টানা কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বান্দরবানের লামা ও আলীকদমে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে দুই উপজেলার অন্তত লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ভয়াবহ এই বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেই পেকুয়ার টৈটংয়ে পাহাড় ধসে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এদিকে চকরিয়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর কার্যালয়টি সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানির তোড়ে ভবনের একটি সীমানা প্রাচীর ধসে পড়েছে এবং স্থবির হয়ে পড়েছে দাপ্তরিক সব কার্যক্রম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টানা বৃষ্টির কারণে পেকুয়ার টৈটং পাহাড়ি এলাকার মাটি প্রচণ্ড নরম হয়ে পড়েছিল।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) হঠাৎ একটি পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে নিচে পড়লে মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, পেকুয়ার শিলখালী ইউনিয়নের জারুলবুনিয়া এলাকায় পাহাড় ধসে স্থানীয় ব্যবসায়ী ছৈয়দ হোসেনের একটি ছাগলের খামার সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। পাহাড়ের মাটির চাপায় খামারে থাকা ২৫টি ছাগলের মধ্যে দুটি ঘটনাস্থলেই মারা যায়।
বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের তীব্রতায় পেকুয়ার টৈটং এলাকায় প্রধান লাইনের বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়ার পর থেকে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয়দের মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জেনারেটরের মাধ্যমে মোবাইল চার্জের বাণিজ্য শুরু করেছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারে জেনারেটর চালু করে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট প্রতি ১০ টাকা এবং বাটন মোবাইল ৫ টাকা করে চার্জের ফি আদায় করা হচ্ছে। নিরুপায় হয়ে বন্যার্ত মানুষ টাকা দিয়েই মোবাইল সচল রাখার চেষ্টা করছেন।
দেখা গেছে, চকরিয়া পৌর শহরের চিরিঙ্গা এলাকায় অবস্থিত সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের কার্যালয় ও আশপাশের চত্বর এখন থৈ থৈ পানিতে ভাসছে। কার্যালয়ের ভেতরে এখন হাঁটু সমান পানি।
ঢলের পানির তোড়ে চকরিয়ার সুরাজপুর-কাকারা, মানিকপুর, বরইতলী, ভেওলা, কৈয়ারবিল, খিলছাদেক ও গোবিন্দপুর এবং পেকুয়ার মগনামা, রাজাখালী ও পেকুয়া সদর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। গ্রামীণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। হঠাৎ করে পানি ঢুকে পড়ায় বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ ঘরের আসবাবপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক এলাকায় আমন ধানের বীজতলা ও শাকসবজির খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং চিংড়ি ঘের ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
পাহাড়ি ঢলের পানি গ্রামীণ সড়ক ও ফসলি জমিতে উঠে আসায় বিভিন্ন স্থানে চাষের মাছ ভেসে গেছে। প্লাবিত ফসলি জমি ও বিলে স্থানীয় অনেক মানুষকে জাল এবং বিভিন্ন দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে মাছ ধরতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি পাহাড় কেটে সমতল করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কোদাল দিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে ভবিষ্যতে সেখানে পাকা ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড় কাটলে প্রশাসনের নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকায়, অনেকেই ভারী বৃষ্টিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছেন। বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি নরম থাকায় কাটাও তুলনামূলক সহজ হয়। তবে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে করছেন।
টানা ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার মধ্যেই চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখায় চরম ঝুঁকি ও ভোগান্তির মুখে পড়েছে হাজারো শিক্ষার্থী। সকালে শিক্ষার্থীরা ছাতা মাথায় দিয়ে কিংবা হাঁটু সমান পানি মাড়িয়ে ঝুঁকি নিয়ে স্কুল-কলেজে যেতে দেখা যায়।
পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকরা জোর প্রচারণা চালাচ্ছে। সিপিপি (ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি) ইউনিটের লিডার মনিরুল ইসলাম জানান, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে যারা আছেন, তাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি সব সময় খোঁজখবর রাখছি কোথাও কোনো বেড়িবাঁধ ভাঙছে কি না বা পাহাড় ধসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে এবং পাহাড়ি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক করতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
রকিবুল হাসান/এসএন