অতিবর্ষণে রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জেলা শহরসহ ১০ উপজেলায় পাহাড়ধসের সতর্কতা জানিয়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে প্রচার চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলায় ৪৪টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরমধ্যেই শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছেন ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দারা। পরিস্থিতি সামাল দিতে কুইক রেসপন্স টিম ও পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুদ রাখার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল আটটার দিকে জেলার বাঘাইছড়ি লাইল্যাঘোনা এলাকায় গড়িয়ে পড়া গাছের গুড়ির আঘাতে লক্ষিবিলাশ চাকমা (৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে রাঙামাটির কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কের বালুচরা এলাকায় সকালে পাহাড়ধস ও গাছ উপড়ে পড়ে যানবাহন ও মানুষ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে পড়ে। পরে মাটি ও গাছ অপসারণ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল থেকে জেলায় বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। থেমে থেমে চলছে মাঝারি ও ভারী বর্ষণ। তবে সোমবার সকাল থেকে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিতে মাইকিং করা হচ্ছে। আজও করা হয়েছে মাইকিং। ভারী বৃষ্টিপাত দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করছেন, তাদের স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যেতে বলা হয়েছে।
এরমধ্যে মঙ্গলবার বিকেল চারটা পর্যন্ত শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে ২১টি পরিবারের শিশুসহ ৭০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসন থেকে তাদের খাবারের ব্যবস্হা করা হয়েছে।
আশ্রয় নেয়া নুরজাহান বেগম( ৫০) বলেন, 'আমরা পাহাড়ের নীচে থাকি। টাকা পয়সা নাই। না হলে সমতলে থাকতাম। বৃষ্টিবাদল আসলেই আমরা এখানে আশ্রয় নেই'।
গৃহিনী রহিমা বেগম( ৫০) বলেন, ঘরের মধ্যে মাটি এসে পড়ছে। এজন্য আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছি। বৃষ্টি হলেই এখানে আসা লাগে। কী করব, গরীব মানুষ। সরকার স্থান (অন্য জমি) না দিলে কোথায় যাবো?
এরআগে দুপুর দুইটার দিকে শহরের লোকনাথ মন্দির এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেন রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নসজমা আশরাফী। এসময় ভারী বৃষ্টিপাতে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার নির্দেশনা দেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মুহূর্তে মানুষের জীবন বাঁচানোকে আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। মানুষকে সচেতন করছি। যাতে পাহাড় ধস কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোন জীবনহানি না হয়। উদ্ধার ও নিরাপত্তার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ ও রেসপন্স টিম আছে। এছাড়া জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে'।
জেলা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক ক্যাচিংনু মারমা জানান, জেলায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ৬ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৭ জুলাই সকাল ৬ পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৯.৩০ মিলিমিটার ও সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ১৯০.৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি আরও বাড়তে পারে।
রাঙামাটি পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ১১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব এলাকায় ৫ হাজার পরিবারে অন্তত ২০ হাজার মানুষ রয়েছেন। এদের মধ্যে শহরের লোকনাথ মন্দির, বেতার এলাকার নতুনপাড়া, শিমুলতলী, টিভি স্টেশন এলাকার রূপনগর, যুব উন্নয়ন এলাকা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে রাঙামাটি জেলায় কী পরিমাণ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিতে বাস করছেন তার পরিসংখ্যান নেই জেলা প্রশাসনের কাছে। জেলায় লক্ষাধিক মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে বলে জানা গেছে।
জিয়াউর রহমান জুয়েল/এসএন