তিন গ্রামের মিলনস্থল একটা মোড়। মোড়ের ঠিক মাঝখানে মজনু ভাইয়ের একমাত্র দোকান ‘ব্রাজিলিন্টিনা টি স্টল’। বিকেলবেলা বেশ জমজমাট হয়। এই দোকানের রেগুলার আর সবচেয়ে ভিআইপি কাস্টমার দুজন মুরব্বি। একজন শফিক মুনশি, আরেকজন রহমত পালোয়ান। দুজনের বয়সই সত্তর ছুঁইছুঁই প্রায়। মুখভর্তি ধবধবে সাদা দাড়ি, পরনে লম্বা জোব্বা, মাথায় টুপি। দুজনেই এলাকার বিশিষ্ট গণ্যমান্য ব্যক্তি।
শফিক মুনশি কট্টর ব্রাজিল সাপোর্টার। তার জোব্বাটা এখন টকটকে হলুদ, হাতা-গলায় সবুজ পাইপিং, পিঠে বড় করে ‘BRASIL-5’ লেখা। টেইলার্স থেকে অর্ডার দিয়ে টুপি, লুঙ্গি, গামছা পর্যন্ত হলুদ-সবুজ রঙে কাস্টমাইজড ডিজাইন করেছেন।
উনি বলেন, ‘ব্রাজিল মানে ফুটবলের শিল্প। ব্রাজিলের খেলোয়াড় হলো জন্মগত ফুটবলার।’
তিনি ১৯৮২ থেকে খেলা দেখেন। প্রিয় দলের প্রতি এতটাই দুর্বল যে, দোয়া করেন, ‘প্রভু, ব্রাজিলরে জিতায় দিও। আর মেসি যেন ইনজুরিতে পড়ে!’
রহমত পালোয়ান আবার আর্জেন্টিনার জন্য জান কোরবান। তার জোব্বা নীল-সাদা ডোরাকাটা, পিঠে সোনালি কালারে ‘MESSIDONA-10’ লেখা। তিনিও শফিক মুনশির মতোই লুঙ্গি, গামছা, টুপি, মোজা, এমনকি ভেতরের স্যান্ডো গেঞ্জিটাও নীল-সাদা রঙে কাস্টমাইজড ডিজাইন করে নিয়েছেন।
উনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনা খেলে দিল থেকে। মেসি আর ম্যারাডোনা হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্লেয়ার।’
তিনিও দোয়া করেন, ‘প্রভু, নেইমার যেন ফাউল করে লাল কার্ড খায়!’
দুই মুরব্বি এক বিষয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী; তা হলো ফুটবল। দুজন মিলে মজার পণ করেছেন। যেদিন আর্জেন্টিনা জিতবে বা যে কারও কাছে ব্রাজিল হারবে, সেদিন টি স্টলের সব দর্শকের নাশতার বিল দেবেন রহমত পালোয়ান। আর ব্রাজিল জিতলে অথবা আর্জেন্টিনা যে কারও কাছে হারলে বিল দেবেন শফিক মুনশি।
দুজনের এই পাগলামি আর ফ্রি নাশতার লোভে খেলার দিন দোকানে তিলধারণের জায়গা থাকে না। বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়। পোলাপান মজা করে তাই মজনু মিয়ার টি স্টলের নাম দিয়েছে ‘ব্রাজিলিন্টিনা টি স্টল’। দোকানের ভেতরে-বাইরে পুরোটাই ব্রাজিলিন্টিনা রঙে রাঙানো। খেলার দিন রীতিমতো এখানে মেলা বসে। কারণ এখানে খেলার চেয়ে বড় হলো দুই মুরব্বির তর্কাতর্কি। সেটাই পোলাপান বেশি উপভোগ করে।
চার বছর পর বিশ্বকাপ এলেই তুমুল তর্ক শুরু হয়। গতকাল ছিল ফাইনাল খেলা। পুরো গ্রামের লোক ‘ব্রাজিলিন্টিনা টি স্টলে’।
শফিক মুনশি বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘দেখিস রহমত, আমার সবুজ-হলুদের বরকতে আজ ব্রাজিল হালি হালি গোল দেবে।’
রহমত পালোয়ানও দমবার পাত্র নন। তিনিও গামছা টেবিলে রেখে বললেন, ‘আর আমার নীল-সাদার অছিলায় মেসি আজ হ্যাটট্রিকের ইতিহাস লিখবে। ব্রাজিল গোলের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়বে!’
অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে খেলা শুরু হলো। প্রথম গোলটা ব্রাজিল করলেও ৯০ মিনিট শেষে স্কোর হয় ২-২। অতিরিক্ত সময়েও গোল নাই! শেষ ভরসা পেনাল্টি। দোকানের সবারই দম বন্ধ, শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা! ব্রাজিল কয়েকটি পেনাল্টি মিস করল, শেষে আর্জেন্টিনাও মিস করল। পরিশেষে ম্যাচের ফলাফল হলো ড্র। এককভাবে ট্রফি কেউ পেল না। শেষমেশ দুদলকেই ট্রফি ভাগ করে দেওয়া হলো, যেন কেউই জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হয়; মন খারাপ না করে।
রাত সাড়ে ১২টায় খেলা শেষে দুই মুরব্বি চুপচাপ চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। মজনু মিয়া বলল, ‘চাচাজান, আপনাদের দল বিশ্বকাপ এককভাবে পায় নাই তো কী হয়েছে? এই নেন, আপনাদের জন্য আমি কাপ নিয়ে এসেছি। এইটাই আপনাদের কাপ।’
এ কথা বলেই চায়ের পাতির সঙ্গে ফ্রি পাওয়া আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সির ডিজাইনে রং করা দুটি সিরামিকের মগ এগিয়ে দিল মজনু মিয়া।
তার পর আবার বলল, ‘শোনেন চাচা, আপনাদের তর্কাতর্কি শুনেই পাড়ার পোলাপান আজ ফুটবলকে ভালোবাসতে শিখেছে।’
মজনু মিয়ার কথা শুনে শফিক মুনশি হাসলেন। তার পর বললেন, ‘ধন্যবাদ মজনু।’
একটু থেমে আবার বললেন, ‘নে রহমত, আজ থেকে আর ঝগড়া হবে না। তোর নীল-সাদার পাশে আমার সবুজ-হলুদ। আমরা দুজন মিলেই এক দল।’
রহমত পালোয়ান দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, “ঠিক কইছো বন্ধু। যেহেতু আমাদের দুই দলই সমান, তাই আমরা আজকে থেকে ‘ব্রাজিলিন্টিনা’।”