টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলাগুলোর বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
পাহাড়ি ঢল, বন্যা, দেয়াল ও পাহাড়ধসে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) শিশুসহ আরও ৫ জন নিহত হয়েছেন। ঝুঁকিতে রয়েছেন লাখো বাসিন্দা। এর আগে গত সোমবার কক্সবাজারে পাহাড়ধসে রোহিঙ্গাসহ ১০ জন নিহত হন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন কয়েক শ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির জেলার আজকের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল রাতে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
চট্টগ্রাম: টানা ভারী বর্ষণে ডুবেছে বন্দরনগরী। পতেঙ্গা এলাকায় সড়ক ধসে পড়েছে। আবার মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত হাটহাজারী এলাকায় সড়কে পানি ওঠায় উত্তর চট্টগ্রামের সঙ্গে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ জানিয়েছে, নালা-খাল পরিষ্কারের কাজ চললেও অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে পানি নামতে সময় লাগছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চসিকের বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে।
প্রাণহানি এড়াতে আকবরশাহ ঝিল, বিজয়নগর, শান্তিনগর, মতিঝর্ণা ও লালখান বাজার পোড়া কলোনিসহ ৯টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়ার তত্ত্বাবধানে সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) নেতৃত্বে গঠিত ৬টি বিশেষ টিম গতকাল সকাল থেকে মাইকিং চালায়। স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টায় পূর্ব নাসিরাবাদ রহমান নগর বি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের মাথায় একটি দেয়ালধসে পড়ে। এতে একজন নিহত এবং একটি শিশুসহ আরও তিনজন আহত হন।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ইছাখালী গুচ্ছগ্রামে টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৬) মারা গেছেন। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হয়েছেন। গতকাল বেলা ৩টার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে বসতঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে থাকা রেনু আক্তার ঘটনাস্থলেই মারা যান। আহত দুজনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পতেঙ্গা সি-বিচ পুলিশ বক্সের বিপরীত পাশে সড়কের একটি অংশ ধসে পড়ায় ওই অংশে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। খবর পেয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।
হাটহাজারীর বড়দীঘির পাড় এলাকায় মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে সড়কে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় উত্তর চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিকেলের দিকে পানি কমে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ষোলশহর স্টেশন থেকে ঢাকা-কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ছেড়ে গেলেও সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় ৮০০ যাত্রী নিয়ে ট্রেনটি আটকে পড়ে। একই সময়ে রেললাইনের ওপর গাছ পড়ে যাওয়ায় কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা প্রবাল এক্সপ্রেসও দোহাজারিতে আটকা পড়ে। জানালীহাট স্টেশনের স্টেশনমাস্টার নিজাম উদ্দিন জানান, পানি নেমে গেলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে।
চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতে আজকের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও রাঙামাটির জেলার আজকের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল রাতে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
অফিস আদেশে বলা হয়, ‘বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলার ৮/৭/২০২৬ তারিখ বুধবারের ইচএসসি/আলিম/এইচএসসি (বিএমটি), এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষা ২০২৬ স্থগিত করা হলো। অন্যান্য শিক্ষা বোর্ড এবং চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার ওই তারিখের পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষার সময়সূচি পরবর্তীতে জানানো হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’
৩টি ফ্লাইট ঢাকায় ডাইভার্ট
বৈরী আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। মঙ্গলবার তীব্র ঝোড়ো বাতাসের কারণে প্রায় সব ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের তিনটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় চলে যায়।
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের দায়িত্বরত প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল বলেন, রানওয়েতে পানি জমে যাওয়ায় নিরাপদ অবতরণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
বান্দরবান
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে বিভিন্ন স্থানে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জেলার থানচি ও রুমা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত সাঙ্গু নদীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ঝিরি-ঝরনায় হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে তিন্দু, রেমাক্রী ও নাফাখুমসহ দুর্গম পর্যটন এলাকায় শতাধিক পর্যটক আটকা পড়েছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হবে।
অব্যাহত বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবান-থানচি সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের সৃষ্টি হয়ে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে জননিরাপত্তার স্বার্থে আগামী ১০ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে এবং ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি
টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ স্থানীয় ছড়া-খালের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গতকাল দুপুর থেকে জেলা সদর, মহালছড়ি, পানছড়ি ও দীঘিনালাসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসের শঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় জেলার সব পর্যটন এলাকা বন্ধ রাখা হয়েছে।
নদীর পানি বেড়ে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের একাধিক স্থানে পানি উঠে যাওয়ায় গতকাল দুপুর থেকে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকায় হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের জরুরি প্রয়োজনে হেঁটে চলাচল করতে হয়েছে।
এদিকে টানা বর্ষণে জেলা সদরের শালবন, কুমিল্লাটিলা, সবুজবাগসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার কোথাও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেনি।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, এখন পর্যন্ত বন্যাপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা সদরে ৩টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং উপজেলাগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
রাঙামাটি
অবিরাম বর্ষণে রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে জেলা শহরসহ ১০ উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে স্থানীয় প্রশাসন মাইকিং করছে। ইতোমধ্যে শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। জেলায় মোট ৪৪টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার লাইল্যাঘোনা এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে গড়িয়ে পড়া গাছের গুঁড়ির আঘাতে লক্ষ্মীবিলাশ চাকমা (৪৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা মারজান।
অন্যদিকে মঙ্গলবার সকালে কাপ্তাই-চট্টগ্রাম সড়কের বালুচরা এলাকায় পাহাড়ধস ও গাছ উপড়ে পড়ায় সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। মাটি ও গাছ অপসারণের পর সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়।
গত সোমবার সকাল থেকেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত শহরের লোকনাথ মন্দির আশ্রয়কেন্দ্রে ২১টি পরিবারের শিশুসহ ৭০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী লোকনাথ মন্দির এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে বলেন, মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সম্ভাব্য পাহাড়ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে যাতে কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সে লক্ষ্যে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
ফেনী
২০২৪ সালের আগস্টের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি ফেনীর মানুষ। সেই ক্ষত না শুকাতেই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বর্ষণে জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
জেলার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র গতকাল জানিয়েছে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ও পাহাড়ি এলাকায় গত কয়েক দিন ধরে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর প্রভাবে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত আরও বৃদ্ধি পেলে এসব নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ বেড়েছে। ২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হলেও প্রবল পানির চাপ সেগুলো সহ্য করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, ফেনীসহ পাঁচ জেলার জন্য বন্যা পূর্বাভাস জারি করা হয়েছে। বর্তমানে জেলায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল দেখা দিলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
কক্সবাজার
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলার অন্তত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক, কুতুবদিয়ার পাঁচটি গ্রাম এবং মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া টানা বৃষ্টিতে উখিয়ার ২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৪০টির বেশি আশ্রয়ঘরে পানি প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পাহাড়ি ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছেড়ে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে অতিরিক্ত জলাবদ্ধতার কারণে পানির তীব্র স্রোতে কুতুবদিয়ার লেমশীখালী ইউনিয়নের শাহাজীরপাড়া ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মলমচর এলাকার সংযোগ সেতু ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে ২০১৭ সালে উখিয়া ও টেকনাফে প্রায় ৮ হাজার একর বনভূমি উজাড় করে গড়ে তোলা ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে অন্তত ১ লাখ মানুষ ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কয়েক দিনের টানা বর্ষণে ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আট রোহিঙ্গার মৃত্যুর পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবারের প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে মাইকিং করে নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থা তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করেছে বলে জানিয়েছেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
এ ছাড়া টানা তিন দিনের বৃষ্টি ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অন্তত ১৬টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, প্লাবনের পর উপকূলীয় সব স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কন্ট্রোল রুম চালু রাখা হয়েছে।
পেকুয়া (কক্সবাজার)
টানা কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার মধ্যেই পেকুয়া উপজেলার টৈটং এলাকায় পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে চকরিয়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর কার্যালয় পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, কোথাও বেড়িবাঁধ ভাঙছে কি না কিংবা পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
উখিয়া (কক্সবাজার)
কক্সবাজারের উখিয়ায় টানা বর্ষণের মধ্যে ঘরের দেয়াল ধসে আব্দুল মালেক (৪০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টার দিকে উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জামবাগান এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়রা জানান, অতিবৃষ্টির সময় শ্বশুরবাড়িতে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় ঘরের মাটির দেয়ালধসে পড়লে আব্দুল মালেক চাপা পড়েন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে বিকেল ৫টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, হলদিয়াপালং ইউনিয়নে দেয়ালচাপায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।