দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে। একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং, অন্যদিকে প্রিপেইড ও ডিজিটাল বিদ্যুৎ মিটারে অস্বাভাবিক বিল কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহক অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগ তুলছেন। খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যেও জনদুর্ভোগের এ রকম চিত্র ফুটে উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এই অস্বাভাবিক বিলের বোঝা তাদের ওপর অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাবনা প্রতিনিধির তথ্যমতে, মিটার রিডিং না করে জুন মাসে মনগড়া ও ‘ভূতুড়ে’ অতিরিক্ত বিল ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পাবনা পল্লি বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর আওতাধীন কাশীনাথপুর জোনাল ও সাথিয়া সাব-জোনাল অফিসের বিরুদ্ধে। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ বিল দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ হয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষোভ ও বিপাকে পড়েছেন বেড়া ও সাথিয়া উপজেলার শত শত সাধারণ গ্রাহক। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও বিলের অঙ্ক যেভাবে লাফিয়ে বেড়েছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। এদিকে সারা দেশের বেশ কিছু উপজেলায় দুই মাস ধরে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও, ভাঙচুর ও মানববন্ধন হয়েছে কয়েক দফা। সারা দেশে বিদ্যুৎ বিলের নামে ডাকাতির ঘটনায় গ্রাহকদের ক্ষোভ প্রকাশের পর বিদ্যুৎ বিভাগও নড়েচড়ে বসেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ অস্বাভাবিক বিলের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল-সংক্রান্ত অভিযোগ নিরসনে বিতরণ সংস্থার সঙ্গে সরাসরি বা হটলাইনে যোগাযোগের জন্য গ্রাহকদের অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎসংকটের দ্বিমুখী চাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন গ্রাহকরা। কয়েক মাস ধরে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মে-জুন মাসে বিলের নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় আগের মতো থাকলেও বিল বেড়েছে দ্বিগুণ, কোথাও কোথাও এর থেকেও বেশি। এ ধরনের অভিযোগ বর্তমানে রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর, জেলা থেকে উপজেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকদের মুখে মুখে। অন্যদিকে শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি লোডশেডিং হওয়ায় বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। গ্রাহকরা বলছেন, কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুৎ না পেয়েও কেন তাদের অস্বাভাবিক বিলের বোঝা বহন করতে হবে। শুধু বিলের পরিমাণ নয়, রিচার্জের পর কোন খাতে কত টাকা কাটা হচ্ছে, তা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও অন্য খাতে অর্থ কেটে নেওয়া হলেও তার স্বচ্ছ হিসাব অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় না। ফলে প্রকৃত বিদ্যুৎ বিল ও অতিরিক্ত চার্জের পরিমাণ সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন অভিযোগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ডিজিটাল মিটারের সফটওয়্যার, কনফিগারেশন, ওভার-রিডিং কিংবা বিলিংব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করা জরুরি। ডিজিটালব্যবস্থায় যদি অনিয়ম ঘটে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আগে অনিয়ম হতো ম্যানুয়ালি, এখন হচ্ছে ডিজিটাল পদ্ধতিতে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় দুর্নীতি বন্ধ না হলে জনগণের সঙ্গে এসব প্রতারণা চলতে থাকবে। বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সংকট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবের ফল। বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ না করলে শুধু গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত মূল্য চাপিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। যারা অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও ভোক্তার ক্ষতি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং পুরো খাতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে যে তুঘলকি কাণ্ড ঘটছে, তা সরকারকে খতিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটালব্যবস্থায় যদি অনিয়ম থাকে, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। গ্রাহকদের এ ধরনের ভোগান্তি থেকে স্বস্তি দিতে বিদ্যুৎ খাতে কাঠামোগত অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয় রোধকল্পে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে সাধারণ গ্রাহকদের স্বস্তি ফিরে আসবে।