জাতির শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতির প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির আমৃত্যু সভাপতি তিনি। কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন? আসলে তিনিই তো জাতির জন্য এক প্রমিত পুরস্কার। আমাকে দেখেই বললেন, 'কেমন আছেন কবি? কবিতা লিখছেন তো?' আমি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লাম। এমন ভালো মানুষ কোটিতেও মেলে না।...

সমাজ বিবর্তনের পথে মানুষের যে অগ্রযাত্রা, তা ব্যাহত হয়েছে যুগে যুগে। সমরূপ বৈশিষ্ট্যের মানবগোষ্ঠীর মধ্যে হঠাৎ বা পরিকল্পিতভাবে যদি অভাবিতপূর্ব অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে, তখন সে সমাজে চিড় ধরতে শুরু করে নানাভাবে। আর জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিভিন্ন বিভাজন সূচিত হয়। উপমহাদেশে এমন ভাঙন ও অবিশ্বাস প্রবল হতে শুরু করে বাণিজ্যের বাহানায় নানা য়ুরোপীয় শক্তির আগমনের ফলে। তারাই শেষতক এই উপমহাদেশের রাজনৈতিক শাসনভার কবজা করার পর বিদায়ের আগে তাদের মধ্যে মানসিক, আত্মিক, আর্থিক, বিশ্বাসভিত্তিক তথা পরিকল্পিত নানা বিভাজন সৃষ্টি করেছে আর অনৈক্য ও অব্যাহত ভাঙনের বীজও বপন করেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি অন্তত বিগত তিন শতকজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে চরম অস্থির ও আক্রমণাত্মক রূপ গ্রহণ করেছে। এখন তার বিস্তার বিশ্বব্যাপী; যার ফলাফল দুটি বিশ্বযুদ্ধ; আর সাম্প্রতিকালে আরেকটি পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধের পরিকল্পিত মহড়া। এই সহিংস মানব বিভাজনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মাঙ্গলিক ও মানবতাবাদী যে ঐক্য, তারই এক প্রমুখ বোদ্ধা ও কলযোদ্ধার নাম অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার অনন্ত গমনের প্রাক্কালে জাতির পক্ষ থেকে তাকে অবনতচিত্তে অভিবাদন জানাই।
তার সঙ্গে পরিচয় সেই ১৯৬৭ সাল থেকে, যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে গবেষক হিসেবে জীবন শুরু করেছেন। আমি তখন ইংরেজি বিভাগে অনার্সের ছাত্র। আমাদের যোগাযোগ-সূত্র ছিলেন আমাদের কালের আরেক সন্ত আহমদ ছফা। ইংরেজি বিভাগ ও বাংলা বিভাগ পাশাপাশি হওয়ার ফলে আমাদের দেখা হতো সকাল-বিকেল। আমাদের আরেক আড্ডাসঙ্গী ছিলেন আজকের বিখ্যাত ভাষাবিদ প্রফেসর মনুসর মুসা। ছফা ভাই, মুসা ভাই আর আমার যোগসূত্র ছিল কতকটা আঞ্চলিক; আমরা তিনজনই চাটগাঁইয়া। কিন্তু কাশেম ভাইর সঙ্গে সম্পর্কের কারণ কেবল সাহিত্যচর্চা, মানবিকতা, সাম্যবাদ আর সৃষ্টিশীলতা। আরেকজনের নামও মনে পড়ে, তিনি অকালপ্রয়াত কবি হুমায়ুন কবির। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো কলা ভবনের বারান্দায়, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারের চত্বরে কিংবা শরিফ মিঞা বা আফসার মিঞার দোকানে। মাঝে মাঝে মধুর ক্যানটিনেও। আমাদের ভেতর সব বিষয়ে ঐকমত্য ছিল বা আছে এমন নয়, তবে আমরা সবাই ছিলাম সৃষ্টিশীলতা ও সাম্যবাদী মঙ্গলময়তায় অঙ্গীকৃত।
এক বিশ্ব, এক মানবজাতি, প্রত্যেক মানুষের জন্য অহিংস ও সদাচারী জীবনযাপনের নিশ্চয়তায় আমি বা আমরা বিশ্বাসী। এই যুক্তির ভিত্তিমূলে মানুষের যে আদি উৎস আর তার নৈয়ায়িক বিস্তার এই গ্রহব্যাপী, তার সপক্ষে তাত্ত্বিক যুক্তি যারা সাজাতেন, কাশেম ভাই ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। আমি প্রায় বিনাবাক্যে তার কথা শোনার অভ্যেস রপ্ত করেছিলাম। কাসেম ভাই যুক্তির পর যুক্তি সাজাতেন; বয়ান যত দীর্ঘই হোক, শেষ না করে থামতেন না।
তিনি বাংলা বিভাগে গবেষণায় যুক্ত হয়ে শেষতক সেই বিভাগেই অধ্যাপক পদে উন্নীত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। কিন্তু হাতের কাছে অবারিত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ডক্টরেট ডিগ্রি গ্রহণ করেননি। এ ক্ষেত্রে তাকে তারই শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই কিংবা মুনীর চৌধুরীর পদাঙ্ক অনুসারী বলে মনে হয়। আসলে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা পারিবারিকভাবেও তিনি এই একাডেমিক জীবনচর্চায় সমর্পিত একজন নৈয়ায়িক শিক্ষক। তারই যোগ্য পুরস্কার পেয়েছেন ব্যক্তিক ও পারিবারিক পর্যায়ে। তার সহধর্মিণী আর পুত্র-কন্যাও তারই আদর্শ আর নৈয়ায়িক পেশার উত্তরসূরি।
ছিয়াশি বছরের জীবনে তিনি তেমন ভোল পাল্টাননি, যা অনেকেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিরীক্ষা-পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন। প্রচুর জ্ঞানের কথা বলতেন তিনি; চীন, মধ্যপ্রাচ্য বা গ্রিস দেশীয় দার্শনিকদের কথা, কিংবা এ কালের পোস্টমডার্ন বা মেটামডার্ন তত্ত্বের কথা। তবে কোনো বিষয়েই তিনি নিজের মত জ্ঞাপন করতে পিছপা হতেন না। সব সমালোচনা, কষ্ট, শোক-দুঃখ হজম করার এক বিরল সহনশীলতা ছিল তার করায়ত্ত। অকালে পুত্র হারানোর শোক তিনি সহ্য করেছেন বিনা অশ্রুপাতে। যখন যেখানে যেতেন, সেখানে নিজের কথাটিই বলতেন যুক্তিসহ। কে গদিতে বা কারা কারা অপেক্ষায়, তার তোয়াক্কা করতেন না। তাকে কখনো কোনো বিরুদ্ধবাদীর সঙ্গে যুক্তিতর্কের বাইরে অজাচারী দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতেও দেখিনি। এই সহনশীলতা মধ্যবিত্তের আপসকামিতা নয়, বরং উচ্চচিত্তের সমমর্মিতা। সাধারণত স্বশিক্ষিত জ্ঞানী ও ধ্যানীর ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখেছি। তাকে কখনা কোনো অভিযোগ করতেও দেখিনি। শত্রুকে মিত্র করে তোলার এক স্বভাবজাত শক্তি ছিল তার আয়ত্তাধীন। আবার প্রতিপক্ষকে বাগে পেয়ে হেনস্তা না করে তাকে পারতপক্ষে স্ব-সংশোধনে অনুপ্রাণিত করার সুযোগ খুঁজতেন। আসলে বৈষয়িক বুদ্ধিহীন এমন সুশিক্ষিত বা স্বশিক্ষিত মানুষের দেখা কদাচ মেলে।
বৈদিক যুগে জন্ম নিলে তিনি কি ঋষি হতেন? তিনি সমাজের যেকোনো সংকটে নিজের মীমাংসামূলক যুক্তিই তুলে ধরেছেন। এটিই তার স্বশিক্ষার উদারতা ও সাহসিকতা। অহেতুক সংঘাতের পথ বেছে নেওয়ার প্রেসক্রিপশন তিনি দেননি কখনো। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়েও তিনি রাখঢাক করেননি। বিগত রাজনৈতিক সংকটের তুঙ্গ মুহূর্তে তিনি অকপটে সত্য কথা উচ্চারণ করেছেন। নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে। 'বাংলাদেশে রাজনীতি খুবই দুর্বল ও নিম্নমানের হয়ে পড়েছে।... রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত।... কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকা উচিত নয়।' চাকরিরত অবস্থায় এমন কথা বলার সাহস আছে কার? আমাদের সমাজে এমন দৃষ্টান্ত অবশ্যই নগণ্য। তাই তার মতো মানুষের বড় প্রয়োজন। সংঘটিত ঘটনাকে অস্বীকার করে নয়, তাকে গ্রহণ করেই সংশোধনের পথে এগোতে হবে। এ পথ সংঘাতের নয়, সমঝোতার। অজাচারের নয়, সদাচারের। বৈষম্যের নয়, সাম্যাচারের। তেমন একজন মানববরণ জ্ঞানসাধক আমার পরম শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই।
জাতির শ্রদ্ধেয় শিক্ষাগুরু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। জাতির প্রতীক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির আমৃত্যু সভাপতি তিনি। কী কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন? আসলে তিনিই তো জাতির জন্য এক প্রমিত পুরস্কার। এবার ফেব্রুয়ারির অমর একুশের বইমেলায় এক শুক্রবারে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেই শেষ দেখা। দুজন সঙ্গীর কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটছিলেন ধীরে ধীরে। আমাকে দেখেই বললেন, 'কেমন আছেন কবি? কবিতা লিখছেন তো?' আমি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়লাম। এমন ভালো মানুষ কোটিতেও মেলে না। অনন্তলোকে অনন্তকাল আপনিও ভালো থাকুন, আমার শ্রদ্ধেয় কাশেম ভাই।
লেখক: কবি ও সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি

