ঢাকা ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইউরোপের আধিপত্য চীনে কাঁঠাল রপ্তানি করতে চায় সরকার: সংসদে প্রধানমন্ত্রী বিএসএফের ঠেলে পাঠানো ৪ ভারতীয় নাগরিক ফিরলেন ভারতে ঘরে জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু খুলনায় ভালো কাজের পুরস্কার পেলেন ট্রাফিকের ৩১ সদস্য বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেল স্বামী-স্ত্রীর কোষ ও এর গঠন অধ্যায়ের ১৫টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, এইচএসসির জীববিজ্ঞান ১ম পত্র উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদরাসায় পাহাড়ধস, নিহত ৪ ইবি ছাত্রদলের নতুন কমিটি, নেতৃত্বে যারা মাদারীপুরে ‘পদ্মা পাড়ে জীবন যুদ্ধ’ মাঠ মহড়া বঙ্গোপসাগরে ৩ ট্রলারডুবি, নিখোঁজ ১৩ জেলে অনার্স পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ফ্রি করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখা সিডিএর মূল দায়িত্ব নয়: সিডিএ চেয়ারম্যান ছায়া বৃক্ষের নীরব বিদায় কাঁচপুর বাস টার্মিনালে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নীতিগত অনুমোদন নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রচারণা, পঞ্চগড়ে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা পেনাল্টি মিসের কষ্ট নিয়ে মুখ খুললেন ব্রুনো গুইমারায়েস টুয়েলভ ক্লদিংয়ে বিশেষ অফার ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার হবে কবে এইউএসটি ও জার্মানির UNU-FLORES-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর উত্তাল নদী, বিচ্ছিন্ন হাতিয়ার জনজীবন সিলেট সীমান্তে জিরা, চা পাতা ও চিনিসহ কোটি টাকার চোরাইপণ্য জব্দ গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন জাককানইবি ছাত্রদলের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন বিপৎসীমার ওপরে সাঙ্গুর পানি, বান্দরবানে বন্যা-আতঙ্ক হাতিরঝিলে বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে: প্রধানমন্ত্রী উখিয়ায় মাদরাসার উপর পাহাড়ধস, কয়েকজনের মৃত্যুর শঙ্কা আইএসইউতে ওবিই ভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও অ্যাসেসমেন্ট রুব্রিক্স বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত ৪২ বছরের ইতিহাসে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড

ছায়া বৃক্ষের নীরব বিদায়

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম
ছায়া বৃক্ষের নীরব বিদায়
রাজেকুজ্জামান রতন

এ দেশ কি মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে রক্ষা করবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন। একটা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ না থাকা। আমাদের শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ ছিল–এই বেদনা জাগিয়ে তিনি চলে গেলেন। সমাজকে প্রশ্ন করার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেলেন, সেটাই আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে।...

নিঃশব্দে চলে গেলেন প্রফেসর আবুল কাসেম ফজলুল হক। সারাজীবন সরব ছিলেন প্রতিটি প্রশ্নে, ব্যাখ্যা করেছেন, নিজের মতো তুলে ধরেছেন, ভাবিয়েছেন চারপাশের মানুষকে। আর শোনা যাবে না তার বেদনা আর বিষাদে মেশানো কণ্ঠস্বর। তার বেদনা শ্রোতাদের হতাশ করত না বরং ভাবিয়ে তুলত, জাগিয়ে রাখত এবং এই প্রত্যয় তৈরি করত যে, বেদনার কারণগুলো দূর করতেই হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাংলা একাডেমিতে, টিএসসিতে, জাদুঘরে কিংবা প্রকাশ্য সভায় আর কখনো আমরা শুনব না ইতিহাস ও রাজনীতির বিশ্লেষণ, তীব্র সমালোচনা আর ভবিষ্যতের আশাবাদ মেশানো তার অনবদ্য আলোচনা। তার হার না মানা জীবন ছিল আমাদের অনেকের কাছে সাহসের দৃষ্টান্ত। কণ্ঠস্বরের তীব্রতার চাইতেও যুক্তির শক্তি যে প্রবল ছাপ ফেলে তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। ক্লাসে এবং আলোচনাসভায় যারা তার কথা শুনেছেন তারাই স্বীকার করবেন যে, তার যুক্তিধারা প্রভাবিত করেছে তার ছাত্র ও শ্রোতাদের।

সংখ্যার হিসাবে তার বয়স ছিল ৮৫ বছর। কিন্তু কর্তব্যবোধ দ্বারা তাড়িত মানুষের কাছে বয়স কেবলমাত্র সংখ্যা। মানুষের জীবন তাদের কাছে দেওয়া এবং নেওয়ার সংযোগ সেতু। সমাজের কাছ থেকে নিয়ে যে জীবন গড়ে ওঠে, বিকশিত হয় সেই জীবনকেই আবার ব্যয় করতে হয় সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে। ফলে সমাজের কাছে দায়বদ্ধ মানুষের তো বয়স হিসাব করার সময় থাকে না বরং কতটা কাজ বাকি আছে, কতটা পথ আরও চলতে হবে সেই ভাবনা তাদের অনুক্ষণ তাড়া করে। তাদের জীবনে কি ব্যর্থতা আসে না? ব্যর্থ হয়ে মুষড়ে পড়া নয় বরং কারণ খুঁজে তা জেনে পরবর্তী প্রজন্মকে জানিয়ে দেওয়া তারা কর্তব্য মনে করেন। তাদের কাছে হতাশা এক ধরনের মধ্যবিত্তসুলভ বিলাসিতা। সে কারণেই হতাশার কাছে পরাস্ত হওয়া নয়, হতাশাকে পরাজিত করার দৃঢ়তা ছিল তার জীবনব্যাপী।

হতাশ হওয়ার মতো ঘটনা কি তার জীবনে আসেনি? কিন্তু এ ব্যাপারে তার চিন্তা ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবন নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতিতে অনেকে হতাশ হতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে মানবজাতির ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, মানুষ অনেক সময়ই সংকটে পড়ে। আবার সেই সংকট অতিক্রম করে ভালো অবস্থানে যাওয়ার জন্য প্রথমে কিছু মানুষ চেষ্টা শুরু করে। পরে বহু মানুষ তাতে যুক্ত হয়। সংকটও কেটে যায়। কিন্তু জীবনধারার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক সংকট কেটে গেলে আরেক সংকট সামনে আসে। সমস্যার সমাধান করে যাওয়াই মানুষের কাজ।’ সমস্যা আসবে এবং সমাধানের পথও বের করতে হবে। সমাজের অভ্যন্তরের এই শক্তিতেই তো সমাজ এগিয়ে চলে। কোনো নির্দিষ্ট দলের সদস্য না হলেও তিনি মার্কসবাদী–এই চিন্তা দ্বারাই সমাজ ও জীবনকে বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থনীতি সমাজের ভিত্তি, তার ওপর গড়ে ওঠে রাজনীতি, সংস্কৃতি, একটা অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা। সমাজ যেমন পরিবর্তিত হয়, জীবনও তেমনি এগিয়ে চলে আর সংস্কৃতিরও থাকে গতিময়তা। ফলে শিকড়বিহীন হওয়া নয়, আবার কোথাও আটকে থাকারও বিরোধীও ছিলেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘সংস্কৃতি তো একটা বিমূর্ত ধারণা। ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, জাতিতে-জাতিতে এই ধারণার ভিন্নতা আছে। ব্যক্তি ও জাতির পুরো কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে। অনেকে গান-নাচ-নাটক-বিনোদন–এসবের মধ্যেই সংস্কৃতিকে সীমাবদ্ধ রাখতে চান। এ বাস্তবতায় বলতে পারি, বাংলাদেশে জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তান আমলে নানা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়েই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি প্রকাশ পেয়েছে।’ 

স্বাধীনতা সংগ্রাম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, সে সম্পর্কেও তার বক্তব্য ছিল যুক্তি দ্বারা পুষ্ট। আবেগের বাষ্পে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি ঝাঁপসা হতে দেননি। কীভাবে শাসকরা ভূখণ্ড ভাগ করার আগে মনোজগতে বিভক্তি আনে তা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেছেন। যেভাবে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে সেটার বিরুদ্ধে তার যুক্তি অনস্বীকার্য। তিনি বলেছেন, ‘এ ভূখণ্ডে একসময় হিন্দু সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতি পরস্পরবিরোধী রূপ পায়। পরিণতিতে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। পাকিস্তান ছিল একটি অস্বাভাবিক রাষ্ট্র। তবে পাকিস্তানবাদীরা চেষ্টা করেছিলেন একটি পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ এবং পাকিস্তানি জাতীয় সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। এর বিপরীতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় সংস্কৃতির ধারণা। সেই সংস্কৃতি ছিল প্রতিবাদী। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি, আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ–এসবকিছুর মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি ও স্বাধীন বাংলাদেশ।’ লাখো মানুষের জীবন ও সংগ্রামে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত তা তিনি যুক্তিতে ও মননে লালন করতেন।

স্বাধীন দেশের মানুষের জীবনে ও সংস্কৃতিতে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছেনি কেন, সে বেদনা তাকে কষ্ট দিয়েছে সবসময়। স্বাধীনতার বয়স বেড়েছে কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি মানুষ যে বঞ্চিত বা প্রতারিত হচ্ছে, সে কথা বলার পরিবেশটাও যেন নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। গভীর বেদনায় তাই তিনি বলেছেন, ‘পরিস্থিতি এমন যে, স্বাধীনভাবে যারা চিন্তা করতে চান, তারা সেটা করার কোনো সাহসই পাচ্ছেন না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন করা হয়েছে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে জননিয়ন্ত্রণের জন্য এ ধরনের আইন তৈরি করা কিংবা জারি রাখার চেষ্টা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যারা উন্নত চিন্তাচেতনার চর্চা করেন, তাদের জন্য স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে সব দলেরই রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীরা লাভবান হবেন। চিন্তা দমনের নীতি কারও জন্যই ভালো হয় না।’ তার সতর্কবাণী শাসকদের কানে যায়নি কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি, চেষ্টা চালিয়ে গেছেন আমৃত্যু। এ ক্ষেত্রে তিনি এক অনুকরণীয় চরিত্র।

যেকোনো জাতির ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার মতো অপরাধ আর নেই। অতীতের সাফল্য যেমন গর্বের, ব্যর্থতা তেমনি সতর্কতার। সাফল্যের মতো ব্যর্থতারও কারণ আছে। তাই তিনি বলেছেন, ‘ইতিহাস থেকে সবার শিক্ষা নেওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যায়, ইতিহাস থেকে কেউই শিক্ষা নিতে চায় না। বাংলাদেশ এখন যে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে, তার পরিবর্তন ও উন্নতির জন্য প্রায় দেড় হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও রাজনীতির চর্চা একান্ত দরকার।’ পরিকল্পিতভাবে যুবসমাজের মধ্যে অতীত অস্বীকার বা অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার যে মানসিকতা তৈরি করা হচ্ছে সেই বিপদ তিনি বুঝতে পেরে সতর্ক করেছেন।

বিদ্বেষ এবং বিভক্তি অনেক ভালো উদ্যোগকে ধ্বংস করে দেয়। যে তরুণরা আগামীর দেশ গড়বে সেই তরুণদের প্রতি তার আন্তরিক পরামর্শ ছিল, ‘দৃঢ়চিত্ত তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অথচ এখানে ঐক্যের একান্ত অভাব। কেউ কাউকে মানতে চায় না। সংগঠন গড়ে তোলার জন্য একটা ক্ষমতাকাঠামোর প্রয়োজন হয়। দেখা যায় যে সভাপতি প্রার্থীর জন্য একসঙ্গে অনেকেই থাকেন। সংগঠনের একজন সভাপতি হলে বাকিদের তাকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়ার জন্য যে সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও অনুশীলন প্রয়োজন গত ৫০ বছরেও তা দেখা যায়নি।’ তার এই উচ্চারণ ছিল বেদনার। তিনি প্রাণপনে চাইতেন তরুণরা এগিয়ে আসুক এবং নীতির প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকুক।

বেদনা তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। তার প্রিয় সন্তানকে সাম্প্রদায়িক উগ্রপন্থিরা হত্যা করেছিল। কষ্ট বুকে চেপে তিনি সন্তানের নৃশংস হত্যা দেখেছেন কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাননি কারণ তিনি জানতেন তা হবে বিচারের নামে প্রহসন। বিচারের ভার তুলে দিয়েছেন দেশের জনগণের শুভ বুদ্ধির কাছে। এ দেশ কি মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে রক্ষা করবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি জীবনব্যাপী সাধনা করেছেন।

একটা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ না থাকা। আমাদের শ্রদ্ধা করার মতো মানুষ ছিল–এই বেদনা জাগিয়ে তিনি চলে গেলেন। সমাজকে প্রশ্ন করার যে শিক্ষা তিনি রেখে গেলেন, সেটাই আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার হবে কবে

