মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতের রেশ এখন কেবল তেলের বাজার বা নৌপথের অনিশ্চয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সুদূর আফ্রিকাতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। বৈশ্বিক এই অস্থিরতা আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য যেমন নতুন ঝুঁকি এনেছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সংস্কারের এক অভূতপূর্ব সুযোগও তৈরি করেছে।
নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া
মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে ওয়াশিংটন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের মনোযোগ এখন ওদিকেই বেশি। ফলে সাহেল ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে পশ্চিমা নিরাপত্তা সহায়তা ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে স্থানীয় সরকাররা। এই সুযোগে আফ্রিকায় ইরানের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা যেমন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে আর্থিক সংকটে পড়তে পারে, তেমনি রাশিয়া ও তুরস্কের মতো বিকল্প শক্তিগুলোর প্রভাবও বাড়ছে। রাশিয়ার ‘আফ্রিকা কর্পস’ এবং তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা রপ্তানি আফ্রিকার নিরাপত্তা বাজারে নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দিচ্ছে।
সুদান ও লোহিত সাগরের লড়াইতে নতুন মাত্রা
ভূ-রাজনৈতিক এই দ্বৈরথের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে সুদানের গৃহযুদ্ধে। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, মার্কিন-ইরান সংকট সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে কাছাকাছি এনে সুদানের উত্তেজনা কমাবে। কিন্তু বাস্তবে লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও গভীর হয়েছে। সুদানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ইরানের কথিত সহযোগিতা এই সামুদ্রিক করিডোরকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে, ফলে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক নির্ভরতা হ্রাসের তাগিদ
হুরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কারণে আফ্রিকার আমদানি করা জ্বালানি, সার ও নিত্যপণ্যের পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে এই সংকট আফ্রিকার নীতিনির্ধারকদের এক দশকের পুরনো কাঠামোগত দুর্বলতা সংশোধনে বাধ্য করছে। আফ্রিকা অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করলেও পরিশোধিত তেলের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
হুরমুজ সংকট এটাই মনে করিয়ে দেয়, আফ্রিকার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা জড়িত। এটি অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনা এবং জ্বালানি ও বাণিজ্য খাতে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা শক্তিশালী করার তাগিদকে আরও জোরদার করেছে।
সংকটই এখন বড় সুযোগ
আফ্রিকা সিইও ফোরামের পাবলিক সেক্টরের প্রধান মেরি কামারাসহ একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই বিশৃঙ্খলাকে কেবল বিঘ্ন হিসেবে না দেখে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আফ্রিকার অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে নেওয়া উচিত। আফ্রিকার দেশগুলো এখন ‘আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়ার’ (এএফসিএফটিএ) মাধ্যমে আন্তঃআফ্রিকান বাণিজ্য বাড়াতে এবং বহিরাগত শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে।
তবে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ, বাজার স্থিতিশীল হলে আফ্রিকান সরকারগুলো আবারও পুরনো ধারায় ফিরে যাবে, নাকি এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদী নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করবে?
থিওটোনিয়াস/