আমাদের মদনগঞ্জ গ্রামের অদ্ভুত ক্যারেক্টারগুলোর মধ্যে মতিন ভাই একজন।
কথা দিয়ে কথা রাখার ব্যাপারে তিনি যেন মেসির মতো—ডি-বক্সে বল পেলে যেমন গোল নিশ্চিত, মতিন ভাইয়ের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিশ্রুতিও তেমনই ফাইনাল। একবার সামান্য একটা বাজিতে হেরে তিনি মাথা ন্যাড়া করে পুরো গ্রাম সাতবার চক্কর দিয়েছিলেন। অথচ যিনি বাজিতে জিতেছিলেন, তিনিই পরে বলেছিলেন–বাদ দাও, লাগবে না।
কিন্তু মতিন ভাই? না। কথার বরখেলাপ হবে–এটা তিনি সহ্যই করতে পারেন না।
এই হলো মতিন ভাই। আর এই মতিন ভাইকেই মানুষ ‘বহুরূপী মতিন’ বলে উপহাস করে। বড়ই আশ্চর্য! তবে এটা তার সিজনাল নাম। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই তার এই নামের প্রচলন শুরু হয়ে যায়।
চলছিল ২০০২ বিশ্বকাপের মৌসুম, সঙ্গে মতিন ভাইয়ের প্রেমের ভরা মৌসুম। ব্রাজিলের হাড্ডাহাড্ডি সাপোর্টার মতিন ভাইকে ডেকে তার তৎকালীন প্রেমিকা বললেন, ব্রাজিল ছাড়তে হবে। না ছাড়লে আমি ছেড়ে যাব। প্রেমের শুরুতে কথা দিয়েছিলে যা বলব তাই করবে।
মতিন ভাই একটু না ভেবে ব্রাজিল ছাড়লেন এবং যোগ দিলেন আর্জেন্টিনায়। ফলাফল–আর্জেন্টিনা প্রথম রাউন্ডেই বিদায়।
অন্যদিকে দুই বছর পর প্রেমিকাও মতিন ভাইকে বিদায় দিয়ে ইউরো দেখতে অন্য কারো হাত ধরে ইউরোপে উড়াল দিলেন।
প্রেমিকা ছেড়ে গেলেও মতিন ভাই দল ছাড়েননি। আর্জেন্টিনাকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০০৬ বিশ্বকাপে বিপত্তি বাঁধালেন তার স্ত্রী। নতুন বউ আবদার করে বসল জিদানের দল সাপোর্ট করতে। মানে ফ্রান্স। ফ্রেঞ্চ ছেলেরা নাকি বউয়ের ক্রাশ।
মতিন ভাই ভাবলেন, প্রেমিকার জন্য যদি দল পাল্টাতে পারি, বউয়ের জন্য না পাল্টালে মান থাকে!
ব্যাস! মতিন ভাই যোগ দিলেন ফ্রান্স শিবিরে। সেবার ফ্রান্স দারুণ খেলে ফাইনালে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু জিদানের গুঁতোয় কাপটাও গুঁতো খেল।
সময় এল ‘ওয়াকা ওয়াকা’র। আফ্রিকা বিশ্বকাপ ২০১০। মতিন ভাই তখন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করেন। বস ভীষণ কড়া। টার্গেট অনুযায়ী কাজ না করতে পারলে বকার চোটে চেয়ারে বসা যায় না। বিশ্বকাপের এক সপ্তাহ আগে নোটিশ জারি করলেন, এই অফিসে কর্মরত সবাই যেন বিশ্বকাপ চলাকালীন ইংল্যান্ড জার্সি পরে অফিসে আসে এবং মনে-প্রাণে ইংল্যান্ড টিমকে সাপোর্ট করে।
আসলে কোম্পানি ব্রিটিশ ছিল তো। বসেরও নোটিশ না দিয়ে উপায় ছিল না। আর নোটিশ না মানলে কী হতো, সেটা তো বসের আচরণেই বোঝা যায়। তাই কী আর করা! চাকরি বাঁচাতে ঘাঁটি গাড়লেন ব্রিটিশ শিবিরে।
দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ড বাদ। মতিন ভাইয়ের ইংল্যান্ড সাপোর্ট করাও বাদ।
২০১৪ বিশ্বকাপে মতিন ভাই ফিরে গেলেন তার পুরোনো প্রেম ব্রাজিলের কাছে। কিন্তু সেমিফাইনাল দেখার পর শপথ করলেন–কেউ বিনামূল্যে সেভেনআপ খাওয়াতে চাইলেও খাবেন না, বরং উল্টো টাকা দিয়ে তাকেই বিদায় করবেন।
২০১৮ বিশ্বকাপে ভাবলেন–আবেগে, প্রেশারে অনেক তো দল পাল্টালেন। এবার এমন একটা দল সাপোর্ট করা দরকার যারা সত্যিই ভালো খেলে। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার আতঙ্ক জার্মানি সাপোর্ট করলে কেমন হয়! যেমন বলা তেমন কাজ। বিশ্বকাপ শুরু হতেই জার্মানির জার্সি গায়ে লাফালাফি। কিন্তু প্রথম রাউন্ড শেষ হতেই ছেলেমেয়েরা ছড়া বানাল–
জার্মানি তো গেল হারি
মতিন ভাইয়ের মাথায় বাড়ি।
২০২২ বিশ্বকাপে কুইজ জিতে ২০০টি স্পেনের জার্সি উপহার পেলেন। এতগুলো জার্সি ফেলে তো দেওয়া যায় না। নিজে কয়েকটা পরলেন, কয়েকটা বন্ধুদের দিলেন। চারদিকে রটে গেল মতিন ভাই এবার স্পেনের সাপোর্টার। মতিন ভাইও মেনে নিলেন। এতগুলো জার্সির মায়া তো কম কথা না। সেবার স্পেন বিশ্বকাপের মায়া কাটাল দ্বিতীয় রাউন্ডে।
আবারও বছর ঘুরে চলে এল বিশ্বকাপ। এইবার মতিন ভাই কোন দল সাপোর্ট করছেন তা এখনো শিওর হওয়া যায়নি। উড়ো খবর শোনা যাচ্ছে, আবারও নাকি আর্জেন্টিনায় ফিরে গেছেন তার সেই প্রেমিকার স্মরণে। কয়েকদিন আগে সেই প্রেমিকা একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেখানে নাকি অস্পষ্টভাবে মতিন ভাইকে স্মরণ করা হয়েছে।
মানুষ তাকে বহুরূপী ডাকে, তাতে তার আফসোস নেই। কিন্তু তার কপাল এতটা খারাপ কেন! যাকেই সে আগলে ধরেছে, সেই তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
পুনশ্চ: আর্জেন্টিনা ফ্যানদের জন্য ছোট্ট সতর্কবার্তা–
মতিন ভাই যদি আবার সত্যিই আপনাদের দলে এসে থাকেন, তাহলে এবার বিশ্বকাপে নাটক জমে যেতে পারে।