ঢাকা ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫৪ গবেষকের পিএইচডি-এমফিল ডিগ্রি অর্জন এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্সে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম চালু করল আইএসইউ মির্জা শরফউদ্দীন বেগ (রহ.)-এর স্মরণে বরিশালে দোয়া মাহফিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আক্ষেপ থেকেই যাবে! যাত্রীসেবায় আরও যত্নশীল হোক রেলওয়ে বাজেট প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নাকি সংস্কারের হারানো সুযোগ ঢলে ভাসছে চকরিয়া-পেকুয়া, পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু ‘বিড়ালের অভিশাপে’ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে ব্রাজিল রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের শঙ্কা, প্রস্তুত ৪৪ আশ্রয়কেন্দ্র মেসি ও সালাহর সামনে রেকর্ডের হাতছানি জয়পুরহাটে ট্রাক-অটোরিকশা মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৫ ভূমিরূপ পরিবর্তন অধ্যায়ের ১১টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির ভূগোল ১ম পত্র সদাচারী জ্ঞানসাধক আবুল কাসেম ফজলুল হক কিনব্রিজের পাদদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপন চট্টগ্রামে দেয়ালধসে নিহত ১, শিশুসহ আহত তিন টানা বৃষ্টির প্রভাব, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সংস্থার সমাজ উন্নয়ন কার্যক্রম অধ্যায়ের ১টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর, ২য় পর্ব, এইচএসসির সমাজকর্ম ২য় পত্র অবিরাম বৃষ্টিতে ঝুঁকিতে বান্দরবান, খোলা হলো ২২০ আশ্রয়কেন্দ্র কারণ জানুন বিশ্ববাজারে ব্যবসা বাড়াতে নতুন রূপে ‘টিপসই’ মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে যেভাবে শুরু হয়েছিল মেসি-অধ্যায় এআই ও ডেটা সায়েন্সে স্নাতক প্রোগ্রাম চালু করল আইএসইউ বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য খুলল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী কম্বোডিয়ায় মানবপাচার ও তরুণ নিহতের ঘটনার মূলহোতা গ্রেপ্তার লাকড়ির স্তূপে বিষধর সাপ, প্রাণ গেল নারীর পাবলিক স্পিকিংয়ে মঞ্চ মাতাবেন যেভাবে মহাকাশে পতনশীল সুইফট অবজারভেটরি উদ্ধারে নাসার সফল অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকির সতর্কবার্তা ব্রাজিলের রাতের রানিতে সেজেছে পেকুয়ার পাহাড় নোয়াখালীর ২ হাসপাতালকে জরিমানা

বিনম্র শ্রদ্ধা সদাচারী জ্ঞানসাধক আবুল কাসেম ফজলুল হক

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
সদাচারী জ্ঞানসাধক আবুল কাসেম ফজলুল হক
মুহম্মদ নূরুল হুদা

জাতির শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতির প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির আমৃত্যু সভাপতি তিনি। কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন? আসলে তিনিই তো জাতির জন্য এক প্রমিত পুরস্কার। আমাকে দেখেই বললেন, 'কেমন আছেন কবি? কবিতা লিখছেন তো?' আমি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লাম। এমন ভালো মানুষ কোটিতেও মেলে না।...

সমাজ বিবর্তনের পথে মানুষের যে অগ্রযাত্রা, তা ব্যাহত হয়েছে যুগে যুগে। সমরূপ বৈশিষ্ট্যের মানবগোষ্ঠীর মধ্যে হঠাৎ বা পরিকল্পিতভাবে যদি অভাবিতপূর্ব অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তখন সে সমাজে চিড় ধরতে শুরু করে নানাভাবে। আর জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভিন্ন বিভাজন সূচিত হয়। উপমহাদেশে এমন ভাঙন ও অবিশ্বাস প্রবল হতে শুরু করে বাণিজ্যের বাহানায় নানা য়ুরোপীয় শক্তির আগমনের ফলে। তারাই শেষতক এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক শাসনভার কবজা করার পর বিদায়ের আগে তাদের মধ্যে মানসিক, আত্মিক, আর্থিক, বিশ্বাসভিত্তিক তথা পরিকল্পিত নানা বিভাজন সৃষ্টি করেছে আর অনৈক্য ও অব্যাহত ভাঙনের বীজও বপন করেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অন্তত বিগত তিন শতকজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে চরম অস্থির ও আক্রমণাত্মক রূপ গ্রহণ করেছে। এখন তার বিস্তার বিশ্বব্যাপী; যার ফলাফল দুটি বিশ্বযুদ্ধ; আর সাম্প্রতিকালে আরেকটি পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধের পরিকল্পিত মহড়া। এই সহিংস মানব বিভাজনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মাঙ্গলিক ও মানবতাবাদী যে ঐক্য, তারই এক প্রমুখ বোদ্ধা ও কলযোদ্ধার নাম অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার অনন্ত গমনের প্রাক্কালে জাতির পক্ষ থেকে তাকে অবনতচিত্তে অভিবাদন জানাই।

তার সঙ্গে পরিচয় সেই ১৯৬৭ সাল থেকে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে গবেষক হিসেবে জীবন শুরু করেছেন। আমি তখন ইংরেজি বিভাগে অনার্সের ছাত্র। আমাদের যোগাযোগ-সূত্র ছিলেন আমাদের কালের আরেক সন্ত আহমদ ছফা। ইংরেজি বিভাগ ও বাংলা বিভাগ পাশাপাশি হওয়ার ফলে আমাদের দেখা হতো সকাল-বিকেল। আমাদের আরেক আড্ডাসঙ্গী ছিলেন আজকের বিখ্যাত ভাষাবিদ প্রফেসর মনুসর মুসা। ছফা ভাই, মুসা ভাই আর আমার যোগসূত্র ছিল কতকটা আঞ্চলিক; আমরা তিনজনই চাটগাঁইয়া। কিন্তু কাশেম ভাইর সঙ্গে সম্পর্কের কারণ কেবল সাহিত্যচর্চা, মানবিকতা, সাম্যবাদ আর সৃষ্টিশীলতা। আরেকজনের নামও মনে পড়ে, তিনি অকালপ্রয়াত কবি হুমায়ুন কবির। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো কলা ভবনের বারান্দায়, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের চত্বরে কিংবা শরিফ মিঞা বা আফসার মিঞার দোকানে। মাঝে মাঝে মধুর ক্যানটিনেও। আমাদের ভেতর সব বিষয়ে ঐকমত্য ছিল বা আছে এমন নয়, তবে আমরা সবাই ছিলাম সৃষ্টিশীলতা ও সাম্যবাদী মঙ্গলময়তায় অঙ্গীকৃত।

এক বিশ্ব, এক মানবজাতি, প্রত্যেক মানুষের জন্য অহিংস ও সদাচারী জীবনযাপনের নিশ্চয়তায় আমি বা আমরা বিশ্বাসী। এই যুক্তির ভিত্তিমূলে মানুষের যে আদি উৎস আর তার নৈয়ায়িক বিস্তার এই গ্রহব্যাপী, তার সপক্ষে তাত্ত্বিক যুক্তি যারা সাজাতেন, কাশেম ভাই ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। আমি প্রায় বিনাবাক্যে তার কথা শোনার অভ্যেস রপ্ত করেছিলাম। কাসেম ভাই যুক্তির পর যুক্তি সাজাতেন; বয়ান যত দীর্ঘই হোক, শেষ না করে থামতেন না।

তিনি বাংলা বিভাগে গবেষণায় যুক্ত হয়ে শেষতক সেই বিভাগেই অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। কিন্তু হাতের কাছে অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেননি। এ ক্ষেত্রে তাকে তারই শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই কিংবা মুনীর চৌধুরীর পদাঙ্ক অনুসারী বলে মনে হয়। আসলে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পারিবারিকভাবেও তিনি এই একাডেমিক জীবনচর্চায় সমর্পিত একজন নৈয়ায়িক শিক্ষক। তারই যোগ্য পুরস্কার পেয়েছেন ব্যক্তিক ও পারিবারিক পর্যায়ে। তার সহধর্মিণী আর পুত্র-কন্যাও তারই আদর্শ আর নৈয়ায়িক পেশার উত্তরসূরি।

ছিয়াশি বছরের জীবনে তিনি তেমন ভোল পাল্টাননি, যা অনেকেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিরীক্ষা-পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন। প্রচুর জ্ঞানের কথা বলতেন তিনি; চীন, মধ্যপ্রাচ্য বা গ্রিস দেশীয় দার্শনিকদের কথা, কিংবা এ কালের পোস্টমডার্ন বা মেটামডার্ন তত্ত্বের কথা। তবে কোনো বিষয়েই তিনি নিজের মত জ্ঞাপন করতে পিছপা হতেন না। সব সমালোচনা, কষ্ট, শোক-দুঃখ হজম করার এক বিরল সহনশীলতা ছিল তার করায়ত্ত। অকালে পুত্র হারানোর শোক তিনি সহ্য করেছেন বিনা অশ্রুপাতে। যখন যেখানে যেতেন, সেখানে নিজের কথাটিই বলতেন যুক্তিসহ। কে গদিতে বা কারা কারা অপেক্ষায়, তার তোয়াক্কা করতেন না। তাকে কখনো কোনো বিরুদ্ধবাদীর সঙ্গে যুক্তিতর্কের বাইরে অজাচারী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতেও দেখিনি। এই সহনশীলতা মধ্যবিত্তের আপসকামিতা নয়, বরং উচ্চচিত্তের সমমর্মিতা। সাধারণত স্বশিক্ষিত জ্ঞানী ও ধ্যানীর ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখেছি। তাকে কখনা কোনো অভিযোগ করতেও দেখিনি। শত্রুকে মিত্র করে তোলার এক স্বভাবজাত শক্তি ছিল তার আয়ত্তাধীন। আবার প্রতিপক্ষকে বাগে পেয়ে হেনস্তা না করে তাকে পারতপক্ষে স্ব-সংশোধনে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ খুঁজতেন। আসলে বৈষয়িক বুদ্ধিহীন এমন সুশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত মানুষের দেখা কদাচ মেলে।

বৈদিক যুগে জন্ম নিলে তিনি কি ঋষি হতেন? তিনি সমাজের যেকোনো সংকটে নিজের মীমাংসামূলক যুক্তিই তুলে ধরেছেন। এটিই তার স্বশিক্ষার উদারতা ও সাহসিকতা। অহেতুক সংঘাতের পথ বেছে নেওয়ার প্রেসক্রিপশন তিনি দেননি কখনো। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়েও তিনি রাখঢাক করেননি। বিগত রাজনৈতিক সংকটের তুঙ্গ মুহূর্তে তিনি অকপটে সত্য কথা উচ্চারণ করেছেন। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে। 'বাংলাদেশে রাজনীতি খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে।... রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত।... কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়।' চাকরিরত অবস্থায় এমন কথা বলার সাহস আছে কার? আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্ত অবশ্যই নগণ্য। তাই তার মতো মানুষের বড় প্রয়োজন। সংঘটিত ঘটনাকে অস্বীকার করে নয়, তাকে গ্রহণ করেই সংশোধনের পথে এগোতে হবে। এ পথ সংঘাতের নয়, সমঝোতার। অজাচারের নয়, সদাচারের। বৈষম্যের নয়, সাম্যাচারের। তেমন একজন মানববরণ জ্ঞানসাধক আমার পরম শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই।

জাতির শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতির প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির আমৃত্যু সভাপতি তিনি। কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন? আসলে তিনিই তো জাতির জন্য এক প্রমিত পুরস্কার। এবার ফেব্রুয়ারির অমর একুশের বইমেলায় এক শুক্রবারে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেই শেষ দেখা। দুজন সঙ্গীর কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন ধীরে ধীরে। আমাকে দেখেই বললেন, 'কেমন আছেন কবি? কবিতা লিখছেন তো?' আমি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লাম। এমন ভালো মানুষ কোটিতেও মেলে না। অনন্তলোকে অনন্তকাল আপনিও ভালো থাকুন, আমার শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই।

লেখক: কবি ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

বাজেট প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নাকি সংস্কারের হারানো সুযোগ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
বাজেট প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নাকি সংস্কারের হারানো সুযোগ
শাফিকুল হক

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়, তাহলে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতেই হবে। একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের ওপর।...


জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের রূপরেখা। এমন এক সময়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীরগতির বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থানের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল একদিকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা।

সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বড় হলেও ব্যয়ের সম্প্রসারণে একটি সংযত অবস্থান প্রতিফলিত করে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ, উন্নয়ন ব্যয় এবং বাজেটঘাটতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রশ্ন হলো-এই বাজেট কি দেশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলোর যথেষ্ট সমাধান দিতে পেরেছে? নাকি এটি মূলত একটি স্থিতিশীলতাকেন্দ্রিক বাজেট, যেখানে কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি?

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্যপণ্যের দাম, বাসাভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বাস্তবে অনেক পরিবারের প্রকৃত আয় কমে গেছে, যদিও নামমাত্র আয় কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।

বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু ভর্তুকি বা সামাজিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং বাজার তদারকি জোরদার করা আরও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারত।

বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে উল্লেখ করেছে যে, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক। সুতরাং, মূল্যস্ফীতিকে কেবল মুদ্রানীতির। মাধ্যমে নয়, বরং কৃষি, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কারের মাধ্যমেও মোকাবিলা করতে হবে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এখনো কম। দীর্ঘদিন ধরে একই সীমিত জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ করের প্রধান বোঝা বহন করছে, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা করব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।

বাজেটে কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর, স্বয়ংক্রিয়তা এবং কর আদায় বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব হবে, যখন করব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং করদাতাবান্ধব করা যাবে। অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো, কর ফাঁকি রোধে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ পরোক্ষ করের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই বর্তায়, যা মূল্যস্ফীতির সময় আরও বেশি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দীর্ঘদিন ধরে করব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে আসছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। আর সেই উন্নয়নের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিল্পায়নের গতি, দক্ষতার ঘাটতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত হারে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের, স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প এবং গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবনে আরও লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা থাকলে কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারত। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সবুজ জ্বালানি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্য বাংলাদেশকে আরও প্রস্তুত করতে পারে।

কোনো অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না যদি বেসরকারি বিনিয়োগ শক্তিশালী না হয়। বর্তমানে উদ্যোক্তারা উচ্চ ঋণব্যয়, নীতিগত অনিশ্চয়তা, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতার মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি। বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকার থাকলেও ব্যবসা শুরু করা, লাইসেন্স গ্রহণ, কর পরিশোধ এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করার জন্য সুস্পষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা যেত।

বাংলাদেশ যদি আগামী দশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়, তাহলে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করতেই হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল দিক এখন ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকিব্যবস্থাপনায় ঘাটতি এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থার সংকট বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নিলেও, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য। আরও গভীর সংস্কার প্রয়োজন।

বাজেটে আর্থিক খাতের সুশাসন, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকলে তা বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংক উভয়ই আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রজারদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে, কারণ একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান জিডিপির তুলনায় কমলেও কর্মসংস্থান এবং খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে সীমাবদ্ধতা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বাজেটে কৃষি খাতে সহায়তা অব্যাহত থাকলেও কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, শীতলীকরণ ব্যবস্থা (কোল্ড চেইন), কৃষি গবেষণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে আরও বিনিয়োগ করা যেত। উৎপাদক যাতে ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তা খাতে সহনীয় দামে পণ্য কিনতে পারেন-সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা নীতিনির্ধারকদের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত।

একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার মানবসম্পদ। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। বাজেটে এ দুই খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ জরুরি। একইভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা সরঞ্জামের আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টি আরও অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, টেকসই কৃষি এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।

জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়ই বাংলাদেশে জলবায়ু, সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে একটি সাধারণ সমালোচনা হলো-ঘোষণা অনেক, কিন্তু বাস্তবায়ন তুলনামূলক দুর্বল। উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং জবাবদিহির সীমাবদ্ধতা কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে। তাই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্প মূল্যায়ন, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর জোর দেওয়া উচিত। উন্নয়নের সুফল তখনই জনগণের কাছে পৌঁছাবে, যখন বরাদ্দকৃত অর্থ দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সঙ্গে ব্যয় হবে।

শেষ কথা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট একটি কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে প্রণীত হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে এতে ইতিবাচক দিক রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, করব্যবস্থার সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আরও উচ্চাভিলাষী ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল।

একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাবের ওপর। যদি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, করব্যবস্থা আরও ন্যায়সঙ্গত হয় এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা যায়, তবে এই বাজেট তার উদ্দেশ্য পূরণে সফল হবে।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ যাত্রায় কেবল প্রবৃদ্ধির হার নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন, উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের বাজেটগুলো যদি এই মৌলিক নীতিগুলোকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক এবং টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

লেখক: অ্যাডভোকেট, সাবেক মেয়র, লন্ডন বরো অব টাওয়ার হ্যামলেটস, যুক্তরাজ্য

এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র!

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:২২ পিএম
এক মাসে ১০০ ধর্ষণ, শিশুর জন্য অনিরাপদ রাষ্ট্র!
দীপু মাহমুদ

এটা শুধু এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?...

