সবুজে ভরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) কাম্প্যাস। এই কাম্প্যাসে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী আসে নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদকের ভয়াল ছোবলে সেই স্বপ্নপথ হতে বিচ্যুত হচ্ছে। ফলে মাদকাসক্তি অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘকাল ধরে চবির অনেক শিক্ষার্থী মাদকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চবির মাদকসেবন ও মাদকাসক্তির প্রবণতা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের মাদকের সহজলভ্যতা শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে নেশার দিকে আকৃষ্ট করছে। ফলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশ ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফুলের পাপড়ি যেমন প্রবল বাতাসে ঝড়ে যায়, ঠিক তেমনই শিক্ষার্থীরা নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আগেই বিপথগামী হয়ে যাচ্ছে।
বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীরা বর্তমানে মাদকসেবনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। এর পেছনে একটিমাত্র কারণ নয়, বরং সামাজিক, মানসিক এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ একসঙ্গে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সম্পর্কজনিত সমস্যার কারণে অনেক সম্পর্ক বিচ্ছেদে গিয়ে শেষ হয়। প্রিয় মানুষকে হারানোর মানসিক আঘাত, একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ হিসেবে অনেক শিক্ষার্থী মাদককে বেছে নেয়। চবির বিভিন্ন হল মাদকের আঁকড়ায় পরিণত হয়েছে। ক্রিমিনোলজির ভাষায় ‘পিয়ার ইনফ্লুয়েঞ্চ’ বা সমবয়সী বন্ধুদের প্রভাব ক্যাম্পাসে মাদকসেবনের উৎসাহ দেওয়ার ভূমিকা পালন করে। অগ্রজ, অনুজ কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে অনেকেই কৌতূহলবশত প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে এবং পরে আসক্ত হয়ে পড়ে। যেসব শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার আগে ধূমপান পর্যন্ত করেনি কিন্তু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রভাবে ধূমপান শুরু করে তাদের নিয়ে ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ, একবার ধূমপান শুরু করার পর মাদকের সহজলভ্যতা এবং সেবনের পরিবেশ পাওয়ার কারণে খুব সহজেই অধিক ক্ষতিকর দ্রব্য যেমন: গাঁজা, ইয়াবা, মদ, হেরোইন ইত্যাদি সেবন শুরু করছে। অন্যদিকে, ক্রিমিনোলজির ভাষায় ‘পিয়ার রিজেকশন’ বা সহপাঠীদের সার্কেল থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীরা নিজেদের গ্রহণযোগ্য মনে করতে বা মানসিক শূন্যতা পূরণ করতে মাদক গ্রহণ শুরু করছে। এ ছাড়া চবিতে অনেক শিক্ষার্থী জুয়ায় আসক্ত। এই জুয়ার আসক্তি অনেক বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। জুয়াতে টাকা হেরে আর্থিকসংকট এবং হতাশায় পড়ে অনেক শিক্ষার্থী সাময়িক স্বস্তির জন্য মাদক গ্রহণ করে। কিছু শিক্ষর্থী মাদক গ্রহণকে আধুনিকতা বা সাহসিকতার প্রতীক মনে করে সেবন করতে গিয়ে আসক্ত হয়ে পড়ছে। প্রত্যাশার অনুরূপ একাডেমিক ফলাফল যখন কোনো শিক্ষার্থী পেতে ব্যর্থ হয় তখন সেই হতাশা থেকে মুক্তি পেতে মাদকসেবন শুরু করছে। খারাপ আর্থসামাজিক অবস্থাও অনেক সময় মাদকাসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পারিবারিক অশান্তি, ভাঙন ও মানসিক অবহেলা অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে নিঃসঙ্গতার দিকে ঠেলে দেয়। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে মাদক সহজেই তাদের জীবনে প্রবেশ করে। অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেওয়া দুশ্চিন্তাও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা পথ ও কৌশলে মাদক ছড়িয়ে পড়ছে, যা শিক্ষাঙ্গনের সুস্থ পরিবেশের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে বহিরাগতরা বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। গত ৮ নভেম্বর ২০২৫ ক্যাম্পাসে ইয়াবা ও মাদকসেবনের সরঞ্জামসহ কয়েকজন বহিরাগত আটক হয়। ক্যাম্পাসে নম্বরবিহীন মোটরসাইকেল এবং সিএনজির মাধ্যমে মাদক প্রবেশ করছে। শুধু প্রধান ফটক নয়, ক্যাম্পাসসংলগ্ন বিভিন্ন অলিগলি ও বিকল্প পথও মাদক প্রবেশের নীরব করিডরে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চাষাবাদের জন্য ইজারা নেওয়া জমিতে অবৈধভাবে চোলাই মদ উৎপাদন ও বন্য প্রাণী শিকারের অভিযোগে একজন ব্যক্তিকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। অভিযানে প্রায় ৩০ লিটার চোলাই মদ এবং মদ তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্কে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। অধ্যয়নরত উপজাতি শিক্ষার্থীরা নিজ এলাকা (রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ইত্যাদি) থেকে ক্যাম্পাসে মাদক সরবরাহ করে আসছে। এই নেটওয়ার্ক পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নিরাপত্তা প্রহরীরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের পাশাপাশি কিছু অভ্যন্তরীণ ব্যক্তির সম্পৃক্ততায় একটি সংঘবদ্ধ মাদকচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে মাদকের বিস্তার দিন দিন আরও বেড়ে উঠছে। ক্যাম্পাসে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মাদক সরবরাহের সময় একাধিক শিক্ষার্থী প্রক্টরিয়াল বডির কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে। গত ৭ জুলাই ২০২৪ মাদকসেবনরত অবস্থায় ৩০ জন শিক্ষার্থী এবং ২৭ জুন ২০২৫ একই অভিযোগে আরও নয়জন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় কিছু স্থান মাদকসেবনের জন্য পরিচিত। ব্রিকফিল্ড, কলা ঝুপড়ি, লেডিস ঝুপড়ি, আইন অনুষদ ক্যান্টিনসংলগ্ন এলাকা, নীরা পাহাড়, জীববিজ্ঞান অনুষদের পেছনের অংশ, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, রেলওয়ে স্টেশন, বোটানিক্যাল গার্ডেন, প্যাগোডা, ঝরনা ও আশপাশের এলাকা, স্লুইস গেট এবং চবি কলেজের পেছনের অংশকে ঘিরে মাদকসেবার ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব এলাকাকে ঘিরে মাদকসেবীদের আনাগোনার অভিযোগ বেশি শোনা যায়।
একজন মাদকাসক্ত শিক্ষার্থী শুধু নিজের জীবন ও ভবিষ্যতের জন্যই নয়, তার পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও এক নীরব হুমকিস্বরূপ। সে একই সঙ্গে নিজের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করে বসে। এসবের ফলে একজন শিক্ষার্থীর একাডেমিক জীবন যেমন হুমকির মুখে পড়ে, অনেক সময় একেবারে স্থবির হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে পাঠানোর পেছনে প্রতিটি পরিবারের থাকে অসংখ্য স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তখন পরিবারের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করে। পরিবারকে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়; অনেক ক্ষেত্রে আসক্ত শিক্ষার্থী জোরপূর্বক অর্থ দাবি করে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এর ফলে সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের বিশ্বাস, আস্থা ও মানসিক শান্তি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্যাম্পাসে মাদকসংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাদকের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এলে তা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। মাদকের কারণে যখন একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা, দক্ষতা ও সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন এর প্রভাব ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে জাতীয় উন্নয়নের জন্য বাধাস্বরূপ হয়ে পড়ে। ফলে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং দেশের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে মাদকমুক্ত করতে হলে কেবল অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রয়োজনে নির্ধারিত নীতিমালার আওতায় শিক্ষার্থীদের ডোপ টেস্ট চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে এবং পরীক্ষায় মাদকসেবনের প্রমাণ মিললে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থায়নে প্রতি মাসে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সেমিনার, সচেতনতামূলক কর্মশালা, পোস্টার ক্যাম্পেইন ও উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজন করা জরুরি। গুরুতর আসক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী ও কাউন্সেলরের মাধ্যমে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্যাম্পাসে মাদক প্রবেশের সম্ভাব্য পথগুলোতে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত তল্লাশি জোরদার করতে হবে। মাদক সরবরাহকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগই একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে পারে।
লেখকদ্বয়: শিক্ষার্থী, তৃতীয় বর্ষ, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়