ঢাকা ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
এআই ও ডেটা সায়েন্সে স্নাতক প্রোগ্রাম চালু করল আইএসইউ বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য খুলল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী পাবলিক স্পিকিংয়ে মঞ্চ মাতাবেন যেভাবে মহাকাশে পতনশীল সুইফট অবজারভেটরি উদ্ধারে নাসার সফল অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকির সতর্কবার্তা ব্রাজিলের রাতের রানিতে সেজেছে পেকুয়ার পাহাড় নোয়াখালীর ২ হাসপাতালকে জরিমানা লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৪ বাংলাদেশি ৭৩১ জনকে চাকরি দেবে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর বিমা খাতকে আইনি কাঠামোয় আনার তাগিদ তথ্যমন্ত্রীর ব্রাজিলিন্টিনা টানা বৃষ্টি ও জোয়ারে পতেঙ্গা সৈকতসংলগ্ন সড়কে ধস জাদুঘরে ফিরল ১১৯ বছরের পুরোনো তিমির কঙ্কাল ‘আল্লাহ কোথায় আছেন?’ দানবাক্স থেকে চুরি করে প্রেমিকাকে আইফোন দিলেন কর্মী খাদ্য অধ্যায়ের ৩টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও উত্তর, ১ম পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বিজ্ঞান বহুরূপী মতিন ভাই ফারাওদের রুখতে আর্জেন্টিনার একাদশে ৩ পরিবর্তন এনবিআরের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হুন্দাই আনল প্রিমিয়াম ইলেকট্রিক ইনস্টার লাউঞ্জ দামেস্কের ফোর সিজনস হোটেলের কাছে বিস্ফোরণ এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্সে যুগান্তকারী বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম চালু করল আইএসইউ চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিপর্যয়, তিনটি পাঠানো হলো ঢাকায় খাগড়াছড়িতে টানা বর্ষণে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ৪৫ বছরে পদার্পণ করলো আরএফএল পাইপ অ্যান্ড ফিটিংস নতুন ইউপি বরিশলের প্রশাসক ফজলুর রহমান ভূঁইয়া লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৮৬ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা কম বয়সে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খেলাধুলা, শিক্ষা ও মেন্টরশিপ: মেটলাইফের গবেষণা হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হলেন ফারুক আহমেদ

ব্রাজিলিন্টিনা

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৯ পিএম
ব্রাজিলিন্টিনা
এঁকেছেন মাসুম

তিন গ্রামের মিলনস্থল একটা মোড়। মোড়ের ঠিক মাঝখানে মজনু ভাইয়ের একমাত্র দোকান ‘ব্রাজিলিন্টিনা টি স্টল’। বিকেলবেলা বেশ জমজমাট হয়। এই দোকানের রেগুলার আর সবচেয়ে ভিআইপি কাস্টমার দুজন মুরব্বি। একজন শফিক মুনশি, আরেকজন রহমত পালোয়ান। দুজনের বয়সই সত্তর ছুঁইছুঁই প্রায়। মুখভর্তি ধবধবে সাদা দাড়ি, পরনে লম্বা জোব্বা, মাথায় টুপি। দুজনেই এলাকার বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তি।
শফিক মুনশি কট্টর ব্রাজিল সাপোর্টার। তার জোব্বাটা এখন টকটকে হলুদ, হাতা-গলায় সবুজ পাইপিং, পিঠে বড় করে ‘BRASIL-5’ লেখা। টেইলার্স থেকে অর্ডার দিয়ে টুপি, লুঙ্গি, গামছা পর্যন্ত হলুদ-সবুজ রঙে কাস্টমাইজড ডিজাইন করেছেন। 
উনি বলেন, ‘ব্রাজিল মানে ফুটবলের শিল্প। ব্রাজিলের খেলোয়াড় হলো জন্মগত ফুটবলার।’ 
তিনি ১৯৮২ থেকে খেলা দেখেন। প্রিয় দলের প্রতি এতটাই দুর্বল যে, দোয়া করেন, ‘প্রভু, ব্রাজিলরে জিতায় দিও। আর মেসি যেন ইনজুরিতে পড়ে!’
রহমত পালোয়ান আবার আর্জেন্টিনার জন্য জান কোরবান। তার জোব্বা নীল-সাদা ডোরাকাটা, পিঠে সোনালি কালারে ‘MESSIDONA-10’ লেখা। তিনিও শফিক মুনশির মতোই লুঙ্গি, গামছা, টুপি, মোজা, এমনকি ভেতরের স্যান্ডো গেঞ্জিটাও নীল-সাদা রঙে কাস্টমাইজড ডিজাইন করে নিয়েছেন। 
উনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা খেলে দিল থেকে। মেসি আর ম্যারাডোনা হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্লেয়ার।’ 
তিনিও দোয়া করেন, ‘প্রভু, নেইমার যেন ফাউল করে লাল কার্ড খায়!’
দুই মুরব্বি এক বিষয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী; তা হলো ফুটবল। দুজন মিলে মজার পণ করেছেন। যেদিন আর্জেন্টিনা জিতবে বা যে কারও কাছে ব্রাজিল হারবে, সেদিন টি স্টলের সব দর্শকের নাশতার বিল দেবেন রহমত পালোয়ান। আর ব্রাজিল জিতলে অথবা আর্জেন্টিনা যে কারও কাছে হারলে বিল দেবেন শফিক মুনশি।
দুজনের এই পাগলামি আর ফ্রি নাশতার লোভে খেলার দিন দোকানে তিলধারণের জায়গা থাকে না। বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়। পোলাপান মজা করে তাই মজনু মিয়ার টি স্টলের নাম দিয়েছে ‘ব্রাজিলিন্টিনা টি স্টল’। দোকানের ভেতরে-বাইরে পুরোটাই ব্রাজিলিন্টিনা রঙে রাঙানো। খেলার দিন রীতিমতো এখানে মেলা বসে। কারণ এখানে খেলার চেয়ে বড় হলো দুই মুরব্বির তর্কাতর্কি। সেটাই পোলাপান বেশি উপভোগ করে।
চার বছর পর বিশ্বকাপ এলেই তুমুল তর্ক শুরু হয়। গতকাল ছিল ফাইনাল খেলা। পুরো গ্রামের লোক ‘ব্রাজিলিন্টিনা টি স্টলে’।
শফিক মুনশি বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘দেখিস রহমত, আমার সবুজ-হলুদের বরকতে আজ ব্রাজিল হালি হালি গোল দেবে।’
রহমত পালোয়ানও দমবার পাত্র নন। তিনিও গামছা টেবিলে রেখে বললেন, ‘আর আমার নীল-সাদার অছিলায় মেসি আজ হ্যাটট্রিকের ইতিহাস লিখবে। ব্রাজিল গোলের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়বে!’
অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে খেলা শুরু হলো। প্রথম গোলটা ব্রাজিল করলেও ৯০ মিনিট শেষে স্কোর হয় ২-২। অতিরিক্ত সময়েও গোল নাই! শেষ ভরসা পেনাল্টি। দোকানের সবারই দম বন্ধ, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা! ব্রাজিল কয়েকটি পেনাল্টি মিস করল, শেষে আর্জেন্টিনাও মিস করল। পরিশেষে ম্যাচের ফলাফল হলো ড্র। এককভাবে ট্রফি কেউ পেল না। শেষমেশ দুদলকেই ট্রফি ভাগ করে দেওয়া হলো, যেন কেউই জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হয়; মন খারাপ না করে।
রাত সাড়ে ১২টায় খেলা শেষে দুই মুরব্বি চুপচাপ চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। মজনু মিয়া বলল, ‘চাচাজান, আপনাদের দল বিশ্বকাপ এককভাবে পায় নাই তো কী হয়েছে? এই নেন, আপনাদের জন্য আমি কাপ নিয়ে এসেছি। এইটাই আপনাদের কাপ।’
এ কথা বলেই চায়ের পাতির সঙ্গে ফ্রি পাওয়া আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির ডিজাইনে রং করা দুটি সিরামিকের মগ এগিয়ে দিল মজনু মিয়া।
তার পর আবার বলল, ‘শোনেন চাচা, আপনাদের তর্কাতর্কি শুনেই পাড়ার পোলাপান আজ ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখেছে।’
মজনু মিয়ার কথা শুনে শফিক মুনশি হাসলেন। তার পর বললেন, ‘ধন্যবাদ মজনু।’
একটু থেমে আবার বললেন, ‘নে রহমত, আজ থেকে আর ঝগড়া হবে না। তোর নীল-সাদার পাশে আমার সবুজ-হলুদ। আমরা দুজন মিলেই এক দল।’
রহমত পালোয়ান দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠিক কইছো বন্ধু। যেহেতু আমাদের দুই দলই সমান, তাই আমরা আজকে থেকে ‘ব্রাজিলিন্টিনা’।”

বহুরূপী মতিন ভাই

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
বহুরূপী মতিন ভাই
এঁকেছেন মাসুম

আমাদের মদনগঞ্জ গ্রামের অদ্ভুত ক্যারেক্টারগুলোর মধ্যে মতিন ভাই একজন।
কথা দিয়ে কথা রাখার ব্যাপারে তিনি যেন মেসির মতো—ডি-বক্সে বল পেলে যেমন গোল নিশ্চিত, মতিন ভাইয়ের মুখ থেকে বের হওয়া প্রতিশ্রুতিও তেমনই ফাইনাল। একবার সামান্য একটা বাজিতে হেরে তিনি মাথা ন্যাড়া করে পুরো গ্রাম সাতবার চক্কর দিয়েছিলেন। অথচ যিনি বাজিতে জিতেছিলেন, তিনিই পরে বলেছিলেন–বাদ দাও, লাগবে না।
কিন্তু মতিন ভাই? না। কথার বরখেলাপ হবে–এটা তিনি সহ্যই করতে পারেন না।
এই হলো মতিন ভাই। আর এই মতিন ভাইকেই মানুষ ‘বহুরূপী মতিন’ বলে উপহাস করে। বড়ই আশ্চর্য! তবে এটা তার সিজনাল নাম। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই তার এই নামের প্রচলন শুরু হয়ে যায়।
চলছিল ২০০২ বিশ্বকাপের মৌসুম, সঙ্গে মতিন ভাইয়ের প্রেমের ভরা মৌসুম। ব্রাজিলের হাড্ডাহাড্ডি সাপোর্টার মতিন ভাইকে ডেকে তার তৎকালীন প্রেমিকা বললেন, ব্রাজিল ছাড়তে হবে। না ছাড়লে আমি ছেড়ে যাব। প্রেমের শুরুতে কথা দিয়েছিলে যা বলব তাই করবে।
মতিন ভাই একটু না ভেবে ব্রাজিল ছাড়লেন এবং যোগ দিলেন আর্জেন্টিনায়। ফলাফল–আর্জেন্টিনা প্রথম রাউন্ডেই বিদায়।
অন্যদিকে দুই বছর পর প্রেমিকাও মতিন ভাইকে বিদায় দিয়ে ইউরো দেখতে অন্য কারো হাত ধরে ইউরোপে উড়াল দিলেন।
প্রেমিকা ছেড়ে গেলেও মতিন ভাই দল ছাড়েননি। আর্জেন্টিনাকেই আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০০৬ বিশ্বকাপে বিপত্তি বাঁধালেন তার স্ত্রী। নতুন বউ আবদার করে বসল জিদানের দল সাপোর্ট করতে। মানে ফ্রান্স। ফ্রেঞ্চ ছেলেরা নাকি বউয়ের ক্রাশ।
মতিন ভাই ভাবলেন, প্রেমিকার জন্য যদি দল পাল্টাতে পারি, বউয়ের জন্য না পাল্টালে মান থাকে!
ব্যাস! মতিন ভাই যোগ দিলেন ফ্রান্স শিবিরে। সেবার ফ্রান্স দারুণ খেলে ফাইনালে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু জিদানের গুঁতোয় কাপটাও গুঁতো খেল।
সময় এল ‘ওয়াকা ওয়াকা’র। আফ্রিকা বিশ্বকাপ ২০১০। মতিন ভাই তখন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করেন। বস ভীষণ কড়া। টার্গেট অনুযায়ী কাজ না করতে পারলে বকার চোটে চেয়ারে বসা যায় না। বিশ্বকাপের এক সপ্তাহ আগে নোটিশ জারি করলেন, এই অফিসে কর্মরত সবাই যেন বিশ্বকাপ চলাকালীন ইংল্যান্ড জার্সি পরে অফিসে আসে এবং মনে-প্রাণে ইংল্যান্ড টিমকে সাপোর্ট করে।
