নীল নদে ডুবতে বসেছিল আর্জেন্টিনা। খেলার ৭৮ মিনিট চলে গেছে। মিসরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে। মেসির পেনাল্টি মিস। মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের চীনের প্রাচীর হয়ে উঠেছেন। মেসির পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেওয়া ছাড়াও আরও অনেক সুযোগ নস্যাৎ করে দেন। তাকে কিছুতেই পরাস্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। আবার কোনোটি পোস্টে লেগে ফিরে এসেছে। সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার অনুকূলে কোনো কিছুই নয়! ফুটবলের খুদে জাদুকরের শেষ দেখা শুরু করেছেন ভক্ত-সমর্থকরা। অনেকেই আবার শেষ বত্রিশে বেলজিয়াম-সেনেগালের ম্যাচের স্মৃতিচারণা করে নতুন করে আশাায় বুক বাঁধছেন। সেই ম্যাচে বেলজিয়াম ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকে ৪ মিনিটে ২ গোল করে পরে অতিরিক্ত সময়ের গোলে ম্যাচ জিতেছিল ৩-২ গোলে। সেই ম্যাচই যেন নতুন রূপে ফিরে আসে আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে। ১১ মিনিটে ঝড় উঠে নীল নদে। যে ঢেউয়ে মিসরের স্বপ্ন ডুবে গিয়ে ভেসে ওঠে আকাশি রঙের ঢেউ। গুনে গুনে তিন গোল করে আর্জেন্টিনা পাড়ি দেয় নীল নদের উত্তাল ঢেউ। রূদ্ধশ্বাস আর চরম নাটকীয়তায় ভরা ম্যাচ জিতে ফাইনালে ওঠা থেকে দুই ধাপ পেছনে তারা। কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে সুইজারল্যান্ড-কলম্বিয়ার জয়ী দলের বিপক্ষে ১২ জুলাই বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায়।
খেলার শুরু থেকে মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেরকে কিছুতেই পরাস্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না আর্জেন্টাইনদের। অনেক চেষ্টার পর সেখানে তাকে প্রথম পরাস্ত করেন রোমেরো। গোলের উৎস মেসি। ডান প্রান্ত থেকে তার বাম পায়ের ক্রসে রোমেরোর হেড জালে প্রবেশ করে। তবে এবারও মোস্তফা হাত দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার হাত লেগে বল জালে প্রবেশ করে। এই গোলে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় মেসিবাহিনী। মোস্তফা শোবেরকে পরাস্ত করার গোমর পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। মিসরের খেলোয়াড়রাও কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েন। এক গোলের লিড যেকোনো সময় ২-২ হয়ে যেতে পারে। গোল ধরে রাখায় তারা ব্রত হয়। কিন্তু উদ্দীপ্ত আর্জেন্টিনার সামনে তাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। যে মোস্তফা শোবেরকে পরাস্তই করা সম্ভব হচ্ছিল না, তাকে দ্বিতীয়বার পরাস্ত করেন মেসি। ৮৪ মিনিটে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বাম প্রান্ত থেকে বল পেয়ে মন্টিয়েল পা লাগাতে ব্যর্থ হন। পরে তিনিই সেই বল বাড়িয়ে দেন মেসির উদ্দেশে। মেসি বাম পায়ে নিশানা ভেদ করে সবার বুক থেকে পাথর চাপা নামিয়ে দেন। খেলায় সমতা আনার পর আর্জেন্টাইনরা জয়ের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে। গোল তাদের চাই-ই চাই। খেলা গড়ায় ইনজুরি টাইমে। আর সেখানেই কিস্তি মাত করেন এনজো মার্তিনেজ। ইনজুরির টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে বল আকাশে ভাসিয়ে দেন বদলি লাউতারো মার্তিনেজ। সেই ভেসে থাকা বলে নজর রেখে এনজো মার্তিনেজের মাথা ছুঁইয়ে বল জালে প্রবেশ করে নীল নদে আকাশি ঢেউ তোলেন। পিরামিডের দেশের ফুটবলাররা যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করাতে পারছে না!
নক আউট পর্ব মানেই ঝরে পড়ে। শুরু হয়েছিল জার্মানিকে দিয়ে। প্রি-কোয়ার্টারে এসে তারকাদের ঝরে পড়ার গতি বেড়ে যায়। শুরুটা ক্রোয়েশিয়ার মদ্রিচকে দিয়ে। তারপর বিদায় নেন সাম্বার দেশের নেইমার। এরপর বিদায় ধ্বনি শুনেন পর্তুগিজ যুবরাজ রোনালদো। টানা তিন তারকা ফুটবলারের বিদায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাসতে থাকে এবার কার পালা? অনেকেই সেখানে মেসির নাম লিখেন। তবে মোহাম্মদ সালাহর নাম ছিল বেশি। কিন্তু তারপরও মেসি ভক্তদের মাঝে অজানা আশঙ্কা ভর করেছিল। যদি কিছু ঘটে যায়! তবে খুদে জাদুকর সব শঙ্কাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ভক্তদের অন্তরে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিয়েছেন। শঙ্কার ভোর হলেও ঘুমটা আরামদায়ক হয়ে ওঠে তাদের। তুলির আঁচড়ে সবুজ মাঠকে শিল্পের ক্যানভাসে পরিণত করেন তিনি। ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আবারও এককভাব সবার উপরে। বিশ্বকাপে মোট গোল বাড়িয়ে নিয়ে গেছেন ২১-এ। টানা নবম ম্যাচে গোল করার কীর্তিকে আরও মজবুত করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে ২০৪ ম্যাচে তার গোল ১২৫টি।
মেসি মেসিই। পেনাল্টি মিস করেছেন। আবার গোল করতে ভূমিকা রেখেছেন। নিজেও সমতাসূচক গোল করেছেন। দুর্দান্ত খেলেছে তার দল। যদি মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের প্রাচীর হয়ে না উঠতেন, তাহলে এই ম্যাচ আর রুদ্ধশ্বাসে সমাপ্ত হয় না। সহজ জয়েই আর্জেন্টিনা বৈতরণি পার হতো। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও মেসি পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি। পরে ২ গোল করে দল জিতেছিল ৩-০ গোলে। কিন্তু এবার যখন পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন, তখন তার দল ১-০ গোলে পিছিয়ে। ১৪ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে মারওয়ান আত্তিয়ার মাপা ক্রস থেকে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্তব্ধ করে দিয়ে নীল নদে ঢেউ তোলে ২ নম্বর জার্সি পরিহিত ইয়াসির ইব্রাহিমের হেডে গোল করে। তিনি হেড নেওয়ার সময় আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ লাফিয়ে উঠেও ঠেকাতে পারেননি। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্তব্ধ করে দিয়ে নীল নদে ঢেউ তোলেন। ইয়াসির হেড নেওয়ার সময় আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মর্টিনেজ লাফিয়ে উঠেও ঠেকাতে পারেননি। পিছিয়ে পড়ার ৪ মিনিট পরই আর্জেন্টিনা গোল পরিশোধের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল। মিসরের হাসাম হোসেন বক্সে নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টি দেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মেসি আবারও পেনাল্টি মিস করেন। তার নেওয়া শট বাম দিকে ঝঁপিয়ে পড়ে আটকে দেন মোস্তফা শোবের। বিশ্বকাপে আটটি পেনাল্টি নিয়ে এটি ছিল তার চতুর্থ পেনাল্টি মিস। পেনাল্টি থেকে গোল করতে না পারার পর শুরু হয় মোস্তফা শোবের শো। ২৮ মিনিটে মোস্তফা শোবের আরেকবার দলকে গোল হজম করা থেকে রক্ষ করেন। অ্যালিস্তেরের হেড মোস্তফা ফিরিয়ে দেন। ২ মিনিট পর আর্জেন্টিনার গোল পরিশোধে বাধা হয়ে ওঠে গোলপোস্ট। মেসির ফ্রি কিক গোলে ঢোকার মুহূর্তে সাইড বারে লেগে বাইরে চলে যায়। ৩৯ মিনিটে আবারও মোস্তফা শোবের শো। এবার বক্সের ভেতর থেকে জুলিয়ান আলভারেজের শট মোস্তফা শোবের একইভাবে বাম দিকে ড্রাইভ দিয়ে রক্ষা করেন।
দ্বিতীয়ার্ধেও আর্জেন্টিনা আক্রমণ ধারা অব্যাহত রাখে। ৪৮ মিনিটে ডি পলের শট যথারীতি মোস্তফা শোবেরের বিশ্বস্ত হাত ঠেকিয়ে দেয়। ক্রমাগত আক্রমণ ঠেকিয়ে মিসর ৫৮ মিনিটে জিকোর গোলে এগিয়ে যায়। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা মাথায় হাত দিয়ে বসেন। কেউ জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তাদের মাঝে স্বস্তি এনে দেন রেফারি গোল বাতিল করে ফাউল দিলে। গোল হওয়ার আগেই নিজেদের সীমানায় আত্তিয়া ফাউল করেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে। রেফারি ভিএআর চেক করে ফাউল দিয়ে গোল বাতিল করে দেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি আর্জেন্টিনার। ৬৭ মিনিটে সেই জিকোর গোলে মিসর ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। সালাহ থেকে হাসেম হাসান ডান দিক দিয়ে ঢুকে জিকোকে উদ্দেশ্য করে বল বাড়িয়ে দেন। ঠান্ডা মাথায় ডান পায়ের প্লেসিং শটে গোল করেন। এ সময় আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের একজন খেলোয়াড় চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেননি। এ সময় আর্জেন্টিনা আর মেসির বিদায় দেখতে শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ফুটবল খেলায় শেষ বল কিছু নেই। শেষের দিকে গিয়ে অনেক নাটকীয়তা সৃষ্টি হওয়ার উদাহরণ আছে, যা নতুন করে আরেকবার আর্জেন্টিনা করে দেখায়। আর এমন রুদ্ধশ্বাস জয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেসি।