না? ব্যর্থ হয়ে মুষড়ে পড়া নয় বরং কারণ খুঁজে তা জেনে পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে দেওয়া তারা কর্তব্য মনে করেন। তাদের কাছে হতাশা এক ধরনের মধ্যবিত্তসুলভ বিলাসিতা। সে কারণেই হতাশার কাছে পরাস্ত হওয়া নয়, হতাশাকে পরাজিত করার দৃঢ়তা ছিল তার জীবনব্যাপী।
হতাশ হওয়ার মতো ঘটনা কি তার জীবনে আসেনি? কিন্তু এ ব্যাপারে তার চিন্তা ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতিতে অনেকে হতাশ হতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে মানবজাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, মানুষ অনেক সময়ই সংকটে পড়ে। আবার সেই সংকট অতিক্রম করে ভালো অবস্থানে যাওয়ার জন্য প্রথমে কিছু মানুষ চেষ্টা শুরু করে। পরে বহু মানুষ তাতে যুক্ত হয়। সংকটও কেটে যায়। কিন্তু জীবনধারার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক সংকট কেটে গেলে আরেক সংকট সামনে আসে। সমস্যার সমাধান করে যাওয়াই মানুষের কাজ।’ সমস্যা আসবে এবং সমাধানের পথও বের করতে হবে। সমাজের অভ্যন্তরের এই শক্তিতেই তো সমাজ এগিয়ে চলে। কোনো নির্দিষ্ট দলের সদস্য না হলেও তিনি মার্কসবাদী–এই চিন্তা দ্বারাই সমাজ ও জীবনকে বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থনীতি সমাজের ভিত্তি, তার ওপর গড়ে ওঠে রাজনীতি, সংস্কৃতি, একটা অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা। সমাজ যেমন পরিবর্তিত হয়, জীবনও তেমনি এগিয়ে চলে আর সংস্কৃতিরও থাকে গতিময়তা। ফলে শিকড়বিহীন হওয়া নয়, আবার কোথাও আটকে থাকারও বিরোধীও ছিলেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘সংস্কৃতি তো একটা বিমূর্ত ধারণা। ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, জাতিতে-জাতিতে এই ধারণার ভিন্নতা আছে। ব্যক্তি ও জাতির পুরো কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। অনেকে গান-নাচ-নাটক-বিনোদন–এসবের মধ্যেই সংস্কৃতিকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। এ বাস্তবতায় বলতে পারি, বাংলাদেশে জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তান আমলে নানা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি প্রকাশ পেয়েছে।’
স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, সে সম্পর্কেও তার বক্তব্য ছিল যুক্তি দ্বারা পুষ্ট। আবেগের বাষ্পে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি ঝাঁপসা হতে দেননি। কীভাবে শাসকরা ভূখণ্ড ভাগ করার আগে মনোজগতে বিভক্তি আনে তা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেছেন। যেভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে তার যুক্তি অনস্বীকার্য। তিনি বলেছেন, ‘এ ভূখণ্ডে একসময় হিন্দু সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতি পরস্পরবিরোধী রূপ পায়। পরিণতিতে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তান ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। তবে পাকিস্তানবাদীরা চেষ্টা করেছিলেন একটি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ এবং পাকিস্তানি জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। এর বিপরীতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা। সেই সংস্কৃতি ছিল প্রতিবাদী। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ–এসবকিছুর মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি ও স্বাধীন বাংলাদেশ।’ লাখো মানুষের জীবন ও সংগ্রামে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত তা তিনি যুক্তিতে ও মননে লালন করতেন।
স্বাধীন দেশের মানুষের জীবনে ও সংস্কৃতিতে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছেনি কেন, সে বেদনা তাকে কষ্ট দিয়েছে সবসময়। স্বাধীনতার বয়স বেড়েছে কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি মানুষ যে বঞ্চিত বা প্রতারিত হচ্ছে, সে কথা বলার পরিবেশটাও যেন নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। গভীর বেদনায় তাই তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এমন যে, স্বাধীনভাবে যারা চিন্তা করতে চান, তারা সেটা করার কোনো সাহসই পাচ্ছেন না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন করা হয়েছে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে জননিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের আইন তৈরি করা কিংবা জারি রাখার চেষ্টা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যারা উন্নত চিন্তাচেতনার চর্চা করেন, তাদের জন্য স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে সব দলেরই রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা লাভবান হবেন। চিন্তা দমনের নীতি কারও জন্যই ভালো হয় না।’ তার সতর্কবাণী শাসকদের কানে যায়নি কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি, চেষ্টা চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু। এ ক্ষেত্রে তিনি এক অনুকরণীয় চরিত্র।
যেকোনো জাতির ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ আর নেই। অতীতের সাফল্য যেমন গর্বের, ব্যর্থতা তেমনি সতর্কতার। সাফল্যের মতো ব্যর্থতারও কারণ আছে। তাই তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায়, ইতিহাস থেকে কেউই শিক্ষা নিতে চায় না। বাংলাদেশ এখন যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে, তার পরিবর্তন ও উন্নতির জন্য প্রায় দেড় হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনীতির চর্চা একান্ত দরকার।’ পরিকল্পিতভাবে যুবসমাজের মধ্যে অতীত অস্বীকার বা অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার যে মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে সেই বিপদ তিনি বুঝতে পেরে সতর্ক করেছেন।
বিদ্বেষ এবং বিভক্তি অনেক ভালো উদ্যোগকে ধ্বংস করে দেয়। যে তরুণরা আগামীর দেশ গড়বে সেই তরুণদের প্রতি তার আন্তরিক পরামর্শ ছিল, ‘দৃঢ়চিত্ত তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অথচ এখানে ঐক্যের একান্ত অভাব। কেউ কাউকে মানতে চায় না। সংগঠন গড়ে তোলার জন্য একটা ক্ষমতাকাঠামোর প্রয়োজন হয়। দেখা যায় যে সভাপতি প্রার্থীর জন্য একসঙ্গে অনেকেই থাকেন। সংগঠনের একজন সভাপতি হলে বাকিদের তাকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্য যে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন প্রয়োজন গত ৫০ বছরেও তা দেখা যায়নি।’ তার এই উচ্চারণ ছিল বেদনার। তিনি প্রাণপনে চাইতেন তরুণরা এগিয়ে আসুক এবং নীতির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকুক।
বেদনা তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। তার প্রিয় সন্তানকে সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থিরা হত্যা করেছিল। কষ্ট বুকে চেপে তিনি সন্তানের নৃশংস হত্যা দেখেছেন কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাননি কারণ তিনি জানতেন তা হবে বিচারের নামে প্রহসন। বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন দেশের জনগণের শুভ বুদ্ধির কাছে। এ দেশ কি মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে রক্ষা করবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন।
একটা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ না থাকা। আমাদের শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ ছিল–এই বেদনা জাগিয়ে তিনি চলে গেলেন। সমাজকে প্রশ্ন করার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেলেন, সেটাই আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)