আসলে কোম্পানি ব্রিটিশ ছিল তো। বসেরও নোটিশ না দিয়ে উপায় ছিল না। আর নোটিশ না মানলে কী হতো, সেটা তো বসের আচরণেই বোঝা যায়। তাই কী আর করা! চাকরি বাঁচাতে ঘাঁটি গাড়লেন ব্রিটিশ শিবিরে।
দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ড বাদ। মতিন ভাইয়ের ইংল্যান্ড সাপোর্ট করাও বাদ।
২০১৪ বিশ্বকাপে মতিন ভাই ফিরে গেলেন তার পুরোনো প্রেম ব্রাজিলের কাছে। কিন্তু সেমিফাইনাল দেখার পর শপথ করলেন–কেউ বিনামূল্যে সেভেনআপ খাওয়াতে চাইলেও খাবেন না, বরং উল্টো টাকা দিয়ে তাকেই বিদায় করবেন।
২০১৮ বিশ্বকাপে ভাবলেন–আবেগে, প্রেশারে অনেক তো দল পাল্টালেন। এবার এমন একটা দল সাপোর্ট করা দরকার যারা সত্যিই ভালো খেলে। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার আতঙ্ক জার্মানি সাপোর্ট করলে কেমন হয়! যেমন বলা তেমন কাজ। বিশ্বকাপ শুরু হতেই জার্মানির জার্সি গায়ে লাফালাফি। কিন্তু প্রথম রাউন্ড শেষ হতেই ছেলেমেয়েরা ছড়া বানাল–
জার্মানি তো গেল হারি
মতিন ভাইয়ের মাথায় বাড়ি।
২০২২ বিশ্বকাপে কুইজ জিতে ২০০টি স্পেনের জার্সি উপহার পেলেন। এতগুলো জার্সি ফেলে তো দেওয়া যায় না। নিজে কয়েকটা পরলেন, কয়েকটা বন্ধুদের দিলেন। চারদিকে রটে গেল মতিন ভাই এবার স্পেনের সাপোর্টার। মতিন ভাইও মেনে নিলেন। এতগুলো জার্সির মায়া তো কম কথা না। সেবার স্পেন বিশ্বকাপের মায়া কাটাল দ্বিতীয় রাউন্ডে।
আবারও বছর ঘুরে চলে এল বিশ্বকাপ। এইবার মতিন ভাই কোন দল সাপোর্ট করছেন তা এখনো শিওর হওয়া যায়নি। উড়ো খবর শোনা যাচ্ছে, আবারও নাকি আর্জেন্টিনায় ফিরে গেছেন তার সেই প্রেমিকার স্মরণে। কয়েকদিন আগে সেই প্রেমিকা একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সেখানে নাকি অস্পষ্টভাবে মতিন ভাইকে স্মরণ করা হয়েছে।
মানুষ তাকে বহুরূপী ডাকে, তাতে তার আফসোস নেই। কিন্তু তার কপাল এতটা খারাপ কেন! যাকেই সে আগলে ধরেছে, সেই তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
পুনশ্চ: আর্জেন্টিনা ফ্যানদের জন্য ছোট্ট সতর্কবার্তা–
মতিন ভাই যদি আবার সত্যিই আপনাদের দলে এসে থাকেন, তাহলে এবার বিশ্বকাপে নাটক জমে যেতে পারে।

বিশ্বকাপের আসল হিরো

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম
বিশ্বকাপের আসল হিরো
ছবি এআই

বিশ্বকাপ শুরু হলেই আলোকদিয়ার বাজারের চেহারা বদলে যায়। বাজারের প্রতিটি দোকান, মোড় আর চায়ের দোকানে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক জমে ওঠে। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ আবার জার্মানির সমর্থক।
আল্লেক ব্রাজিলের পাগল সমর্থক। মজিদ আর্জেন্টিনার। মফিজ জার্মানির। গেদু প্রতিদিন দল বদলায়। আর লেদু? সে ফুটবল ভালোবাসে, কিন্তু কোনো দলের জন্য কারও সঙ্গে ঝগড়া করে না।
বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন পর বাজারে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
রাতে যে দলের পতাকা টাঙানো হয়, সকালে দেখা যায় তার পাশে অন্য দলের পতাকা ঝুলছে। ব্রাজিলের পাশে আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনার পাশে জার্মানি, জার্মানির পাশে আবার ব্রাজিল!
পুরো বাজারে হইচই পড়ে গেল।
আল্লেক রেগে বলল, এটা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাজ!
মজিদ প্রতিবাদ করল, বরং ব্রাজিলের লোকজন করছে!
মফিজ গম্ভীর মুখে বলল, আমার মনে হয়, এটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
গেদু ফিসফিস করে বলল, আমি শুনেছি, বিশ্বকাপ দেখতে বিদেশি গুপ্তচর এসেছে।
এই কথা মুহূর্তেই বাজারে ছড়িয়ে পড়ল। পরদিন সবাই একটাই কথা বলতে লাগল–‘আলোকদিয়ার বাজারে নাকি গুপ্তচর ঘুরছে!’
রাতে পাহারার ব্যবস্থা হলো। আল্লেক, মজিদ, মফিজ আর গেদু হাতে টর্চ নিয়ে বসে রইল। কিন্তু লেদু চুপচাপ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল।
রাত গভীর হলো। হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি দেখা গেল। লোকটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে একটি পতাকা খুলে অন্য একটি পতাকা লাগাতে শুরু করল।
আল্লেক চিৎকার করে উঠল,–ধর! গুপ্তচর!
চারদিক থেকে সবাই ছুটে এল।
কিন্তু লেদু বলল, কেউ এগিয়ো না। আগে দেখি ব্যাপারটা কী।
লোকটি কাজ শেষ করে চলে যেতে লাগল। লেদু নিঃশব্দে তার পিছু নিল। বাজারের সবাই দূর থেকে অনুসরণ করতে লাগল। লোকটি বাজারের শেষ মাথায় পুরোনো একটি ঘরের সামনে এসে থামল।
লেদু এগিয়ে গিয়ে বলল, চাচা, ভয় পাবেন না। আমরা শুধু জানতে চাই, আপনি কেন এটা করছেন?
টর্চের আলোয় দেখা গেল, তিনি বাজারের বৃদ্ধ পাহারাদার।
চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বাবারা, তোমরা ফুটবল নিয়ে এত ঝগড়া করো যে আমার কষ্ট হয়। তাই আমি সব দলের পতাকা একসঙ্গে লাগিয়ে দিই, যেন কেউ কারও শত্রু না হয়।
কথা শুনে সবাই হতবাক। আল্লেক মাথা নিচু করল। মজিদও চুপ। মফিজের মুখে কোনো কথা নেই। শুধু গেদু বলল, তা হলে গুপ্তচর নেই?
–না।
–ভিনগ্রহবাসীও না?
–না।
–আহা! আমি তো তিন দিন ধরে দূরবিন নিয়ে পাহারা দিলাম!
এ কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
পরদিন লেদু বাজারে একটি নতুন প্রস্তাব দিল, আমরা কেন শুধু নিজের দলের পতাকা টাঙাব? বিশ্বকাপ তো সবার উৎসব। চলুন, বাজারের মাঝখানে সব দেশের পতাকা একসঙ্গে তুলি।
প্রথমে সবাই অবাক হলেও পরে রাজি হয়ে গেল।
নির্ধারিত দিনে বাজারে মানুষ জড়ো হলো। আল্লেক, মজিদ, মফিজ, গেদু সবাই কাজ করছে। কিন্তু পতাকা তোলার সময় আবার ঝামেলা।
আল্লেক বলল, ব্রাজিলের পতাকা মাঝখানে থাকবে।
মজিদ বলল, না, আর্জেন্টিনার থাকবে।
মফিজ বলল, জার্মানির আগে কিছু হবে না।
তর্ক শুরু হয়ে গেল।
ঠিক তখন লেদু দড়ি হাতে নিয়ে বলল, পতাকার জন্য যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, তা হলে পতাকা তোলারই দরকার নেই।
সবাই চুপ হয়ে গেল। লেদুর কথা শুনে বাজারের মানুষ হাততালি দিল। শেষ পর্যন্ত সব দেশের পতাকা একসঙ্গে উড়ল আকাশে। সেদিন সন্ধ্যায় আলোকদিয়ার বাজার যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠল। গেদু হাসতে হাসতে বলল, আমি আজ থেকে সব দলের সমর্থক!
আল্লেক বলল, তা হলে হারলেও কষ্ট পাবি না।
গেদু উত্তর দিল, সেটাই তো সুবিধা!
এই কথা শুনে আবার হাসির রোল পড়ে গেল।
সেদিন থেকে আলোকদিয়ার বাজারে বিশ্বকাপ এলেই মানুষ লেদুর কথা মনে করে। কারণ সে সবাইকে বুঝিয়েছিল, ফুটবল মানুষকে ভাগ করার জন্য নয়, এক করার জন্য। আর সেই কারণেই লেদুই হয়ে উঠেছিল আলোকদিয়ার বাজারের বিশ্বকাপের আসল হিরো।

বিশ্বকাপ যুদ্ধে চার চ্যাম্পিয়ন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম
বিশ্বকাপ যুদ্ধে চার চ্যাম্পিয়ন
এঁকেছেন মাসুম

বিশ্বকাপ এলেই গ্রামের রহিম কাকার চায়ের দোকান আর চায়ের দোকান থাকে না। টকশো অনুষ্ঠান হয়ে যায় । চায়ের চেয়ে সেখানে বেশি চলে ফুটবল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক । সেখানে উপস্থিত হয় চারদলের চারজন বিশেষ ভক্ত। তারা হলেন– আরহাম (ব্রাজিল), আব্রাম (ফ্রান্স), নাবিল (আর্জেন্টিনা) আর বিপ্লব (জার্মানি)। তাদের আলোচনায় জমে ওঠে ফুটবল বিষয়ের তুমুল টকশো। 
আরহাম বুক ফুলিয়ে বলে, ব্রাজিল মানেই ফুটবলের রাজা! পাঁচটা বিশ্বকাপ এমনি এমনি আসেনি।
নাবিল হেসে উত্তর দেয়, ইতিহাসের গল্প বাদ দাও, এখন মাঠ কাঁপায় আর্জেন্টিনা!
আব্রাম বলে, আধুনিক ফুটবলের নাম ফ্রান্স।
বিপ্লব চশমা ঠিক করে বলে, তোরা কথা কম বল, জার্মানি সেভেন আপের বাপ। 
রহিম কাকা বিরক্ত হয়ে বলেন, তোরা চা খেতে আসিস, না বিশ্বকাপ পরিচালনা করতে আসিস?
হাসির রোল পড়ে যায়। এর পর শুরু হয় স্লোগানের লড়াই। 
নাবিল বলে, ব্রাজিল মানেই সেভেন আপ, আর্জেন্টিনা জেতে বিশ্বকাপ। 
আরহাম হেসে বলে, আর্জেন্টিনা তো হারপিক, জার্মানি দেয় গোল।
বিপ্লব বলে, ঠিক বলেছ ঠিক।
জার্মানি দল গোলের ইঞ্জিন, স্টার্ট হলে থামানো মুশকিল!
আব্রাম  বলে,  ফ্রান্স মানেই গতির  ফুটবল, মনে রেখো এটা এমবাপ্পের দল। 
এভাবেই স্লোগান চলতে থাকে। আর চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়তে থাকে।
একদিন চার বন্ধু বাজি ধরল, যার দল আগে বিদায় নেবে, সে সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াবে।
তার পর শুরু হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার। আরহাম লিখল, ব্রাজিল হারলে এক সপ্তাহ মোবাইল ধরব না। নাবিল লিখল, আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে পুরো গ্রাম নীল-সাদা পতাকায় সাজাব। আব্রাম লিখল, ফ্রান্স হারবে? আগে সূর্য পশ্চিমে উঠুক! আর বিপ্লব লিখল, শেষ হাসিটা আমার।
বিশ্বকাপ যত এগোতে লাগল, ততই কারও দল হোঁচট খেল, কারও স্বপ্ন ভাঙল। যে সবচেয়ে বেশি বড়াই করত, সে-ই একদিন সবচেয়ে চুপচাপ বসে রইল।
ফাইনালের পর আবার চারজন রহিম কাকার দোকানে মিলল। আজ কারও হাতে পতাকা নেই।
রহিম কাকা বললেন, কী রে, আজ তোদের গলা বসে গেছে নাকি?
আরহাম হেসে বলল, বুঝেছি, বড় বড় কথা বলে কাপ জেতা যায় না।
নাবিল বলল, আমি তো ভাবছিলাম দলের কোচ আমিই!
আব্রাম বলল, আমি কাপ রাখার জন্য আলমারিতে জায়গাও ঠিক করে ফেলেছিলাম!
বিপ্লব মাথা চুলকে বলল, আর আমি এমন বক্তৃতা দিয়েছি যে গ্রামের মানুষ ভাবছে আমি জার্মান দলের মুখপাত্র!
রহিম কাকা জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে সবচেয়ে বড় চ্যাম্পিয়ন কে?
চারজন একসঙ্গে বলল, আপনার চায়ের দোকান!
–কেন?
নাবিল বলল, এখানেই তো প্রতিদিন চারটা বিশ্বকাপ, আটটা সেমিফাইনাল আর ষোলোটা ঝগড়া হয়েছে!
বিপ্লব বলল, আগামী বিশ্বকাপেও ঝগড়া হবে।
আরহাম সঙ্গে সঙ্গে বলল, তবে এবার নিয়ম বদলাবে।
–কী নিয়ম?
আব্রাম হেসে বলল, যে হারবে সে বিরিয়ানি খাওয়াবে, আর যে জিতবে সে মিষ্টি খাওয়াবে!
রহিম কাকা হেসে বললেন, বাহ! বাহ! তা হলে তোদের বিশ্বকাপে হারলেও খাওয়া, জিতলেও খাওয়া!
চারজন চায়ের কাপ ঠুকিয়ে একসঙ্গে বলল, মাঠে চ্যাম্পিয়ন হয় একজন, কিন্তু বন্ধুত্বের বিশ্বকাপে আমরা চারজনই চ্যাম্পিয়ন।

বজলু ভাইয়ের দল বদলের রহস্য

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
বজলু ভাইয়ের দল বদলের রহস্য
এঁকেছেন মাসুম

বজলু ভাই দল পাল্টিয়ে মহাবিপদে পড়েছেন। ব্রাজিলিয়ান মানে তার সাবেক সাপোর্টার দলের ছেলেপেলে তাকে মনে মনে বিশ্বাসঘাতক, বেঈমান বলে গালি দেয়। আর বর্তমান দলের মানে আর্জেন্টিনা সাপোর্টাররা তাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অকূল পাথারে সাঁতার কেটে কেটে ভাবছেন, আবার আগের দলেই ব্যাক করবেন কি না! তবে সেটাতে বিপত্তি আরও বাড়বে, কমবে না। তখন আসল উদ্দেশ্য তো সফল হবেই না, বাড়তি পাওনা হিসেবে ব্রাজিলের সাপোর্টাররা তাকে আর্জেন্টিনার স্পাই আর আর্জেন্টিনার সাপোর্টাররা তাকে ব্রাজিলের স্পাই ভেবে বসে থাকবে।
বজলু ভাইয়ের দল পাল্টানোর পেছনের কারণটা লোকজন নানাভাবে ব্যাখ্যা করছে। এটা এই মহল্লায় এক প্রকার পিএইচডির টপিক হয়ে গেছে।
ব্রাজিলিয়ান সাপোর্টারদের গবেষণা অনুযায়ী, দল পাল্টানোর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো–প্রতিপক্ষের থেকে টাকা খেয়েছে, ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স খানিকটা খারাপ, গার্লফ্রেন্ডের প্রেশার কিংবা বিদেশি ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সাপোর্টারদের মতে, ব্রাজিলের স্পাই হয়ে কাজ করবে, আগামীতে আর্জেন্টিনা যাওয়ার প্ল্যান আছে, তাই ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে কিংবা আর্জেন্টিনার এবার যে পারফরম্যান্স তাতে কাপ ওরাই পাবে–তাই আগেভাগে দল পাল্টিয়ে বিজয় মিছিলে শরিক হওয়ার আয়োজন করছে।
তবে বজলু ভাইয়ের দল পাল্টানোর বিষয়টা অনেক সহজ ছিল না। এর জন্য তাকে অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে। 
ব্রাজিল যে তার কত প্রিয় ছিল! ২০০৬ ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ দেখা। তখন বড় চাচা, যিনি আর্জেন্টিনার প্লাটিনাম ক্যাটাগরির সমর্থক, বলেছিলেন, মনের ওপর জোরের দরকার নেই। যাদের খেলা মন থেকে ভালো লাগবে তাকেই সাপোর্ট করবি। আমাকে দেখ, ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা যে পারফরম্যান্স করেছে, এদের শাস্তিস্বরূপ সামনের একযুগ থাপড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু দেখ, এবারও ‘ভামোস ভামোস’ বলে চিল্লাচিল্লি করতেছি। মন রে, সবকিছুই মনের খেলা!
কাকার গতি, আদ্রিয়ানোর তেজ, কার্লোসের ফ্রি-কিক, রোনালদিনহোর ড্রিবলিং আর রোনালদোর চুলের স্টাইল তাকে এমনভাবে বিমোহিত করেছিল যেন ফুটবল বলতেই সে ব্রাজিলকে বুঝত। ব্রাজিল হলো ফুটবলের সূর্য আর বাকি দলগুলো গ্রহ-উপগ্রহ। তবে সেবার ফুটবলের সূর্য অক্ষচ্যুত হয়েছিল কোয়ার্টার ফাইনালেই।
তবু আটকে থাকেনি বজলু ভাই। একে একে চারটি বিশ্বকাপ চলে গেছে। ব্রাজিল কাপ জিততে তো পারেইনি, বরং ২০১৪ সালের সেমিফাইনালে সাত গোল খেয়ে ‘সেভেন আপ’ নামক কোমল পানীয়র সঙ্গে নিজের নাম জড়িয়ে ফেলেছে। তবু ব্রাজিল ছাড়েনি সে। বিপদে দলের পাশে না থাকলে সাপোর্টার হয়ে লাভ কী! তবে এবার কী ঘটল?
এবার আসল ঘটনা বলি–
কয়েক মাস আগে হঠাৎ করেই বজলু ভাইয়ের উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে। নিয়মিত মাথাব্যথা, বুক ধড়ফড়, ঘুমের সমস্যা–এসব নিয়ে একদিন ডাক্তার দেখাতে গেলেন। ডাক্তার অনেকক্ষণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, কোনো মানসিক চাপ আছে?
বজলু ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ডাক্তার সাহেব, ২০০৬ সাল থেকে ব্রাজিল সাপোর্ট করি।
ডাক্তার চুপ হয়ে গেলেন।
– তারপর?
– তারপর আর কী! ২০০৬ গেল, ২০১০ গেল, ২০১৪ সালে সাত গোল খেলাম, ২০১৮ গেল, ২০২২ গেল...
ডাক্তার এবার সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালেন, বুঝতে পারছি।
তিনি প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলেন। বজলু ভাই উঁকি দিয়ে দেখলেন, ওষুধের তালিকার নিচে মোটা অক্ষরে লেখা, ব্রাজিলের খেলা দেখা সীমিত করুন। প্রয়োজনবোধে আর্জেন্টিনা সাপোর্ট শুরু করুন।
বজলু ভাই অবাক। বললেন, এটা কি কোনো নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি?
ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। রোগ হওয়ার আগে কারণ দূর করা।
– কিন্তু ডাক্তার সাহেব, এত বছরের ভালোবাসা?
– ভালোবাসা থাকুক। তবে রোগীকেও তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
তারপর এক মাস ধরে দোটানায় ভুগেছেন বজলু ভাই। একদিকে দুই দশকের প্রেম, অন্যদিকে নিজের জীবন। মানুষ ভাবে দল পাল্টানো খুব সহজ। আসলে তা নয়।
২০ বছরের অভ্যাস, হাজারো স্মৃতি, অগণিত তর্ক-বিতর্ক, অসংখ্য ফেসবুক পোস্ট, শত শত ‘হেক্সা আসছে’ স্ট্যাটাস, তিনটি ব্রাজিল জার্সি, দুটি পতাকা আর একখানা হলুদ-সবুজ মাফলারকে বিদায় জানানো চাট্টিখানি কথা নয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে বজলু ভাইয়ের সবচেয়ে বড় ভয় অন্য জায়গায়। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর ফলোআপে গিয়ে যদি ডাক্তার প্রেসক্রিপশনের নিচে লিখে দেন, ‘আর্জেন্টিনা বন্ধ করুন। এবার জার্মানি শুরু করুন।’
তাহলে বজলু ভাই নিশ্চিত, রক্তচাপের চেয়ে বড় সমস্যা হবে পরিচয় সংকট।

অ্যান্টি-করোসিভ প্রেম

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০২:১৭ পিএম
অ্যান্টি-করোসিভ প্রেম
এঁকেছেন মাসুম

হাশেম কাকা সবকিছুতেই সমাধান খুঁজে পান। মরিচা ধরা তালা থেকে শুরু করে ভাঙা সম্পর্ক–সবকিছুর জন্য তার কাছে একটাই জবাব, ‘ভাই, আগে অ্যান্টি-করোসিভ লাগাও।’
কেউ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘কাকা, মানুষের সম্পর্কেও আবার অ্যান্টি-করোসিভ লাগে নাকি?’
কাকা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গম্ভীর মুখে বলেন, ‘লাগে তো! আজকাল মানুষের মনে লোহার থেকেও বেশি দ্রুত মরিচা ধরে।’
পাড়ার মিজান সাহেব তখন নিজের সংসারের অভিজ্ঞতা নিয়ে বললেন, ‘আমার বউ তো ছোট বিষয়েও রাগ করে। এর কোনো অ্যান্টি-করোসিভ আছে?’
হাশেম কাকা চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তার পর বললেন, ‘আছে। প্রতিদিন একটু প্রশংসা, মাঝে মাঝে চা বানিয়ে দেওয়া, আর মাসে একদিন বাজারে গেলে নিজে থেকে দাম না জিজ্ঞেস করে সঙ্গে সঙ্গে থাকা।’
মিজান সাহেব হতাশ হয়ে বললেন, ‘এত দামি জিনিস? বাজারের অ্যান্টি-করোসিভই সস্তা!’
কাকা হেসে বললেন, ‘বাজারেরটা লোহার মরিচা ঠেকায়, আর এটা সংসারের মরিচা।’
সেদিন থেকে পাড়ায় নতুন তত্ত্ব চালু হলো–
লোহার জন্য রং, আর সম্পর্কের জন্য যত্নের ঢং।
কিন্তু বিপদ হলো রহিম মিয়া ব্যাপারটা একটু বেশি সিরিয়াসলি নিয়ে ফেললেন। তিনি বাড়ির দরজা, জানালা, সাইকেল–সবখানে অ্যান্টি-করোসিভ লাগালেন। এমনকি স্ত্রীর পুরোনো রাগের তালিকার খাতায় পাশে লিখে রাখলেন–‘এখানে প্রলেপ দিতে হবে।’
স্ত্রী খাতা দেখে বললেন, ‘এই যে, আমার রাগেরও আবার মরিচা ধরে?’
রহিম মিয়া বললেন, ‘ধরে তো! পুরোনো রাগগুলোই তো সবচেয়ে বেশি জমে থাকে।’
স্ত্রী মুচকি হেসে বললেন, ‘তা হলে আগে তোমার জিহ্বায় অ্যান্টি-করোসিভ লাগাও। বেশি কথা বলার কারণে ওখানেই ক্ষয় বেশি।’
তার পর থেকে রহিম মিয়া নাকি কম কথা বলেন। পাড়ার লোকজন বলে, ‘দেখেছ, অ্যান্টি-করোসিভের আসলে কাজ করা শুরু হয়েছে!’
হাশেম কাকার শেষ মন্তব্য, ‘জীবনে মরিচা পড়বেই। তবে সময়মতো একটু হাসি, একটু ভালোবাসা আর একটু ক্ষমার প্রলেপ দিলে মানুষও চকচকে থাকে।’
আমরা বুঝে গেলাম–অ্যান্টি-করোসিভ শুধু লোহার নয়, সম্পর্কেরও প্রয়োজন।