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
ঢাকার খালগুলো পুনরুদ্ধার হবে কবে
মাসুদ আহমেদ

একজন বিশিষ্ট পত্রলেখক সম্প্রতি এই কাগজের পাতায় বিভিন্ন ভরাট ও দখল করা খাল পুনরুদ্ধার করার নানা উপকারিতা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ঢাকা শহরে, মরহুম স্থপতি মোবাশ্বির হাসানের মতে, খালের সংখ্যা ছিল ১৭৩। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টার মতেও কমবেশি এ সংখ্যা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে উল্লিখ করা হয়েছে। শহরের যেসব স্থানে, ধরা যাক ১৯৭০ সাল থেকেই এসব খাল বিদ্যমান ছিল, সেসব স্থানে এগুলোর কাজ ছিল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং আশপাশের বিভিন্ন জনবসতিতে পতিত বৃষ্টির পানি পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত হয়ে মূলত বুড়িগঙ্গা নদীতে পৌঁছে দেওয়া। ফলে শহরের কোথাও কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। এ ছাড়া খালের পাশে সবুজ বনানী, অবকাশ যাপনের জন্য পার্ক এবং খালের পানিতে নানাবিধ দেশজ মাছ ও অন্যান্য জলজপ্রাণী বিচরণ করে নগরে তাপ, অক্সিজেন, ছায়া ইত্যাদির চমৎকার ভারসাম্য ও পরিবেশ সংরক্ষণ করত।

বছরে ১ দশমিক ২ শতাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শহরের চারদিকের বিভিন্ন জেলা থেকে জীবন ও জীবিকা যাপনের লক্ষ্যে আরও মানুষ প্রবেশের ফলে খালগুলোর একাংশ ক্রমে ভরাট হয়ে পড়ে। আরেক বৃহৎ অংশ পূর্ণ হয় এই বর্ধিত জনসংখ্যার উৎপাদিত গৃহস্থালি ও অন্যান্য শক্ত বর্জ্য ফেলার কারণে। তার পরও কোনো কোনো খালের মধ্যাংশে ক্ষীণকায়া পানির স্রোত বহন করে তাদের পূর্ব স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধারণ করে চলছিল। শহরের জনসংখ্যা ৩৫ লাখ থেকে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৬ সাল নাগাদ ৩ কোটি ২৬ লাখে উন্নীত হওয়ায় এসব খালবিলের ভগ্নাবশেষও আর তাদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারেনি। সর্বত্রই হয়েছে নির্মাণকাজ। ইট, পাথর, সিমেন্ট, রড, লোহা, প্লাস্টিক, রাবার, পলিথিন ইত্যাদির মহাসম্মেলনে এসব খালকে পূর্ণ আবৃত করে প্রথমত নানা ধরনের ভবন তৈরি হয়। চাহিদার কারণে রিহ্যাব কোম্পানির শুভাগমনের পর, আগে যে স্থানে এক বা দোতলা বাড়িতে ১০ জন মানুষ বসবাস করতেন সেখানে আকাশচুম্বী ২৬, ৩২, ৪০ এমনকি ৫২ তলা ইমারত, টাওয়ার ও ভবন নির্মিত হয়েছে। সেখানে বসবাস করছেন এই ৩ কোটি ২৬ লাখ মানুষের একটি বৃহৎ অংশ। সেখানে সংযুক্ত হয়েছে পয়ো, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অন্তর্জালের বিশাল বিশাল টাওয়ার। অল্প স্থানে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের সংস্থাপন হওয়ার ফলে কাঁচা মাটি, অনাবৃত স্থানের মতো কোনো কিছু আর অবশিষ্ট থাকেনি। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগও খুব ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তেমনি বিপুল জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম আয়তনের ড্রেন তৈরি করতে হয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত স্থান ছিল না। সেখানে স্তূপীকৃত বর্জ্য আর নড়ছে না। তেমনি বৃষ্টির পানিও না সরতে পারার ফলে আধা ঘণ্টার বারিপাতেই সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধপূর্ণ জলাবদ্ধতা। পয়োবর্জ্য, রান্নাঘরের বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য এবং চিকিৎসাবর্জ্য একসঙ্গে মিলিত হয়ে তরল ও ঘনীভূত স্রোত এমনকি নিউমার্কেটের মতো চমৎকার এলাকাটিতেও বুকপর্যন্ত উঠে আসছে। নগরবিদ ও স্থপতিদের মতে, ভরাট খালগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে হবে।

প্রথমত, প্রত্যেক মালিক তাদের মালিকানা আইনত প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতিতে নিজ নামীয় খারিজ খতিয়ান ও দলিল রেজিস্ট্রির মতো একান্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কাগজ সরকারের সংশ্লিষ্ট কার্যালয় অর্থাৎ সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে জারি করেছেন। এ ছাড়া অনেকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন। উত্তরাধিকারীর নামে এই সম্পত্তির বা এর অংশবিশেষ হস্তান্তর করেছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগের সমুদয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন। ভূমি কর, পৌর কর এবং আয়কর পরিশোধের পদ্ধতিতে এই সম্পত্তির নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু এই খালের ওপর প্রতিষ্ঠিত সম্পত্তিগুলোকে অবৈধ প্রমাণ করে উৎখাত করা ছাড়া খালটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত গন্তব্য হচ্ছে এই ভূমিকে সরকারের এক নম্বর খাস খতিয়ানে প্রত্যাবর্তন করানো। যার অর্থ একটি রিসেট বাটনে চাপ দিতে হবে। যার মাধ্যমে দলিল রেজিস্ট্রি, খারিজা পর্চা, কর পরিশোধ–এই তিনটি মৌলিক প্রক্রিয়াকে আইনত অকার্যকর করতে হবে। দেশে গড়ে ১১টি শুনানি ছাড়া কোনো ভূমির সেটেলমেন্ট স্থির করা যায় না। এ ছাড়া দখল করা খালের ওপর কারখানা, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মোটরগাড়ির কারখানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, দরগাহ, সিনেমা হল, ক্লাব, বিপণিবিতান ইত্যাদিও রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ করে ধর্মীয় সহানুভূতিসম্পন্ন স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করতে হবে, যা ওয়াকফ আইনের পরিপন্থি। এমনিতে সাধারণভাবে ভূমির মালিকানা-সংক্রান্ত বৈধতা বা অবৈধতা আদালতে প্রমাণ করতে এমনকি ৩২ বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

কথা হলো ১৭৩টি খালের ওপর প্রতিষ্ঠিত এই বেআইনি দখল, নির্মাণ ও হস্তান্তর-সংক্রান্ত কাজগুলো অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করতে কত বছর সময় লাগবে? তা বিবেচ্য। ক্রেতাদের মধ্যে আইনপ্রণেতা, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী এবং সমাজের অন্যান্য প্রভাবশালীও রয়েছেন। রয়েছেন রেজিস্ট্রেশন ও ভূমি অফিসের পদস্থ ব্যক্তিরা। তাদের উপস্থিতিতে কোনো কর্তৃপক্ষ এই কর্মসম্পাদন করতে পারবেন কি না, তা বিবেচ্য। এক নম্বর খাস খতিয়ানকে ব্যক্তিগত ভূমি হিসেবে প্রথমত যারা বিক্রি করেছেন সময়ের দীর্ঘ পরিসরে তারা অনেকে মৃত, অনেকে বিদেশে বসবাসরত। অন্যদিকে ভূমি ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সিংহভাগ অবসরে গেছেন। তাদেরও শনাক্ত করা একটি তুঘলকি কারবার হবে। আর রাজউকের যেসব কর্মকর্তা এসব নির্মাণের নকশা ও পরিকল্পনা অনুমোদন এবং নির্মাণ তদারকি করেছেন তাদের অধিকাংশই হয় মৃত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত। অথচ দায়ী প্রত্যেকেই। অন্যদিকে সরকার রাষ্ট্রের কোয়ারসিভ বা বলপ্রয়োগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এদের উৎখাত করতে গেলে কিংবা আদালতে মামলা করলে হাইকোর্টের একটি বাধার সম্মুখীন হতে হবে। যাতে বলা আছে দখল করা ভূমির প্রকৃতি যাই হোক উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া কাউকে তার দখল করা স্থান থেকে উৎখাত করা যাবে না। কাজেই জলাবদ্ধতা, ছায়া, গাছপালা, তথা সুন্দর পরিবেশের চেয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।

খাল পুনরুদ্ধার করতে হলে খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় সমাহিত যে মাটিসহ বিভিন্ন বর্জ্য রয়েছে সেগুলো খনন করতে হবে। এগুলো এবং বহুতল স্থাপনাগুলো ভেঙে অপসারণ করতে হবে। এই বর্জ্য এবং ভগ্নাবশেষ রাখার শূন্যস্থান কোথায় আছে তাও নির্ণয় করতে হবে। ১৭৩টি খাল থেকে খনন করা এবং প্রাপ্ত এই বর্জ্যের আয়তন কয়েক লাখ ঘনফুট হবে। এই খরচ এবং শূন্যস্থান পূরণ করবে কে? আবার সময়ের দীর্ঘ পরিসরে হস্তান্তর, বিক্রয় ইত্যাদি সূত্রে যে উত্তরাধিকারীদের উত্থান হয়েছে তাদের দাবি বা প্রমাণ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের অর্থ এবং নতুন করে বসবাসের জমি দিতে হবে। আমাদের বাজেট প্রতি বছরই ডেফিসিট। সামান্য ৫ কাঠা, ১০ কাঠা, হুকুম দখল করা জমির ক্ষতিপূরণ মামলা নিষ্পত্তি করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সেগুলোর ক্ষতিপূরণ দিতে গড়ে ১০-১২ বছর লাগে। যেমন কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কয়েক হাজার পরিবারের দখল করা ভূমির ক্ষতিপূরণ ৬৭ বছরেও পূর্ব পাকিস্তান সরকার এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে দিতে পারেনি।

খাল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি যেহেতু পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে করা প্রয়োজন, সে প্রসঙ্গে অগ্রগতি তো দূরের কথা ১৯৭২ সাল থেকে তাতে অধোগতি হয়েছে। সর্বশেষ পরিবেশ উপদেষ্টাকে এ বিষয় জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে একটি জলাশয়ও উদ্ধার করতে না পারলেও অন্তত এ-সংক্রান্ত কিছু নীতিমালা দিয়ে গেছেন। এই কথাটি একান্ত অসত্য, কারণ ভূমি-সংক্রান্ত যেকোনো নীতিমালা আসলে দিয়ে গেছেন ব্রিটিশ শাসকরা। তারা ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভের (সিএস) মাধ্যমে জমিকে নালা জমি, চালা জমি, বসতভিটা ও পুকুর এবং ওয়াকফ ইত্যাদি শ্রেণিতে ভাগ করে গেছেন। আমরা জনসংখ্যার প্রচণ্ড চাপে সেই সিএস খতিয়ানকে লঙ্ঘন কর জমির যেকোনো শ্রেণির ওপর বসতবাড়ি ও ভবন নির্মাণ করার অনুমতি দিয়েছি। ফলে জলাশয়, পুকুর ও বনভূমি বলে কোনো কিছু আর প্রায় অবশিষ্ট নেই বলেই এই খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে। কাজেই নতুন করে কোনো নীতিমালা দেওয়ার আবশ্যকতা নেই। সেই ব্রিটিশদের প্রণীত সিএস খতিয়ান অনুসরণ করাই একমাত্র সমাধান এবং তা করতে হলে এক সন্তানবিশিষ্ট পরিবার গঠন করে জনসংখ্যা জরুরিভাবে হ্রাস করার পদক্ষেপ না নিলে ঢাকা শহরের খাল পুনরুদ্ধার কর্মসূচি তেমন একটা সফলতার মুখ দেখবে না।

লেখক: সাবেক সিনিয়র সচিব ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
[email protected]

বাজেট প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নাকি সংস্কারের হারানো সুযোগ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
বাজেট প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নাকি সংস্কারের হারানো সুযোগ
শাফিকুল হক

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়, তাহলে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতেই হবে। একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের ওপর।...


জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা। এমন এক সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা।

সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বড় হলেও ব্যয়ের সম্প্রসারণে একটি সংযত অবস্থান প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ, উন্নয়ন ব্যয় এবং বাজেটঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রশ্ন হলো-এই বাজেট কি দেশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোর যথেষ্ট সমাধান দিতে পেরেছে? নাকি এটি মূলত একটি স্থিতিশীলতাকেন্দ্রিক বাজেট, যেখানে কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি?

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বাস্তবে অনেক পরিবারের প্রকৃত আয় কমে গেছে, যদিও নামমাত্র আয় কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু ভর্তুকি বা সামাজিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং বাজার তদারকি জোরদার করা আরও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারত।

বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে যে, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক। সুতরাং, মূল্যস্ফীতিকে কেবল মুদ্রানীতির। মাধ্যমে নয়, বরং কৃষি, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কারের মাধ্যমেও মোকাবিলা করতে হবে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এখনো কম। দীর্ঘদিন ধরে একই সীমিত জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ করের প্রধান বোঝা বহন করছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা করব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

বাজেটে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, স্বয়ংক্রিয়তা এবং কর আদায় বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব হবে, যখন করব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং করদাতাবান্ধব করা যাবে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো, কর ফাঁকি রোধে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ পরোক্ষ করের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই বর্তায়, যা মূল্যস্ফীতির সময় আরও বেশি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দীর্ঘদিন ধরে করব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। আর সেই উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিল্পায়নের গতি, দক্ষতার ঘাটতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত হারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের, স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনে আরও লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা থাকলে কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারত। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সবুজ জ্বালানি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্য বাংলাদেশকে আরও প্রস্তুত করতে পারে।

কোনো অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না যদি বেসরকারি বিনিয়োগ শক্তিশালী না হয়। বর্তমানে উদ্যোক্তারা উচ্চ ঋণব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি। বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকার থাকলেও ব্যবসা শুরু করা, লাইসেন্স গ্রহণ, কর পরিশোধ এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার জন্য সুস্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা যেত।

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়, তাহলে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতেই হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল দিক এখন ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকিব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থার সংকট বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নিলেও, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য। আরও গভীর সংস্কার প্রয়োজন।

বাজেটে আর্থিক খাতের সুশাসন, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকলে তা বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক উভয়ই আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রজারদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে, কারণ একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান জিডিপির তুলনায় কমলেও কর্মসংস্থান এবং খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বাজেটে কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত থাকলেও কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা (কোল্ড চেইন), কৃষি গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে আরও বিনিয়োগ করা যেত। উৎপাদক যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তা খাতে সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারেন-সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা নীতিনির্ধারকদের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মানবসম্পদ। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। বাজেটে এ দুই খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ জরুরি। একইভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জামের আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টি আরও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, টেকসই কৃষি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়ই বাংলাদেশে জলবায়ু, সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে একটি সাধারণ সমালোচনা হলো-ঘোষণা অনেক, কিন্তু বাস্তবায়ন তুলনামূলক দুর্বল। উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং জবাবদিহির সীমাবদ্ধতা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে। তাই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্প মূল্যায়ন, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর জোর দেওয়া উচিত। উন্নয়নের সুফল তখনই জনগণের কাছে পৌঁছাবে, যখন বরাদ্দকৃত অর্থ দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সঙ্গে ব্যয় হবে।

শেষ কথা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে প্রণীত হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে এতে ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, করব্যবস্থার সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আরও উচ্চাভিলাষী ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল।

একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের ওপর। যদি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, করব্যবস্থা আরও ন্যায়সঙ্গত হয় এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই বাজেট তার উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ যাত্রায় কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের বাজেটগুলো যদি এই মৌলিক নীতিগুলোকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

লেখক: অ্যাডভোকেট, সাবেক মেয়র, লন্ডন বরো অব টাওয়ার হ্যামলেটস, যুক্তরাজ্য

বিনম্র শ্রদ্ধা সদাচারী জ্ঞানসাধক আবুল কাসেম ফজলুল হক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
সদাচারী জ্ঞানসাধক আবুল কাসেম ফজলুল হক
মুহম্মদ নূরুল হুদা

জাতির শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতির প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির আমৃত্যু সভাপতি তিনি। কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন? আসলে তিনিই তো জাতির জন্য এক প্রমিত পুরস্কার। আমাকে দেখেই বললেন, 'কেমন আছেন কবি? কবিতা লিখছেন তো?' আমি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লাম। এমন ভালো মানুষ কোটিতেও মেলে না।...

সমাজ বিবর্তনের পথে মানুষের যে অগ্রযাত্রা, তা ব্যাহত হয়েছে যুগে যুগে। সমরূপ বৈশিষ্ট্যের মানবগোষ্ঠীর মধ্যে হঠাৎ বা পরিকল্পিতভাবে যদি অভাবিতপূর্ব অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তখন সে সমাজে চিড় ধরতে শুরু করে নানাভাবে। আর জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভিন্ন বিভাজন সূচিত হয়। উপমহাদেশে এমন ভাঙন ও অবিশ্বাস প্রবল হতে শুরু করে বাণিজ্যের বাহানায় নানা য়ুরোপীয় শক্তির আগমনের ফলে। তারাই শেষতক এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক শাসনভার কবজা করার পর বিদায়ের আগে তাদের মধ্যে মানসিক, আত্মিক, আর্থিক, বিশ্বাসভিত্তিক তথা পরিকল্পিত নানা বিভাজন সৃষ্টি করেছে আর অনৈক্য ও অব্যাহত ভাঙনের বীজও বপন করেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অন্তত বিগত তিন শতকজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে চরম অস্থির ও আক্রমণাত্মক রূপ গ্রহণ করেছে। এখন তার বিস্তার বিশ্বব্যাপী; যার ফলাফল দুটি বিশ্বযুদ্ধ; আর সাম্প্রতিকালে আরেকটি পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধের পরিকল্পিত মহড়া। এই সহিংস মানব বিভাজনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মাঙ্গলিক ও মানবতাবাদী যে ঐক্য, তারই এক প্রমুখ বোদ্ধা ও কলযোদ্ধার নাম অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার অনন্ত গমনের প্রাক্কালে জাতির পক্ষ থেকে তাকে অবনতচিত্তে অভিবাদন জানাই।

তার সঙ্গে পরিচয় সেই ১৯৬৭ সাল থেকে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে গবেষক হিসেবে জীবন শুরু করেছেন। আমি তখন ইংরেজি বিভাগে অনার্সের ছাত্র। আমাদের যোগাযোগ-সূত্র ছিলেন আমাদের কালের আরেক সন্ত আহমদ ছফা। ইংরেজি বিভাগ ও বাংলা বিভাগ পাশাপাশি হওয়ার ফলে আমাদের দেখা হতো সকাল-বিকেল। আমাদের আরেক আড্ডাসঙ্গী ছিলেন আজকের বিখ্যাত ভাষাবিদ প্রফেসর মনুসর মুসা। ছফা ভাই, মুসা ভাই আর আমার যোগসূত্র ছিল কতকটা আঞ্চলিক; আমরা তিনজনই চাটগাঁইয়া। কিন্তু কাশেম ভাইর সঙ্গে সম্পর্কের কারণ কেবল সাহিত্যচর্চা, মানবিকতা, সাম্যবাদ আর সৃষ্টিশীলতা। আরেকজনের নামও মনে পড়ে, তিনি অকালপ্রয়াত কবি হুমায়ুন কবির। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো কলা ভবনের বারান্দায়, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের চত্বরে কিংবা শরিফ মিঞা বা আফসার মিঞার দোকানে। মাঝে মাঝে মধুর ক্যানটিনেও। আমাদের ভেতর সব বিষয়ে ঐকমত্য ছিল বা আছে এমন নয়, তবে আমরা সবাই ছিলাম সৃষ্টিশীলতা ও সাম্যবাদী মঙ্গলময়তায় অঙ্গীকৃত।

এক বিশ্ব, এক মানবজাতি, প্রত্যেক মানুষের জন্য অহিংস ও সদাচারী জীবনযাপনের নিশ্চয়তায় আমি বা আমরা বিশ্বাসী। এই যুক্তির ভিত্তিমূলে মানুষের যে আদি উৎস আর তার নৈয়ায়িক বিস্তার এই গ্রহব্যাপী, তার সপক্ষে তাত্ত্বিক যুক্তি যারা সাজাতেন, কাশেম ভাই ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। আমি প্রায় বিনাবাক্যে তার কথা শোনার অভ্যেস রপ্ত করেছিলাম। কাসেম ভাই যুক্তির পর যুক্তি সাজাতেন; বয়ান যত দীর্ঘই হোক, শেষ না করে থামতেন না।

তিনি বাংলা বিভাগে গবেষণায় যুক্ত হয়ে শেষতক সেই বিভাগেই অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। কিন্তু হাতের কাছে অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেননি। এ ক্ষেত্রে তাকে তারই শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই কিংবা মুনীর চৌধুরীর পদাঙ্ক অনুসারী বলে মনে হয়। আসলে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পারিবারিকভাবেও তিনি এই একাডেমিক জীবনচর্চায় সমর্পিত একজন নৈয়ায়িক শিক্ষক। তারই যোগ্য পুরস্কার পেয়েছেন ব্যক্তিক ও পারিবারিক পর্যায়ে। তার সহধর্মিণী আর পুত্র-কন্যাও তারই আদর্শ আর নৈয়ায়িক পেশার উত্তরসূরি।

ছিয়াশি বছরের জীবনে তিনি তেমন ভোল পাল্টাননি, যা অনেকেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিরীক্ষা-পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন। প্রচুর জ্ঞানের কথা বলতেন তিনি; চীন, মধ্যপ্রাচ্য বা গ্রিস দেশীয় দার্শনিকদের কথা, কিংবা এ কালের পোস্টমডার্ন বা মেটামডার্ন তত্ত্বের কথা। তবে কোনো বিষয়েই তিনি নিজের মত জ্ঞাপন করতে পিছপা হতেন না। সব সমালোচনা, কষ্ট, শোক-দুঃখ হজম করার এক বিরল সহনশীলতা ছিল তার করায়ত্ত। অকালে পুত্র হারানোর শোক তিনি সহ্য করেছেন বিনা অশ্রুপাতে। যখন যেখানে যেতেন, সেখানে নিজের কথাটিই বলতেন যুক্তিসহ। কে গদিতে বা কারা কারা অপেক্ষায়, তার তোয়াক্কা করতেন না। তাকে কখনো কোনো বিরুদ্ধবাদীর সঙ্গে যুক্তিতর্কের বাইরে অজাচারী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতেও দেখিনি। এই সহনশীলতা মধ্যবিত্তের আপসকামিতা নয়, বরং উচ্চচিত্তের সমমর্মিতা। সাধারণত স্বশিক্ষিত জ্ঞানী ও ধ্যানীর ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখেছি। তাকে কখনা কোনো অভিযোগ করতেও দেখিনি। শত্রুকে মিত্র করে তোলার এক স্বভাবজাত শক্তি ছিল তার আয়ত্তাধীন। আবার প্রতিপক্ষকে বাগে পেয়ে হেনস্তা না করে তাকে পারতপক্ষে স্ব-সংশোধনে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ খুঁজতেন। আসলে বৈষয়িক বুদ্ধিহীন এমন সুশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত মানুষের দেখা কদাচ মেলে।

বৈদিক যুগে জন্ম নিলে তিনি কি ঋষি হতেন? তিনি সমাজের যেকোনো সংকটে নিজের মীমাংসামূলক যুক্তিই তুলে ধরেছেন। এটিই তার স্বশিক্ষার উদারতা ও সাহসিকতা। অহেতুক সংঘাতের পথ বেছে নেওয়ার প্রেসক্রিপশন তিনি দেননি কখনো। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়েও তিনি রাখঢাক করেননি। বিগত রাজনৈতিক সংকটের তুঙ্গ মুহূর্তে তিনি অকপটে সত্য কথা উচ্চারণ করেছেন। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে। 'বাংলাদেশে রাজনীতি খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে।... রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত।... কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়।' চাকরিরত অবস্থায় এমন কথা বলার সাহস আছে কার? আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্ত অবশ্যই নগণ্য। তাই তার মতো মানুষের বড় প্রয়োজন। সংঘটিত ঘটনাকে অস্বীকার করে নয়, তাকে গ্রহণ করেই সংশোধনের পথে এগোতে হবে। এ পথ সংঘাতের নয়, সমঝোতার। অজাচারের নয়, সদাচারের। বৈষম্যের নয়, সাম্যাচারের। তেমন একজন মানববরণ জ্ঞানসাধক আমার পরম শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই।

জাতির শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতির প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির আমৃত্যু সভাপতি তিনি। কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন? আসলে তিনিই তো জাতির জন্য এক প্রমিত পুরস্কার। এবার ফেব্রুয়ারির অমর একুশের বইমেলায় এক শুক্রবারে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেই শেষ দেখা। দুজন সঙ্গীর কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন ধীরে ধীরে। আমাকে দেখেই বললেন, 'কেমন আছেন কবি? কবিতা লিখছেন তো?' আমি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লাম। এমন ভালো মানুষ কোটিতেও মেলে না। অনন্তলোকে অনন্তকাল আপনিও ভালো থাকুন, আমার শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই।

লেখক: কবি ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র!
দীপু মাহমুদ

এটা শুধু এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?...

জুন মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ১০০ জন নারী ও কিশোরী। তাদের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১২ জন শিশু। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৪ জনের ওপর, যাদের মধ্যে ৩১ জনই শিশু। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১১ জন, উত্ত্যক্তের শিকার ২৯ জন এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন তিনজন। একই মাসে হত্যা করা হয়েছে ৫৪ জন নারীকে, রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। ধর্ষণের পর সাত শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

এই পরিসংখ্যান কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফল নয়, এটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসা মাত্র এক মাসের ঘটনাপঞ্জি। ২ জুলাই প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলো সেই ঘটনাগুলো, যেগুলো কোনোভাবে সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছেছে। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, স্থানীয় প্রভাব কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায় যে বিপুলসংখ্যক ঘটনা থানার জিডি কিংবা আদালতের নথিতেও পৌঁছায় না, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে।

অপরাধতত্ত্বে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, ‘ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম’। অর্থাৎ, সংঘটিত হলেও যেসব অপরাধ কখনোই রাষ্ট্রের নথিতে প্রবেশ করে না, সেগুলোই অপরাধের অদৃশ্য অংশ। যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে এই অদৃশ্য অংশ সাধারণত দৃশ্যমান অংশের চেয়েও বড় হয়ে থাকে। ফলে জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়, বরং গভীরতর বাস্তবতার দৃশ্যমান প্রান্তভাগ মাত্র।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো–ধর্ষণের শিকার অধিকাংশই শিশু। ধর্ষণের শিকার ১০০ জনের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। ধর্ষণের চেষ্টার শিকারদের মধ্যেও প্রায় সবাই শিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকারদের অর্ধেকও শিশু। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে সেই জনগোষ্ঠী, যাদের নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতাই সবচেয়ে কম।

যেকোনো সমাজের নৈতিকতা পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভুল উপায় হচ্ছে তার শিশুদের নিরাপত্তার মানদণ্ড। সেই বিচারে এই পরিসংখ্যান কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্র নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক সংকটেরও দলিল।

ধর্ষণকে অনেক সময় ভুলভাবে কেবল যৌন অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। অথচ সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের গবেষণা বলছে, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্যের অপরাধ। এটি নারীর শরীরের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা হলেও এর লক্ষ্য প্রায়ই নারীকে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিকভাবে অধস্তন অবস্থানে রাখার প্রচেষ্টা। সে কারণেই যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা দুর্বল আইনশৃঙ্খলার সময়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

সমকালের প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। জুন মাসে বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪ জন নারী ও কিশোরী। রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, পারিবারিক সহিংসতা, গৃহকর্মী নির্যাতন, অপহরণ, পাচার, শারীরিক নির্যাতন–সব মিলিয়ে এক মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৩৩ জন নারী ও কিশোরী। অর্থাৎ, সমস্যাটি কেবল ধর্ষণের নয়, সমস্যাটি নারীর প্রতি সামগ্রিক সামাজিক সহিংসতার।

বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর বৈপরীত্য আছে। গত দুই দশকে নারীর শিক্ষার হার বেড়েছে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বেও নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সূচকের বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই পরিসংখ্যান তখনই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন দেখা যায় মেয়েশিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপদ নয়, নারী কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে নিরাপদ নন, এমনকি অনেক সময় নিজের ঘরেও নিরাপদ নন।

আইন আছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আছে, কঠোর শাস্তির বিধানও আছে। অপরাধতত্ত্বের মৌলিক সত্য হলো, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। একজন সম্ভাব্য অপরাধী মৃত্যুদণ্ডের ভয় যতটা না পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় দ্রুত ও নিশ্চিত বিচারের সম্ভাবনাকে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তদন্তের ধীরগতি, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা প্রায়ই এই নিশ্চয়তাকে দুর্বল করে দেয়।

এখানে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে অভ্যস্ত। অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, সময় কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই মানসিকতা শুধু ভুক্তভোগীর প্রতি অন্যায় নয়, এটা অপরাধীর জন্য সামাজিক আশ্রয়ও তৈরি করে। যে সমাজ ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে শেখায়, সে সমাজ অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধীকে সাহস জোগায়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চম লক্ষ্য হলো নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার অবসান এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই লক্ষ্য কেবল আইনের বইয়ে নতুন ধারা যুক্ত করে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা, আধুনিক ও দক্ষ তদন্ত কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মতির শিক্ষা এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক আরও সহজ প্রশ্ন–শিশু কি নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে? নারী কি নিরাপদে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন? কিশোরী কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের বদলে স্বপ্ন দেখতে পারে?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত থাকে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, রাষ্ট্রের নৈতিক হিসাবের খাতায় বড় ঘাটতি থেকেই যাবে।

জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা তাই কেবল এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?

লেখক: কথাসাহিত্যিক

চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে
আবুল কাসেম ফজলুল হক

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে খবরের কাগজ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। তিনি খবরের কাগজ- নিয়মিত লিখতেন। ২০২৪ সালের আগস্ট খবরের কাগজ- প্রকাশিত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কলাম পাঠকদের জন্য পুনর্মুদ্রণ করা হলো। -বিভাগীয় সম্পাদক

দেশে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে কতদিন দেশ শাসন করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকে রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।...

বাংলাদেশের রাজনীতি খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে। সরকার যে রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়, সেই শক্তি মাঝে মাঝে ব্যবহার করার মতো অবস্থায় সরকার থাকে না। রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও হলের ছাত্ররা সেই দলের রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকা উচিত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের প্রভাবের কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে শিক্ষক ও ছাত্রদের দুরূহ অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যাচ্ছেন। যখন দেশে কোনো ক্রান্তিকাল আসে, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে এমন ঘটনা দেখা যায়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এবারই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এত মানুষ মারা গেল, যা কখনো কেউ চিন্তা করেনি। সরকারের বোঝা উচিত ছিল ছাত্র আন্দোলন বড় আকার ধারণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতাই বলা যায়।

এখন দেশের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এটা জাতীয় জীবনে বড় দুর্যোগের লক্ষণ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার কেন সমঝোতা করতে পারল না? কোটা সংস্কার আন্দোলন সমাধানযোগ্য ছিল। সরকার কেন ছাত্রদের ওপর বাহিনী নামিয়ে দিল এবং দেশে কারফিউ জারি করল? সরকার ছাত্রদের এভাবে শান্ত করতে পারে না। সেনাবাহিনী ও পুলিশ দিয়ে ছাত্রদের কেন শান্ত করতে গেল। রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করা দরকার ছিল। বাহিনী দিয়ে কতদিন দেশ শান্ত রাখা যায়? সরকারকে রাজনৈতিকভাবেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারি দল বেশ বড় এবং শক্তিশালী। তা ছাড়া বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শক্তি একদমই ভেঙে পড়েছে। বিএনপি দেখতে অনেক বড় দল মনে হলেও আসলে তেমন শক্তিশালী নয়। তারা ইতোপূর্বে সরকার হটানোর জন্য অনেক আন্দোলন করেছে। কিন্তু তাতে কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। কাজেই জাতীয় রাজনীতির নিম্নগামিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ আছে, তাদের মধ্যেও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যে জাতীয় সমস্যার রূপ নিয়েছে তার সমাধান করা জরুরি। এভাবে বিক্ষিপ্তভাবে দেশ চলতে পারে না। যারা দেশের বুদ্ধিজীবী আছেন, তারাও সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারছেন না। আন্দোলনকে ঘিরে যখন দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলল, তখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন যে, বিএনপি ও জামায়াত এসব কাজ করেছে। গণমাধ্যমে যা উঠে এসেছে, তাতে মনে হলো অন্য কোনো রহস্য আছে। এর ভেতরে দেশদ্রোহের ব্যাপার আছে, যারা এসব কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান যে সংকট তৈরি হয়েছে তা সহজে নির্মূল হওয়ার নয়। এ ক্ষেত্রে বিশিষ্টজনরা, বিভিন্ন বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থা এর উত্তরণে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে। তবে সরকার খুব চেষ্টা করলে এই আন্দোলনের ভেতরের রহস্য বের করতে পারবে। সরকার রহস্য ভেদ করে সংকট মোকাবিলা করার পথ বের করতে পারে। সেই রহস্য জনগণকে জানাতেও পারে, না-ও পারে।

সরকার দেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ দিয়ে জামায়াত, বিএনপির লোক গ্রেপ্তার করছে। দেশে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ তারাই করেছে বলে সরকার মনে করছে। তবে ছাত্ররা এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে না। তাই অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করায় দেশের বিপদ আরও বাড়বে। ছাত্ররা কী চায়? তাদের পালস বুঝেই সরকারের সমাধানের পথ বের করতে হবে। ছাত্রদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল এবং সমাধানযোগ্য ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এত মানুষ মারা গেল? এটা সামান্য কোনো বিষয় নয়। এ কারণেই এ হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশের মানুষ মাঠে নেমে গেছে। তবে এখনো সরকারের হাতেই নিয়ন্ত্রণ আছে। সরকার এই আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপটের রহস্য বের করে সমাধান করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। শিক্ষকদের অনেক আগেই ছাত্রদের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। তা হলে এতগুলো ছাত্রের প্রাণ যেত না। শিক্ষকরাই ছাত্রদের অভিভাবক এবং তাদেরই সর্বপ্রথম ছাত্রদের পাশে এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এত শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ফলে ছাত্রদের অভিভাবকরা তাদের সন্তাদের নিয়ে অনেক চিন্তিত। মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে অভিভাবকরা। তাদের সন্তানরাও মানসিক ট্রমাতে ভুগছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তান নিশ্চিন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে।

সুস্থ রাজনীতি না থাকলে জাতি কখনো উন্নতি লাভ করতে পারে না। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করেছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কোনো উন্নতি লাভ করেনি। মানুষের সব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুস্থ রাজনীতি বিরাজ করতে হবে। বর্তমান রাজনীতিবিদদের মধ্যে সেই চিন্তা নেই। আগের দিনে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ছিল, বর্তমানে তা নেই। বুদ্ধিজীবীদের এখন বিশিষ্ট নাগরিক বলে থাকে। রাজনীতিবিদদের ভেতরেই শুধু সমস্যা তা নয়, বাইরে থেকেও কোনো কোনো শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেকভাবে বুদ্ধি দিয়ে দেশকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এখন যেভাবে আন্দোলন চলছে তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। তবে মনে হয়, এখন যে আন্দোলন হচ্ছে তা সরকারবিরোধী।

দেশের অর্থনীতি একদমই ভেঙে পড়ছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়লে সেখানে সুস্থ রাজনীতি টিকে থাকা দায়। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একরকম ভালোই চলছিল। কিন্তু সরকারি দল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে, তখন শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ থাকতে পারে না। দলীয়করণ এত বেশি বেড়েছে যে, শিক্ষার ভালো পরিবেশ আর নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কবে যে রাজনীতিমুক্ত হবে, তার কোনো লক্ষণ নেই। দেশের রাজনীতি যদি ঠিক না থাকে, তা হলে সবকিছুই ভেঙে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো কি কখনো চায় যে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ রাজনীতিতে সক্রিয় ও উন্নত হোক। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা কেন এটা বুঝতে পারে না। রাজনীতিবিদরা বাইরের পরামর্শ নিতে সজাগ থাকা উচিত। অতএব এটা স্পষ্টভাবেই বুঝতে হবে যে, পশ্চিমা শক্তির দ্বারা এ ধরনের আন্দোলন পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশীয় রাজনীতি বাইরের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি ভারত, রাশিয়া ও চীন দ্বারা প্রভাবিত। ভারত বাংলাদেশের অনুকূল হয়ে সব সময় কাজ করে থাকে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিজেদেরই মোকাবিলা করতে হবে।

ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবারের নির্বাচনের সময় থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল। এখনো ছাত্রদের সাধারণ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক যদি সরকারের বিপক্ষে কাজ করে, তা হলে বাংলাদেশের রাজনীতি কি এগোতে পারে? বাংলাদেশের রাজনীতিকে জনগণের রাজনীতিতে পরিণত হতে বেশ কিছু সময় লাগবে। বাংলাদেশকে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নিতে সরকার সহযোগিতা পাচ্ছে না। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমেরিকা আমাদের দেশের রাজনীতিতে কতভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতেই অনুমান করা যায়, ছাত্রদের আন্দোলনের এই সুযোগ আমেরিকা কখনো হাতছাড়া করবে না। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হতো, তা হলে আমেরিকা কি এভাবে দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত? যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যেভাবে বাংলাদেশের ওপর কথা বলেছে, স্বাধীন দেশের সরকারকে তারা কি এভাবে কথা বলার অধিকার রাখে? এ জন্য দেশে সুস্থ রাজনীতির খুব দরকার।

দেশে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে কতদিন দেশ শাসন করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকে রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।    

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