দেশের বাজারে লবণের দাম বাড়লেও তার সুফল পাচ্ছেন না প্রান্তিক লবণচাষিরা। মাঠপর্যায়ের চাষিদের অভিযোগ–উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা লবণের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। মূলত বাজারজাতকরণ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে থাকা মধ্যস্বত্বভোগীরাই সিংহভাগ মুনাফা লুটে নিচ্ছেন। ফলে কায়িক শ্রম দেওয়া উৎপাদক এবং সাধারণ ভোক্তার পরিশোধ করা দামের মধ্যে একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
- বাজারে লবণের দাম বাড়লেও প্রান্তিক লবণচাষিরা উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
- সংরক্ষণ সুবিধা ও অর্থায়নের অভাবে মৌসুমে চাষিরা কম দামে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন।
- সমবায়ভিত্তিক বিপণন, স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজার তদারকি জোরদার করা হলে লবণচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন।
লবণচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ চাষির পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা বা কার্যকর অর্থায়নের সুযোগ না থাকায় উৎপাদনের মৌসুমেই তাঁরা কম দামে লবণ বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে সেই লবণ বিভিন্ন হাত ঘুরে মিল, পাইকারি ও খুচরা বাজারে গিয়েই দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় লবণচাষিরা আরও অভিযোগ করেন, একসঙ্গে অনেক পরিমাণ লবণ উৎপাদিত হওয়ায় দাম কমে যায়। এ সময় সংরক্ষণ ব্যবস্থার অসুবিধা এবং পরবর্তী উৎপাদনের খরচ জোগাতে অনেক চাষি দ্রুত লবণ বিক্রি করেন। এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা কম দামে লবণ কিনে মজুত করেন। পরে বাজারে সরবরাহ কমে এলে বেশি দামে তা বিক্রি করেন।
চকরিয়ার লবণচাষি মো. কামাল খবরের কাগজকে জানান, লবণ উৎপাদনের সময় প্রতি মণ লবণে খরচ হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। কিন্তু সেই লবণ বিক্রির সময় ২৫০ টাকার বেশি পাওয়া যায় না। এভাবে প্রতি মণে আমাদের লোকসান হয়। প্রতিবছরই লোকসানের ঝুঁকিতে থাকি।
তিনি আরও বলেন, আমরা লবণ উৎপাদনের খরচ অনুযায়ী দাম পাই না। এই ঘটনা নতুন নয়। মধ্যস্বত্বভোগীরা আমাদের কাছ থেকে অপরিশোধিত লবণ কিনে মিল মালিকদের কাছে লাভে বিক্রি করেন। মিল মালিকরা এই লবণ পরিশোধন করে বাজারে কয়েকগুণ লাভে বিক্রি করেন। এভাবে মধ্যস্বত্বভোগী ও মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে আমাদের ঠকিয়ে লাভ করে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বেশি দামে লবণ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লবণের দাম প্রতি কেজি গড়ে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। ফ্রেশ, এসিআই, প্রাণ, তীর, মৌচাক ব্র্যান্ডের লবণ কেজি হিসেবে বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৪২ টাকায়।
আরেক লবণচাষি বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়নের মিনজিরিতলা গ্রামের মোহাম্মদ ছগির খবরের কাগজকে জানান, বর্তমানে আমাদের লবণের সিজন নেই। এ সময়ে আমরা কিছু দাম পাই, তবে সেটা আহামরি লাভ হয় না। বর্তমানে লবণ উৎপাদন বন্ধ থাকায় কেজিপ্রতি ১০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। সিজনের সময় আরও কমে আমাদের থেকে লবণ ৪-৫ টাকা কেজি দরে ক্রয় করা হয়। সে হিসেবে আমাদের প্রতি মণ বিক্রি দাম দাঁড়ায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে। তাই আমাদের তেমন কোনো লাভ হয় না। বরং অনেক সময় লোকসান হয়।
এদিকে, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহের একাধিক স্তর থাকায় প্রতিটি ধাপে মূল্য সংযোজনের পাশাপাশি মুনাফাও যোগ হয়। তবে কোথায় কত মুনাফা হচ্ছে, সে হিসাব না থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং এর সুযোগ নিয়ে থাকে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
অন্যদিকে বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য থাকলেও অনেক সময় কৃত্রিম সংকটের ধারণা তৈরি হয়। এতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ভোক্তারা বেশি দাম দিলেও সেই অর্থ লবণচাষি পর্যায়ে পৌঁছায় না।
ছানুয়া ইউনিয়নের লবণচাষি বোরহান উদ্দিন মিজান খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের আসলে এই কাজে লাভ কিছুই নেই। যা লাভ আসে তা সব যায় ব্যবসায়ীদের পকেটে। বছর দুয়েক আগেও আমাদের মণপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বিক্রি হতো। কিন্তু এখন উৎপাদন খরচ যেখানে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা হয়, সেখানে ২০০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি মিল মালিকদের থেকে দাম পাওয়া যায় না। বাজারে যেসব ব্র্যান্ডের লবণ পাওয়া যায়, সেগুলো দেখা যায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও সাবেক সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, কৃষিপণ্যের মতো লবণের ক্ষেত্রেও বাজারব্যবস্থাকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ করতে হবে। উৎপাদকদের সংগঠিত করে সমবায়ভিত্তিক বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে চাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, লবণের মতো পণ্যেও চাষিরা ঠকছেন। অন্যদিকে লাভবান হচ্ছে মিলমালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। ক্রেতাদেরও বেশি দামে লবণ কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।
সারাদেশে বছরে লবণের চাহিদা
শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক লবণের মোট চাহিদা প্রায় ২৫ লাখ ৩০ হাজার টন। এর মধ্যে খাবার (ভোজ্য) লবণ ও অন্যান্য খাতে লাগে প্রায় ১৬ লাখ টন এবং বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় (টেক্সটাইল, ডাইং, চামড়া ইত্যাদি) ব্যবহৃত হয় বাকি প্রায় ৯ লাখ টন।
এদিকে, খাবার লবণের চাহিদা রয়েছে মোট চাহিদার বাকি ৫০ শতাংশ, যা প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন। এগুলো মিলগুলোতে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য রাখা হয়। তবে অপরিশোধিত লবণ ধুয়ে পরিষ্কার ও আয়োডিনযুক্ত করে যখন ভোজ্য লবণ বা প্যাকেটজাত খাবার লবণ তৈরি করা হয়, তখন বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কারণে এর ওজন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হয়। ফলে দেশের মানুষের বার্ষিক প্রকৃত খাবার লবণের ব্যবহার দাঁড়ায় প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ মেট্রিক টন।
খাবার লবণ ছাড়াও ভারী শিল্প ও চামড়া সংরক্ষণ, বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময় পশুর চামড়া কাঁচা রাখতে বছরে প্রায় ১ লাখ টন লবণের প্রয়োজন হয়, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ যেমন শুঁটকি উৎপাদন ও গবাদি পশুর খাদ্য তৈরিতে বাকি লবণ ব্যবহৃত হয়।