জুন মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন মোট ১০০ জন নারী ও কিশোরী। তাদের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৪ জন, যাদের মধ্যে ১২ জন শিশু। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৪ জনের ওপর, যাদের মধ্যে ৩১ জনই শিশু। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ১১ জন, উত্ত্যক্তের শিকার ২৯ জন এবং সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন তিনজন। একই মাসে হত্যা করা হয়েছে ৫৪ জন নারীকে, রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। ধর্ষণের পর সাত শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

এই পরিসংখ্যান কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফল নয়, এটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসা মাত্র এক মাসের ঘটনাপঞ্জি। ২ জুলাই প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়েছে, দেশের ১৫টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, এগুলো সেই ঘটনাগুলো, যেগুলো কোনোভাবে সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছেছে। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, স্থানীয় প্রভাব কিংবা বিচারহীনতার আশঙ্কায় যে বিপুলসংখ্যক ঘটনা থানার জিডি কিংবা আদালতের নথিতেও পৌঁছায় না, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে।

অপরাধতত্ত্বে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, ‘ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম’। অর্থাৎ, সংঘটিত হলেও যেসব অপরাধ কখনোই রাষ্ট্রের নথিতে প্রবেশ করে না, সেগুলোই অপরাধের অদৃশ্য অংশ। যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে এই অদৃশ্য অংশ সাধারণত দৃশ্যমান অংশের চেয়েও বড় হয়ে থাকে। ফলে জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়, বরং গভীরতর বাস্তবতার দৃশ্যমান প্রান্তভাগ মাত্র।

এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো–ধর্ষণের শিকার অধিকাংশই শিশু। ধর্ষণের শিকার ১০০ জনের মধ্যে ৭২ জনই শিশু। ধর্ষণের চেষ্টার শিকারদের মধ্যেও প্রায় সবাই শিশু। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকারদের অর্ধেকও শিশু। অর্থাৎ, বাংলাদেশের সমাজে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে সেই জনগোষ্ঠী, যাদের নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষমতাই সবচেয়ে কম।

যেকোনো সমাজের নৈতিকতা পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভুল উপায় হচ্ছে তার শিশুদের নিরাপত্তার মানদণ্ড। সেই বিচারে এই পরিসংখ্যান কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্র নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক সংকটেরও দলিল।

ধর্ষণকে অনেক সময় ভুলভাবে কেবল যৌন অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। অথচ সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধতত্ত্বের গবেষণা বলছে, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্যের অপরাধ। এটি নারীর শরীরের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা হলেও এর লক্ষ্য প্রায়ই নারীকে ভয় দেখানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিকভাবে অধস্তন অবস্থানে রাখার প্রচেষ্টা। সে কারণেই যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা কিংবা দুর্বল আইনশৃঙ্খলার সময়ে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

সমকালের প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি নারী নির্যাতনের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। জুন মাসে বিভিন্ন ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৪ জন নারী ও কিশোরী। রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন আরও ৩৩ জন। আত্মহত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, পারিবারিক সহিংসতা, গৃহকর্মী নির্যাতন, অপহরণ, পাচার, শারীরিক নির্যাতন–সব মিলিয়ে এক মাসে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৩৩ জন নারী ও কিশোরী। অর্থাৎ, সমস্যাটি কেবল ধর্ষণের নয়, সমস্যাটি নারীর প্রতি সামগ্রিক সামাজিক সহিংসতার।

বাংলাদেশের উন্নয়ন-আখ্যানের সঙ্গে এই বাস্তবতার গভীর বৈপরীত্য আছে। গত দুই দশকে নারীর শিক্ষার হার বেড়েছে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বেও নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সূচকের বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকেই ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু উন্নয়নের এই পরিসংখ্যান তখনই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে পড়ে, যখন দেখা যায় মেয়েশিশু বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপদ নয়, নারী কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পথে নিরাপদ নন, এমনকি অনেক সময় নিজের ঘরেও নিরাপদ নন।

আইন আছে, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আছে, কঠোর শাস্তির বিধানও আছে। অপরাধতত্ত্বের মৌলিক সত্য হলো, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তির নিশ্চয়তা অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। একজন সম্ভাব্য অপরাধী মৃত্যুদণ্ডের ভয় যতটা না পায়, তার চেয়ে বেশি ভয় পায় দ্রুত ও নিশ্চিত বিচারের সম্ভাবনাকে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তদন্তের ধীরগতি, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা প্রায়ই এই নিশ্চয়তাকে দুর্বল করে দেয়।

এখানে আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আমাদের সমাজ এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে অভ্যস্ত। অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, সময় কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই মানসিকতা শুধু ভুক্তভোগীর প্রতি অন্যায় নয়, এটা অপরাধীর জন্য সামাজিক আশ্রয়ও তৈরি করে। যে সমাজ ভুক্তভোগীকে নীরব থাকতে শেখায়, সে সমাজ অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধীকে সাহস জোগায়।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার পঞ্চম লক্ষ্য হলো নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতার অবসান এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই লক্ষ্য কেবল আইনের বইয়ে নতুন ধারা যুক্ত করে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা, আধুনিক ও দক্ষ তদন্ত কাঠামো, শিক্ষাব্যবস্থায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মতির শিক্ষা এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা অবকাঠামোগত সাফল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক আরও সহজ প্রশ্ন–শিশু কি নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে? নারী কি নিরাপদে কর্মক্ষেত্র থেকে বাড়ি ফিরতে পারেন? কিশোরী কি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের বদলে স্বপ্ন দেখতে পারে?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো অনিশ্চিত থাকে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, রাষ্ট্রের নৈতিক হিসাবের খাতায় বড় ঘাটতি থেকেই যাবে।

জুন মাসের ১০০ ধর্ষণের ঘটনা তাই কেবল এক মাসের অপরাধ পরিসংখ্যান নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১০০টি প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিটি প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে একই জিজ্ঞাসা–উন্নয়নের এই দীর্ঘ যাত্রায় আমরা কি সত্যিই আমাদের নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, নাকি আমরা এখনো অগ্রগতির সংখ্যার আড়ালে গভীর সামাজিক ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখছি?

লেখক: কথাসাহিত্যিক

চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে
আবুল কাসেম ফজলুল হক

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ লেখক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রয়াণে খবরের কাগজ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। তিনি খবরের কাগজ- নিয়মিত লিখতেন। ২০২৪ সালের আগস্ট খবরের কাগজ- প্রকাশিত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কলাম পাঠকদের জন্য পুনর্মুদ্রণ করা হলো। -বিভাগীয় সম্পাদক

দেশে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে কতদিন দেশ শাসন করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকে রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।...

