দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে আছে, উৎপাদনে নেই ও অব্যবস্থাপনার কারণে বন্ধ বা অচল হয়ে পড়ে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থনীতির মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে ৪৪টি বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব শিল্প এলাকার আকার হচ্ছে ৩০ হাজার বিঘার বেশি জমি।
এ উদ্যোগে প্রায় ৫৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি হয়েছে। যা দেশের শিল্পায়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত করছে বাংলাদেশ সরকার। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার যৌথ উদ্যোগ (জেভি), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং দীর্ঘমেয়াদি লিজিং–এই তিন মডেল প্রস্তাব করছে। এ ব্যাপারে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো কাঠামোবদ্ধ ও সমন্বিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদে দেশি ও বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতই সবচেয়ে উপযুক্ত। সরকারের কাজ ব্যবসা পরিচালনা নয়, বরং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। এ জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলোকে অলস ফেলে রাখার সময় শেষ। বিদ্যমান অবকাঠামো, শিল্পভিত্তিক জনবল এবং কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে এগুলোকে আবারও উৎপাদনমুখী করা সম্ভব। সরকারের লক্ষ্য, এসব ব্রাউনফিল্ড সম্পদকে নতুন প্রযুক্তি ও বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন শিল্পে রূপান্তর করা, যা একদিকে আমদানি নির্ভরতা কমাবে, অন্যদিকে রপ্তানি সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং শিল্পায়নের নতুন ভিত্তি তৈরি করবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) ও বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আহ্বান করেছে।
বিডার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে স্টেট ওউন ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফোলিও; যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক অবস্থা প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত স্থাপনাগুলোর বড় অংশই দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। এগুলো কেবল খালি জমি নয় বরং বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগসহ পূর্ণাঙ্গ শিল্প অবকাঠামোসমৃদ্ধ ব্রাউনফিল্ড সম্পদ। ফলে নতুন করে জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি সংযোগ বা অবকাঠামো নির্মাণে সময় ও অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হবে না।
বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুত অবকাঠামো বা ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ সুবিধা ব্যবহার করে দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। বিনিয়োগের সুযোগ সীমাবদ্ধ থাকছে না কেবল ঐতিহ্যগত শিল্পে। কেমিক্যাল, সার, ইস্পাত, বস্ত্র, চিনি, পাট ও খাদ্যশিল্পের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যান (ইভি), লিথিয়াম ব্যাটারি, সেমি কন্ডাক্টর, মাইক্রোচিপ, এপিআই, সোলার গ্লাস, সোলার প্যানেল, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড স্টোরেজ, লজিস্টিক হাব, আধুনিক কাগজ শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব ভারী শিল্পেও বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনেই সবচেয়ে বড় শিল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ খুলনার নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড মিলস কমপ্লেক্সে ৪৭.২৭৫ একর জমির আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ৫৬৪.৯৬ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্সের ৯১.১৯ একর জমির মূল্য ১৯০.৮১ কোটি টাকা এবং সাভারের ঢাকা লেদার কোম্পানির ১৮ একর জমির মূল্য ২৬৪.১৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানির ১৯৭ একর, কর্ণফুলী পেপার মিলসের এক হাজার ৭০০ একরের বেশি জমি এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অব্যবহৃত শিল্প ভূমি নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) আওতাধীন চিনিকলগুলোতেও বড় ধরনের রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো বর্তমানে দেশের মোট চিনির চাহিদার মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ সরবরাহ করতে পারছে। এই সীমাবদ্ধতাকে সুযোগ হিসেবে দেখছে সরকার। কারণ শুধু সেতাবগঞ্জ সুগার মিলসের জমির পরিমাণই প্রায় ৩ হাজার ৮৬০ একর ও ঠাকুরগাঁও সুগার মিলসের রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮৮৭ একর জমি। রাজশাহী সুগার মিলও গড়ে উঠেছে ২৩০ একর জায়গায়। আম অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এখানে আম প্রক্রিয়াকরণ, জুস, জেলি, রপ্তানিমুখী খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়া সম্ভব।
বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) আওতায়ও উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সিকেডি অ্যাসেম্বলি, জেমকোতে পাওয়ার ট্রান্সফর্মার উৎপাদন, অ্যাটলাস বাংলাদেশে ইভি টু-হুইলার ও ব্যাটারি সংযোজন শিল্প স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বগুড়ায় ১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বছরে ৩ লাখ টন উৎপাদনক্ষম পরিবেশবান্ধব আধুনিক স্টিল মিল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের প্রথম বৃহৎ স্টিল শিল্প হতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল ও বস্ত্রকলগুলোতেও বড় ধরনের সংস্কার শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের ২৫টি মিলের মধ্যে ২০টি লিজের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এরই মধ্যে ১৪টি মিল বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি পরিচালনা করছে বিদেশি বিনিয়োগকারী। অন্যদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের ২৫টি মিলের মধ্যে ১৬টি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের জন্য নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে এবং কয়েকটি মিল এরই মধ্যে বেসরকারি অংশীদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার যৌথ উদ্যোগ (জেভি), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং দীর্ঘমেয়াদি লিজিং–এই তিন মডেল প্রস্তাব করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে ইক্যুইটি হিসেবে দেবে, আর বেসরকারি অংশীদাররা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সরবরাহ করবে। পিপিপি’র আওতায় ৩০ বছর মেয়াদি নবায়নযোগ্য চুক্তি, ভ্যাট সুবিধা এবং ৩৬ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড রাখা হয়েছে। লিজ মডেলেও দীর্ঘমেয়াদি সময়, দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ এবং দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।