‘তাদের ৮ নম্বর জার্সিধারীকে দেখে আমি সত্যিই আনন্দদায়কভাবে বিস্মিত হয়েছিলাম। হে ঈশ্বর, ছেলেটা কে?’, মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে স্পেন যখন ফিফা বিশ্বকাপ কাতার ২০২২ থেকে বিদায় নিয়েছিল, তখন কিছুটা বিস্মিত কণ্ঠেই প্রশ্ন করেছিলেন লুইস এনরিকে। যার কথা তিনি বলছিলেন, তিনি আর কেউ নন, মাত্র ২২ বছর বয়সী আজ্জেদিন উনাহি। তখন তিনি লিগ ওয়ানের ক্লাব অ্যাঞ্জার্সের হয়ে খেলতেন এবং ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে অভিষেক হওয়া একজন তরুণ ফুটবলারের স্বাভাবিক নির্ভার আত্মবিশ্বাস নিয়েই খেলছিলেন।
এনরিকে আরও বলেছিলেন, ‘ম্যাচজুড়ে সে এক মুহূর্তের জন্যও দৌড়ানো থামায়নি। আমার মনে হয়, ম্যাচ শেষে তার দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিও থাকার কথা নয়। সে অসাধারণ খেলেছে। মরক্কো সত্যিই ভাগ্যবান যে এমন একজন খেলোয়াড় তাদের দলে আছে।’ সাবেক স্পেন কোচই তার একমাত্র ভক্ত ছিলেন না। নতুন এই তারকার নিরলস দৌড়, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা এবং চোখধাঁধানো কারিগরি দক্ষতা সব মহল থেকেই প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারানোর পর মরক্কো আরও এক ধাপ ইতিহাস গড়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারায়। তবে সেমিফাইনালে ক্লিনিক্যাল ফ্রান্সের বিপক্ষে তাদের অভিযান থেমে যায়। ফ্রান্স ২-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে। চার বছর পর আবারও বিশ্বমঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও মরক্কো। এবার বোস্টন স্টেডিয়ামে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াই।
আফ্রিকান ফুটবলের অন্যতম শক্তিধর মরক্কো এখন নিয়মিতভাবেই বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে এবং তারা আবারও গৌরব ছুঁতে মুখিয়ে। তবে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নামা ফ্রান্সকে হারাতে হলে মরক্কোর সবচেয়ে প্রভাবশালী মিডফিল্ডার উনাহিকে খেলতে হবে নিজের সেরা খেলাটা। উনাহির ক্যারিয়ারের শুরু থেকে তাকে দেখে আসা মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর নাসের লারগুয়ে বলেন, ‘সত্যি বলতে, ২০২২ সালে সে যতটা ভালো খেলেছিল, আমি তাতে বিস্মিত হয়েছিলাম। কারণ অ্যাঞ্জার্সে খেলা আর বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের বিপক্ষে খেলার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, বিশেষ করে যখন আপনি তরুণ। তবে সবাই বুঝতে পেরেছিল, সে একজন অসাধারণ ফুটবলার।’
মোহাম্মদ ওয়াহবির অধীনে উনাহি এখন আগের চেয়ে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকায় খেলেন। ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের সময় যেখানে তিনি রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডে খেলতেন, এখন তিনি প্রতিপক্ষের গোলের আরও কাছাকাছি অবস্থান নেন। সহ-আয়োজক কানাডাকে শেষ ষোলোতে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচে প্রথম গোলটি করেছিলেন উনাহি। ফ্রি-কিকের পরিকল্পিত মুভ থেকে তিনি দুর্দান্ত এক শটে গোল করেন। পরে দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে শক্তিশালী ফিনিশে নিজের জোড়া গোলও পূর্ণ করেন। ম্যাচ শেষে তার তরুণ মিডফিল্ড সতীর্থ সামির এল মুরাবেত বলেন, ক্যাসাব্লাঙ্কায় জন্ম নেওয়া এই পাসিং মাস্টার তার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী খেলোয়াড়দের একজন।
উনাহির বড় সমর্থকদের একজন লারগুয়ে মার্চে ওয়াহবি দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় দলে তার পরিবর্তন নিয়ে বলেন, ‘মাঠের ভেতরে তার গুণাবলি একই আছে। তবে গত চার বছরে অর্জিত পরিপক্বতা থেকে আসা আত্মবিশ্বাস এখন তার বড় শক্তি। ওয়াহবি তাকে আরও সামনে উঠে প্রতিপক্ষের গোলের কাছাকাছি যাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। ২০২২ সালে সে রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে সংযোগ তৈরি করত এবং অ্যাসিস্ট দিত। আর এখন সে নিজেই গোল করছে।’
চার বছর আগে বিশ্বকে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর থেকে ক্লাব ক্যারিয়ারে উনাহির পথচলা খুব একটা মসৃণ ছিল না। কাতারে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি মার্সেইয়ে যোগ দেন। কিন্তু লিগ ওয়ানের শক্তিশালী এই ক্লাবে নিয়মিত খেলার সুযোগ পাননি। ফলে পরের বছরের সেপ্টেম্বরে তাকে ধারে পাঠানো হয় গ্রিসের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব পানাথিনাইকোসে। গত আগস্টে তিনি নতুন ঠিকানা খুঁজে স্পেনের ক্লাব জিরোনার সঙ্গে স্থায়ী চুক্তি করেন। যদিও গত মৌসুমে ক্লাবটি স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগে নেমে গেছে।
ক্লাব পর্যায়ে নানা উত্থান-পতন থাকলেও জাতীয় দলে তিনি নিয়মিত মুখ। ২০২৩ ও ২০২৫ সালের আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সেও তিনি মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। লারগুয়ের কথায়, ‘দেশের হয়ে খেললে তার জার্সির প্রতি ভালোবাসা স্পষ্ট বোঝা যায়। দলে জায়গার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতাও তাকে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করে। সে এমন একজন খেলোয়াড়, যার ভালোবাসা দরকার এবং যার প্রাপ্য দায়িত্ব তাকে দিতে হয়। আমার একমাত্র আফসোস, ক্লাবগুলো সব সময় তার ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখেনি।’
ফ্রান্সকে হারিয়ে এবারও ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে আটলাস লায়ন্স। সে লক্ষ্য পূরণে তাদের ভরসা থাকবে সেই মিডফিল্ড পরিচালক উনাহির ওপর। ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করা, আক্রমণ সাজানো এবং ফরোয়ার্ডদের জন্য সুযোগ তৈরি করার দায়িত্ব থাকবে তার কাঁধে। সাবেক অ্যাঞ্জার্স তারকা বরাবরই বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। চার বছর আগে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্সের বিপক্ষে হারের ম্যাচেও তিনি ছিলেন মরক্কোর অন্যতম সেরা পারফর্মার।
লারগুয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘ওর বয়স যখন মাত্র ১০ বা ১২ বছর, তখনই ক্যাসাব্লাঙ্কায় আমরা তাকে প্রথম দেখি। ওই বয়সেই নিজেদের এলাকায় আয়োজিত টুর্নামেন্টে ছোটরা বড়দের বিপক্ষে খেলত। সেসব ম্যাচে খেলতে খেলতেই সে পরিণত হয়েছে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস তৈরি করেছে। নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে তার বাস্তবসম্মত আত্মবিশ্বাস রয়েছে। সে প্রয়োজনের সময় নিজের পারফরম্যান্স আরও উঁচুতে নিতে পারে, কিন্তু কখনো বাড়াবাড়ি করে না।’
এখন পিএসজির কোচ লুইস এনরিকে নিশ্চয়ই বোস্টনের ম্যাচটির দিকে গভীর নজর রাখবেন। তবে এবার আর তাকে বা অন্য কাউকেই মরক্কোর ৮ নম্বর জার্সিধারী কে, সেই প্রশ্ন করতে হবে না।