বাংলাদেশের রাজনীতি খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে। সরকার যে রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে পরিচালিত হয়, সেই শক্তি মাঝে মাঝে ব্যবহার করার মতো অবস্থায় সরকার থাকে না। রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ও হলের ছাত্ররা সেই দলের রাজনীতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকা উচিত নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক দলের প্রভাবের কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে শিক্ষক ও ছাত্রদের দুরূহ অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এখন ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যাচ্ছেন। যখন দেশে কোনো ক্রান্তিকাল আসে, তখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে এমন ঘটনা দেখা যায়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে এবারই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এত মানুষ মারা গেল, যা কখনো কেউ চিন্তা করেনি। সরকারের বোঝা উচিত ছিল ছাত্র আন্দোলন বড় আকার ধারণ করতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতাই বলা যায়।

এখন দেশের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এটা জাতীয় জীবনে বড় দুর্যোগের লক্ষণ। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার কেন সমঝোতা করতে পারল না? কোটা সংস্কার আন্দোলন সমাধানযোগ্য ছিল। সরকার কেন ছাত্রদের ওপর বাহিনী নামিয়ে দিল এবং দেশে কারফিউ জারি করল? সরকার ছাত্রদের এভাবে শান্ত করতে পারে না। সেনাবাহিনী ও পুলিশ দিয়ে ছাত্রদের কেন শান্ত করতে গেল। রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধান করা দরকার ছিল। বাহিনী দিয়ে কতদিন দেশ শান্ত রাখা যায়? সরকারকে রাজনৈতিকভাবেই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে।

বর্তমান সরকারি দল বেশ বড় এবং শক্তিশালী। তা ছাড়া বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শক্তি একদমই ভেঙে পড়েছে। বিএনপি দেখতে অনেক বড় দল মনে হলেও আসলে তেমন শক্তিশালী নয়। তারা ইতোপূর্বে সরকার হটানোর জন্য অনেক আন্দোলন করেছে। কিন্তু তাতে কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। কাজেই জাতীয় রাজনীতির নিম্নগামিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ আছে, তাদের মধ্যেও অনেক সমস্যা রয়ে গেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে যে জাতীয় সমস্যার রূপ নিয়েছে তার সমাধান করা জরুরি। এভাবে বিক্ষিপ্তভাবে দেশ চলতে পারে না। যারা দেশের বুদ্ধিজীবী আছেন, তারাও সরকারকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারছেন না। আন্দোলনকে ঘিরে যখন দেশে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলল, তখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন যে, বিএনপি ও জামায়াত এসব কাজ করেছে। গণমাধ্যমে যা উঠে এসেছে, তাতে মনে হলো অন্য কোনো রহস্য আছে। এর ভেতরে দেশদ্রোহের ব্যাপার আছে, যারা এসব কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান যে সংকট তৈরি হয়েছে তা সহজে নির্মূল হওয়ার নয়। এ ক্ষেত্রে বিশিষ্টজনরা, বিভিন্ন বাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থা এর উত্তরণে ভালো পরামর্শ দিতে পারবে। তবে সরকার খুব চেষ্টা করলে এই আন্দোলনের ভেতরের রহস্য বের করতে পারবে। সরকার রহস্য ভেদ করে সংকট মোকাবিলা করার পথ বের করতে পারে। সেই রহস্য জনগণকে জানাতেও পারে, না-ও পারে।

সরকার দেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ দিয়ে জামায়াত, বিএনপির লোক গ্রেপ্তার করছে। দেশে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ তারাই করেছে বলে সরকার মনে করছে। তবে ছাত্ররা এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে না। তাই অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করায় দেশের বিপদ আরও বাড়বে। ছাত্ররা কী চায়? তাদের পালস বুঝেই সরকারের সমাধানের পথ বের করতে হবে। ছাত্রদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল এবং সমাধানযোগ্য ছিল। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এত মানুষ মারা গেল? এটা সামান্য কোনো বিষয় নয়। এ কারণেই এ হত্যার বিচার চেয়ে সারা দেশের মানুষ মাঠে নেমে গেছে। তবে এখনো সরকারের হাতেই নিয়ন্ত্রণ আছে। সরকার এই আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপটের রহস্য বের করে সমাধান করতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। শিক্ষকদের অনেক আগেই ছাত্রদের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল। তা হলে এতগুলো ছাত্রের প্রাণ যেত না। শিক্ষকরাই ছাত্রদের অভিভাবক এবং তাদেরই সর্বপ্রথম ছাত্রদের পাশে এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এত শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ফলে ছাত্রদের অভিভাবকরা তাদের সন্তাদের নিয়ে অনেক চিন্তিত। মানসিক দুশ্চিন্তার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে অভিভাবকরা। তাদের সন্তানরাও মানসিক ট্রমাতে ভুগছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তান নিশ্চিন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে পারবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় দেখা দিয়েছে।

সুস্থ রাজনীতি না থাকলে জাতি কখনো উন্নতি লাভ করতে পারে না। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি লাভ করেছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কোনো উন্নতি লাভ করেনি। মানুষের সব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুস্থ রাজনীতি বিরাজ করতে হবে। বর্তমান রাজনীতিবিদদের মধ্যে সেই চিন্তা নেই। আগের দিনে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ছিল, বর্তমানে তা নেই। বুদ্ধিজীবীদের এখন বিশিষ্ট নাগরিক বলে থাকে। রাজনীতিবিদদের ভেতরেই শুধু সমস্যা তা নয়, বাইরে থেকেও কোনো কোনো শক্তি রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেকভাবে বুদ্ধি দিয়ে দেশকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এখন যেভাবে আন্দোলন চলছে তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। তবে মনে হয়, এখন যে আন্দোলন হচ্ছে তা সরকারবিরোধী।

দেশের অর্থনীতি একদমই ভেঙে পড়ছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়লে সেখানে সুস্থ রাজনীতি টিকে থাকা দায়। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একরকম ভালোই চলছিল। কিন্তু সরকারি দল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর বেশি প্রভাব বিস্তার করে, তখন শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ থাকতে পারে না। দলীয়করণ এত বেশি বেড়েছে যে, শিক্ষার ভালো পরিবেশ আর নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কবে যে রাজনীতিমুক্ত হবে, তার কোনো লক্ষণ নেই। দেশের রাজনীতি যদি ঠিক না থাকে, তা হলে সবকিছুই ভেঙে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো কি কখনো চায় যে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ রাজনীতিতে সক্রিয় ও উন্নত হোক। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা কেন এটা বুঝতে পারে না। রাজনীতিবিদরা বাইরের পরামর্শ নিতে সজাগ থাকা উচিত। অতএব এটা স্পষ্টভাবেই বুঝতে হবে যে, পশ্চিমা শক্তির দ্বারা এ ধরনের আন্দোলন পরিচালিত হয়ে থাকে। দেশীয় রাজনীতি বাইরের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতি ভারত, রাশিয়া ও চীন দ্বারা প্রভাবিত। ভারত বাংলাদেশের অনুকূল হয়ে সব সময় কাজ করে থাকে। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো নিজেদেরই মোকাবিলা করতে হবে।

ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবারের নির্বাচনের সময় থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল। এখনো ছাত্রদের সাধারণ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক যদি সরকারের বিপক্ষে কাজ করে, তা হলে বাংলাদেশের রাজনীতি কি এগোতে পারে? বাংলাদেশের রাজনীতিকে জনগণের রাজনীতিতে পরিণত হতে বেশ কিছু সময় লাগবে। বাংলাদেশকে স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নিতে সরকার সহযোগিতা পাচ্ছে না। জাতীয় নির্বাচনের আগে আমেরিকা আমাদের দেশের রাজনীতিতে কতভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতেই অনুমান করা যায়, ছাত্রদের আন্দোলনের এই সুযোগ আমেরিকা কখনো হাতছাড়া করবে না। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হতো, তা হলে আমেরিকা কি এভাবে দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত? যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যেভাবে বাংলাদেশের ওপর কথা বলেছে, স্বাধীন দেশের সরকারকে তারা কি এভাবে কথা বলার অধিকার রাখে? এ জন্য দেশে সুস্থ রাজনীতির খুব দরকার।

দেশে সরকার পতনের আন্দোলন চলছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি দিয়ে কতদিন দেশ শাসন করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতির সমাধান করতে হলে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। রাজনৈতিক দলকে নিজেদের দলীয় অবস্থান থেকে রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে।    

লেখক: সাবেক অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে?

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি কতটুকু পূরণ করবে?
এ এইচ এম কিশোয়ার হোসেন এবং রেউন তানজিন অশ্রু

দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।...

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার ১০০ নম্বর অনুচ্ছেদে এমন একটি স্বীকারোক্তি রয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের কোনো অর্থমন্ত্রী এর আগে এত স্পষ্টভাবে বলেননি। তার মতে, বছরের পর বছর অবহেলা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং জবাবদিহির অভাব দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘দুর্বল ও অকার্যকর’ করে তুলেছে। বাজেট বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় সেবার মান উন্নত হয়নি। বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই মানুষ নিজের পকেট থেকে বহন করে। বিশ্বব্যাংক ও সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, এই হার শুধু দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ নয়; জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যেও পিছিয়ে রয়েছে।

এখন প্রশ্ন সরকার যে সমস্যাগুলোর কথা স্বীকার করেছে, বাজেটে প্রস্তাবিত সমাধানগুলো কি সেই সমস্যার গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? বরাদ্দের সংখ্যাগুলো কি সত্যিই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, নাকি এগুলো কেবল উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতির আরেকটি অধ্যায়? সর্বোপরি, ১৭ কোটি মানুষের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য বাস্তবতা এবং ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে এই বাজেটকে কীভাবে মূল্যায়ন করা উচিত? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই এই বিশ্লেষণটি এগোবে পাঁচটি পরস্পরসংযুক্ত ক্ষেত্র ধরে: স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের কাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের দ্রুত পরিবর্তিত জনমিতিক বাস্তবতা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা সংশোধিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতের অংশ বেড়েছে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ০২ শতাংশে, যা উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ বৃদ্ধি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হবে? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাংলাদেশ এখনো আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় পিছিয়ে। ভারত ও শ্রীলঙ্কা সরকারি স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির প্রায় যথাক্রমে ২ দশমিক ১ শতাংশ ও ১ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় করে, আর দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের প্রায় ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ১ শতাংশের সীমা অতিক্রম করলেও এখনো তা অপ্রতুল। এ ছাড়া ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিত করতে যে ন্যূনতম সরকারি ব্যয়ের কথা WHO উল্লেখ করে (৮০ থেকে ১০০ ডলার), বর্তমান বরাদ্দ তারও অনেক কম (২৭ মার্কিন ডলার)। সরকার আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই ৫ শতাংশে পৌঁছাতে হলে প্রতি বছর গড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট করে বৃদ্ধি দরকার হবে অর্থাৎ লক্ষ্যে পৌঁছাতে আরও দ্রুত গতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা-সম্পর্কিত বাজেট বরাদ্দ (২০২৬-২৭): স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ৬৯,৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ০২ শতাংশ; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ (সংশোধিত): ৩৫,৪৭৭ কোটি, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ; বার্ষিক পরিবর্তন: +৯৫.৬ শতাংশ; প্রাথমিক স্বাস্থ্য/জনসংখ্যা উদ্দেশ্য: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জনবল, ইউএইচসি, পুষ্টি।

বাংলাদেশের জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশল ২০২৫-২০৩০ পরিবার পরিকল্পনায় শূন্য অপূর্ণ চাহিদা, শূন্য প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যু এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও ক্ষতিকর সামাজিক প্রথার অবসান। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDGs) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই লক্ষ্যগুলো নিঃসন্দেহে সাহসী অঙ্গীকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমআইসিএস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়েছে, যা ২০১৯-এ ছিল ৫১.৪ শতাংশ। বর্তমান অগ্রগতির গতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে শিশু বিবাহের হার ৪০ শতাংশের ওপরে থাকবে।

পরিবার পরিকল্পনা খাতেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১২ শতাংশ বিবাহিত নারীর পরিবার পরিকল্পনা সেবার অপূর্ণ চাহিদা রয়েছে এবং আধুনিক গর্ভনিরোধক ব্যবহার হার প্রায় ৬১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপূর্ণ চাহিদা কার্যকরভাবে দূর করতে এই হারকে ৭০ শতাংশেরও বেশি পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পুনর্গঠন এবং ৬০ হাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ যদিও এই বাজেটে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা, জনবল মোতায়েন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাস্তবায়ন ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা নেই।

২০২৬-২৭ সালের বাজেটের স্বাস্থ্য অধ্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো স্বাস্থ্য জনবলে বিনিয়োগ। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম, আর নার্সিং খাতও বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গুরুত্ব ও বিনিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে যার প্রায় ৮০ হাজার হবেন নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এটি শুধু কর্মসংস্থানে নারীর ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নয়; বরং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে নার্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, এমএসসি নার্সিং কর্মসূচি চালু, চার বছর মেয়াদি বিএসসি নার্সিং শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ এই বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এসব পদক্ষেপের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না। তবে দক্ষ নার্স, প্রশিক্ষক এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হলে আগামী দুই থেকে তিন দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

এই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাত ৯০টিরও বেশি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে সমন্বয়ের অভাবে অনেক প্রকৃত সুবিধাভোগী আবার বাদ পড়ে যান। এই বাস্তবতায় সরকার ‘পরিবার কার্ড’কেন্দ্রিক একটি জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ মা ও নারী-প্রধান পরিবারের কাছে মাসে ২,৫০০ টাকা করে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। গবেষণা বলছে, নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছালে সেই অর্থের বড় অংশ শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় হয়। এ ছাড়া সম্প্রসারিত মা ও শিশু-সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে প্রায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার সুবিধাভোগী মাসে ৮৫০ টাকা করে পাচ্ছেন। এ কর্মসূচি গর্ভাবস্থা এবং শিশুর জীবনের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে সহায়তা করে। এ ছাড়া ক্যানসারসহ ছয়টি গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে তার জনমিতিক লভ্যাংশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অবস্থান করছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশই কর্মক্ষম বয়সী (১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়স ধরে), যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুবিধার সময়সীমা অনন্ত নয়। আগামী দশকগুলোতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল মানুষের হারও বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশের বয়স্ক জনসংখ্যা মোটের শতকরা হিসাবে: ঐতিহাসিক ও আনুমানিক (২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত) ২০২৫ সালে ৬০ বছর ঊর্ধ্ব বয়সের মোট জনসংখ্যা ছিল ৯.৩ শতাংশ, যা  আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ। ২০৪০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা হবে ১৮.৮ শতাংশ, যা আনুমানিক কোটি ২০ লাখ। ২০৫০ সালে ৬০ বছর বয়স ঊর্ধ্ব মোট জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২২.০ শতাংশে, যা আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ।

সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বাজেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক উদ্যোগ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির পরিমাণ উন্নীত হওয়া, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ যার বড় অংশ নারী; নতুন মিডওয়াইফ পদ সৃষ্টি; এবং নার্সিং শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার–এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি শক্তিশালী হবে। তবে এগুলোর পাশাপাশি শিশু বিবাহ, স্বাস্থ্য ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষার মতন বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। আর এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য বরাদ্দের অঙ্কে নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে। দুর্গম চরের গর্ভবতী নারী জরুরি সময়ে সেবা পাচ্ছেন কি না, কোনো শিশু অপুষ্টির বদলে সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে কি না, কিংবা কোনো প্রবীণ ব্যক্তি চিকিৎসার খরচ মেটাতে নিজের সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কি না এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই বাজেটকে একটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় সূচনা হিসেবে দেখা উচিত।


লেখক: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
এবং
গবেষক, আইসিডিডিআর বি, ঢাকা
[email protected]

যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম
যুদ্ধাপরাধ এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি
আনু মুহাম্মদ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।... 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘরে ঘরে ধর্মচর্চা বেড়ে গিয়েছিল। অনিশ্চয়তার মুখে নিরাপত্তার প্রার্থনায় নামাজ, কোরআন খতম, জিকির, দোয়া-দরুদ সবই বেড়েছিল মুসলিম পরিবারগুলোতে, আমাদের পরিবারে তার অংশীদার ছিলাম আমিসহ সব ভাইবোনই। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যারা অংশ নিয়েছেন, যারা সহায়তা করেছেন, মুসলমান হলে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আলবদরদের নৃশংসতার মুখে, আল্লাহ ও রসুলের ওপর ভরসাই ছিল তাদের বড় অবলম্বন।

কিন্তু অন্যদিকে জামায়াতসহ প্রায় সব ইসলামপন্থি দল পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। অধিকাংশ প্রভাবশালী পীরের ভূমিকাও ছিল একইরকম। তাদের কেউ কেউ সরাসরি পাকিস্তান বাহিনীর গণহত্যা, নারী নির্যাতনের পক্ষে সাফাইও গেয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো–যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পীর বা নেতা হিসেবে এদেরই মেনেছেন জীবনভর, তারা উল্টো মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছেন। ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান তাদের প্রভাবিত করতে পারেনি। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের মানুষ এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা থেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা আলাদা করে রেখেছেন।

ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয় যে, বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানায়নি, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার জন্য কোনো মিছিল করেনি, সংবিধানকে পরিবর্তন করার জন্য দাবি তোলেনি, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার পক্ষেও কোনো মত প্রকাশ করেনি কিন্তু তবুও বিভিন্ন সময়ে শাসকগোষ্ঠী এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের নিজেদের সুবিধার্থে, অন্য ব্যর্থতাকে আড়াল করতে কিংবা জনগণের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশে (এবং ’৭১ পূর্ব ও পরবর্তী পাকিস্তানে) সামরিক শাসনের কালে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রসার ঘটেছে সব চেয়ে বেশি। এর বাইরে বুর্জোয়া রাজনীতির সংকট এবং বাম রাজনীতির বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি ধর্মপন্থি রাজনীতির পরিসর বাড়িয়েছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ ঘটেছে অসংখ্য। মূল যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন পার পেয়ে গেছে প্রথমেই। স্বাধীনতার পর ‘দালাল আইন’ করে দেশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়। একপর্যায়ে ১৯৭৩ সালে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বাদে বাকি সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করা হয়। এর ফাঁক দিয়ে বড়-ছোট অনেক অপরাধীই পার পেয়ে যায়।

এ সময়ে ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, মাদ্রাসা খাতে ব্যয়বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কর্মসূচি নেন শেখ মুজিব। একই সঙ্গে তিনি ইসলামি শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্ভবত, ‘ধর্মহীনতা’র মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী অর্থনীতির সংস্কারও শুরু হয় এ সময়েই। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ১৯৭৪-এ আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। এরপর জরুরি অবস্থা এবং একদলীয় শাসনে আপাতদৃষ্টিতে মহাপরাক্রমশালী সরকার প্রকৃতপক্ষে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হন সামরিক বাহিনীর একাংশ দ্বারা এবং শুরু হয় সামরিক শাসন।

সামরিক শাসনামলে পাকবাহিনীর সহযোগী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমে বৈধতা পায়। সেই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে সক্রিয় ব্যক্তিরাও সমাজে রাজনীতিতে আবারও ফিরে আসতে থাকে। ১৯৭৮ সালে জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে তার কার্যক্রম শুরু করলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রথম আন্দোলন সূচিত হয়। সে সময় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছিল ঐক্যবদ্ধ এবং দেশজুড়ে প্রভাবশালী। কর্নেল কাজী নূরুজ্জামানের নেতৃত্বে তারাই এই আন্দোলন সারা দেশে বিস্তৃত করে। জামান সাহেবের ভাষ্য অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে জিয়া নিহত হন, একই সূত্রে আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসার নিহত হন। সে সময় সেনাপ্রধান হিসেবে এরশাদই ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে।

১৯৮২ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে উচ্ছেদ করে এরশাদের নেতৃত্বে আবারও সামরিক শাসন শুরু হয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যু ধামাচাপা পড়ে যায়। পুরো ৮০ দশকজুড়ে এরশাদ তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখবার জন্য ধর্ম, ধর্মপন্থি দল, মাদ্রাসা, পীর, মাজার ইত্যাদির যথেচ্ছাচার ব্যবহার করেন। ক্ষমতার সুবিধার্থে দুর্বৃত্ত কিছু নেতাকে দুহাতে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। এই সময়েই ধর্মের বাণিজ্যিকীকরণ, পীর ও ধর্মপন্থি দলগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি সম্প্রসারণ ঘটে সব চেয়ে বেশি। শীর্ষপদ থেকে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে তখনই।

এই দশকে এরশাদ স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দল ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল পরিচালিত আন্দোলনে সমঝোতার মধ্যদিয়েই যুগপৎ কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী অংশীদার হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সংসদ নির্বাচন দিয়ে ক্রমবর্ধমান জনপ্রতিরোধ থেকে নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ১৫ দলের কয়েকটি দলের সঙ্গে  জামায়াতও অংশ নেয়। নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও কয়েকটি বাম দল। ১৫ দল ভেঙে ৫ বাম দল আলাদা হয়ে যায়। একদিকে প্রশাসনের প্রশ্রয় অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশীদারের বৈধতা নিয়ে এই দশকেই জামায়াতে ইসলাম দেশব্যাপী নিজেদের দলের সব চেয়ে বেশি সম্প্রসারণ ঘটাতে সমর্থ হয়। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের দক্ষ কৌশলী নানা প্রতিষ্ঠান সংগঠিত হয় এসময়েই।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের দ্বন্দ্ব সংঘাত বাড়তে থাকে। বিশেষত আশির দশকের দ্বিতীয় ভাগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিবিরের সন্ত্রাস, রগকাটা, হত্যার বহু খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। শিবিরের সঙ্গে প্রধানত সংঘাত হয় বাম সংগঠনগুলোর, কিন্তু ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সঙ্গেও অনেক রক্তাক্ত সংঘাত দেখা যায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হাতে ছাত্রদল নেতা কবির নিহত হন ১৯৮৯ সালে। এরপরই বাকি সব ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এই দশকেই বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি জোরদারভাবে বাস্তবায়ন হতে থাকে। সে অনুযায়ী শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক তৎপরতার সুযোগ উন্মুক্ত হয়। ক্রমে শিক্ষা, ব্যাংক, বিমা, কম্পিউটার, এনজিও সব ক্ষেত্রে জামায়াত দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সরকারি প্রশাসন, বিনিয়োগ খাত, এনজিওসহ কয়েকটি দেশের দূতাবাস মিলে জামায়াতের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক দাঁড়ায়। একদিকে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি দুই পক্ষের জন্যই অনুকূল সময় ছিল এরশাদের স্বৈরশাসন।

১৯৮৭ সালের শেষ দিকে এরশাদ স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন ব্যাপক আকার নেয়। ১০ নভেম্বর বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে সরকারবিরোধী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন নূর হোসেন। পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হওয়ার পর গণপ্রতিরোধ দ্রুত গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। জরুরি অবস্থা দিয়ে এরশাদ কোনোভাবে সামাল দিতে সক্ষম হন। ক্ষমতার বৈধতা তৈরি করতে তিনি আবার সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সে নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন আট দল, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাত দল, পাঁচ বাম দল, জামায়াতসহ সবাই।

১৯৮৮ সালে কতিপয় ‘গৃহপালিত’ দল নিয়ে করা এই প্রহসনের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে মানুষজনই দেখা যায়নি। তবে ঘোষিত ফলাফলে বিপুল ভোটে এরশাদের দল বিজয়ী হয়। এরশাদ সরকার নিজের জনধিকৃত গদির বৈধতা আদায় করতে সেই চরম প্রহসনমূলক ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত সংসদে ইসলামকে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ করে সংবিধান সংশোধন করে। তবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ ওপরের সব দলই এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।    

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক