বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এই সমুদ্রসীমায় একটি কাতারি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকারসহ দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। কাতার এই হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে। আক্রান্ত কাতারি জাহাজটিতে আগুন ধরে যাওয়ায় এটি যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই হামলার ঘটনা ঘটল, যখন ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে দেশটিতে পঞ্চম দিনের মতো লাখো মানুষের বিশাল শোকমিছিল চলছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি না হলে পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা তৈরি করেছে।
গতকাল ভোর রাতে কাতারের বিশাল এলএনজি ট্যাংকার ‘আল রেখায়াত’ ড্রোন হামলার শিকার হয়। হামলার পর জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায়। জাহাজের ক্যাপ্টেন এক জরুরি রেডিও বার্তায় বলেন, ‘মে ডে, মে ডে, মে ডে। এটি এলএনজি জাহাজ আল রেখায়াত। আমাদের জাহাজের বাম পাশে, ইঞ্জিন রুমের ওপর ড্রোন আঘাত হেনেছে। ইঞ্জিন রুমে আগুন লেগেছে এবং চারদিক ধোঁয়ায় ভরে গেছে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বুঝতে পারছি না।’ জাহাজটির ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হলেও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগুনের কারণে জাহাজটি যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারে। এ ছাড়া ওমান উপকূলে ‘ওয়াদিয়ান’ নামে একটি সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেলবাহী সুপারট্যাংকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে এর সঠিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।
এই ঘটনার পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি একে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর একটি ‘অগ্রহণযোগ্য আক্রমণ’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। কাতার অবিলম্বে ইরানকে এই ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকিস্বরূপ কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। দোহা স্পষ্ট করেছে, এই হামলার সব ধরনের আইনি দায় ও পরিণতির জন্য তেহরানই সম্পূর্ণ দায়ী থাকবে। এ বিষয়ে তেহরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য বা দায় স্বীকার করা হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিক আলামত অনুযায়ী ইরানই এই দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালিয়েছে। চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার পর থেকে সাময়িক যুদ্ধবিরতির মাঝে হরমুজ প্রণালিতে এটিই প্রথম হামলার ঘটনা।
এদিকে ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্মরণে দেশটির পবিত্র নগরী কোমে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছে। গতকাল নগরীর সেমিনারি এলাকার রাস্তায় খামেনি এবং তার নিহত পরিবারের সদস্যদের কফিন নিয়ে বিশাল শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলে অংশ নেওয়া লাখো মানুষ ব্যানার ও পতাকা হাতে নিয়ে খামেনিকে শিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম শহিদ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন এবং মিছিলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়। এর আগে সোমবার তেহরানের বুকেও লাখো মানুষের উপস্থিতিতে একই ধরনের বড় জানাজা ও শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খামেনির মরদেহ প্রতিবেশী দেশ ইরাকের শিয়া পবিত্র শহরগুলোতে নিয়ে যাওয়া হবে এবং এরপর ইরানে এনে একটি ঐতিহাসিক মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে এক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত মাসে স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির অধীনে বর্তমানে যুদ্ধটি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। তবে কাতারে অনুষ্ঠিত পরোক্ষ আলোচনা কোনো স্থায়ী সমাধানের পথ দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘হয় আমাদের সঙ্গে একটি চুক্তি করুন, না হলে আমরা কাজ শেষ করব। আমরা এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের সব সেতু উড়িয়ে দিতে পারি, আমরা তাদের জ্বালানি সরবরাহ ধ্বংস করে দিতে পারি।’
ট্রাম্পের এই হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতির স্মারক অনুযায়ী হুমকি অব্যাহত থাকলে চূড়ান্ত চুক্তির কোনো আলোচনা শুরু হবে না। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তাঁর নিজের স্বাক্ষরের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানান।
চার মাস আগে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং দেশটির সরকার পতনের পরিবেশ তৈরি করা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এর কোনো লক্ষ্যই এখনো অর্জিত হয়নি। এদিকে এই হামলার খবরের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা