দেশে বহু রাজস্ব মামলা এখনো আদালতে পড়ে আছে। এসব মামলাজট দীর্ঘদিনের বিষয়। ২০১১ সালে মামলাজট কমানোর জন্য বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলেও এ পদ্ধতি সফল হতে পারেনি। প্রায় ৩১ হাজার রাজস্ব মামলা অনিষ্পত্তি থাকায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব অনাদায়ি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন মামলা। ফলে অনাদায়ি রাজস্বের পরিমাণও দিনে দিনে বাড়ছে। রাজস্ব আইন ও বিধির ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কর নির্ধারণে মতপার্থক্যের কারণে মামলা বাড়ছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাবকে দায়ী করেছেন।
রাজস্ব মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এর মধ্যে দায়িত্বরত এনবিআর কর্মকর্তাদের মামলা সম্পর্কে ধারণা কম থাকা, এনবিআরের প্রস্তুতির অভাব, আদালতে সময়মতো তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারা, মামলা শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্বরত কর্মকর্তার বদলির বিষয়গুলো জড়িত। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অভিজ্ঞ আইনজীবীদের ফি বেশি থাকে। কিন্তু রাজস্ব মামলা পরিচালনায় বাজেট কম থাকে। এত স্বল্প বাজেটে অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব মামলা পরিচালনায় কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইনজীবী নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়। এতে করে মামলা পরিচালনায় দক্ষতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। অনেক সময় এনবিআরের তদন্তেও মামলায় বিপক্ষদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এনবিআরসংশ্লিষ্টদের মামলায় সময়ক্ষেপণে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের আদালতে আয়কর, মূসক ও শুল্ক-সংক্রান্ত মোট মামলার সংখ্যা ৩১ হাজার ৭০০টি। জড়িত অর্থের পরিমাণ ৯৯ লাখ ৭০০ কোটি টাকা। কমপক্ষে ৪ হাজার ৭০০ করসংক্রান্ত মামলার বিপরীতে জড়িত অর্থের পরিমাণ অন্তত ৩৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূসকের মামলার সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি। জড়িত অর্থের পরিমাণ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। শুল্কের মামলার সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই ১২ হাজার মামলা চলমান। জড়িত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা।
তথ্যমতে, সবচেয়ে বেশি মামলা আছে বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে। হাইকোর্ট বিভাগে শুধু ভ্যাট-সংক্রান্ত মামলা আছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০, যেখানে রাজস্ব জড়িত আছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট অফিস, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এবং আদালত একত্রে ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করে অন্তত সমজাতীয় মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা যায় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অভিযোগ উঠেছে, এনবিআরের অদক্ষতায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না রাজস্ব মামলা। তাই রাজস্ব মামলা নিষ্পন্ন করতে হলে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এনবিআরকে ঢেলে সাজিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। কর নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও রিটার্ন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমে যায়। এতে করদাতা ও কর প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ কমে আসবে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হবে। এনবিআরসংশ্লিষ্টদের মামলায় সময়ক্ষেপণে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি এনবিআরসংশ্লিষ্টদের কৌশলী ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। আশা করি, সরকার দেশের মানুষের হয়রানি কমাতে এবং রাজস্ব বাড়াতে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।