এক টুকরো সাদা কাগজ। কয়েকটি নিখুঁত ভাঁজ। তারপর কাঁচির দ্রুত চলাচল। সময় লাগে মাত্র ২১ দশমিক ৮৪ সেকেন্ড। এত অল্প সময়েই কাগজের টুকরোটি রূপ নেয় তুষারকণায়। আর সেই মুহূর্তেই বিশ্বের সবচেয়ে স্বীকৃত রেকর্ডের খাতা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে তৃতীয়বারের মতো জায়গা করে নেন বরিশালের তরুণী নুসরাত জাহান নিপা।
এর আগে কয়েন দিয়ে টাওয়ার তৈরি এবং চপস্টিক দিয়ে এক মিনিটে ২৭টি ভাতের দানা খেয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এবার দ্রুততম সময়ে কাগজের স্নো-ফ্লেক বা তুষারকণা তৈরি করে যোগ করলেন তৃতীয় সাফল্য। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে তিনবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানোর কৃতিত্বও অর্জন করলেন তিনি। যাচাই-বাছাই শেষে সম্প্রতি তার হাতে পৌঁছেছে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের আনুষ্ঠানিক সনদ।
বরিশাল নগরীর কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা নিপা চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাগজ কেটে ও ভাঁজ করে স্নো-ফ্লেক তৈরির চ্যালেঞ্জে অংশ নেন। এই বিভাগে আগে ২৩ দশমিক ১৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে রেকর্ডটি ছিল চীনের এক প্রতিযোগীর দখলে। নিপা সেটি ভেঙে মাত্র ২১ দশমিক ৮৪ সেকেন্ডে কাজটি শেষ করেন।
নুসরাত জাহান নিপা বলেন, ‘কাগজের স্নো-ফ্লেক তৈরির রেকর্ড আগে ২৩ দশমিক ১৬ সেকেন্ডে স্নো-ফ্লেক তৈরির রেকর্ডটি চীনের দখলে ছিল। আমি তা ভেঙে রেকর্ডটি বাংলাদেশে এনেছি। কিছুদিন আগে সার্টিফিকেট পেয়েছি।’
নিপার বিশ্বরেকর্ডের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে, করোনা মহামারির সময়। এক হাতে এক মিনিটে ৭১টি কয়েন দিয়ে টাওয়ার তৈরি করে ইতালির সিলভিও সাব্বার গড়া রেকর্ড ভেঙে প্রথমবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান তিনি। এরপর ২০২৪ সালে চপস্টিক দিয়ে এক মিনিটে ২৭টি ভাতের দানা মুখে তুলে দ্বিতীয়বার বিশ্বরেকর্ড গড়েন।
তিনি বলেন, ‘এক মিনিটে ২৫টি ভাতের দানা খেয়ে ইতালির এক নাগরিক গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করেছিলেন। আমি এক মিনিটে ২৭টি ভাত খেয়ে তার সেই রেকর্ড ভেঙেছি। আমি ছাড়া আট বছরের মধ্যে আর কেউ ওই রেকর্ড ভাঙতে পারেনি। গত বছরের মার্চ মাসে রেকর্ডটি করি। পরে যাচাই-বাছাই শেষে তারা সম্প্রতি আমাকে সার্টিফিকেট দিয়েছে।’
দ্বিতীয় রেকর্ডটি অর্জনের পেছনের গল্পটাও কম কঠিন নয়। নিপা বলেন, ‘চপস্টিক দিয়ে এক মিনিটে ২৭টি ভাতের দানা খাওয়ার রেকর্ড করতে টানা দুই বছর অনুশীলন করতে হয়েছে। চেষ্টা আর ভালো কিছু করার ইচ্ছা ও অধ্যবসায় থাকলে অনেক কঠিন কাজও সম্ভব।’
বরিশাল নগরীর দক্ষিণ সাগরদী এলাকার আব্দুর রশিদ ও মোসাম্মৎ পারভীনের মেয়ে নুসরাত জাহান নিপা। এআরএস স্কুল থেকে মাধ্যমিক, সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করছেন। তার স্বামী কাজী শামসুজ্জামান মন্টি একজন ব্যাংক কর্মকর্তা।
নিপা জানান, খেলাধুলার প্রতি ছোটবেলা থেকেই ছিল আগ্রহ। কিন্তু বরিশালে মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়েন। তিনি বলেন, ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ভিডিও দেখে ঘরে বসেই অনুশীলন শুরু করি। এ কাজে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহস জুগিয়েছেন আমার স্বামী শামসুজ্জামান মন্টি। প্রতিটি চেষ্টায় তিনি সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। তার সহযোগিতা না থাকলে হয়তো তিনবার গিনেস রেকর্ড করা সম্ভব হতো না। এ জন্য আমি তার প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।’
তিনি বলেন, ‘সাফল্যের এই পথ অবশ্য একেবারেই বাধাহীন ছিল না। প্রথম রেকর্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের কটূক্তি ও বিদ্রূপের মুখোমুখি হয়েছি। কিন্তু সেসব উপেক্ষা করেই এগিয়ে চলেছি। অনেকেই আমাকে হেয় করে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আমি সেদিকে মনোযোগ দিইনি। নিজের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়েছি, নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছি। আজ তার ফল পেয়েছি। ভবিষ্যতেও নতুন কিছু করে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ ও আমার জন্মস্থান বরিশালকে প্রতিনিধিত্ব করতে চাই।’ পরবর্তী রেকর্ড কী নিয়ে এ প্রশ্নের জবাবে রহস্য রেখেই মুচকি হেসে বলেন,‘দেখা যাক!’
নিপার স্বামী কাজী শামসুজ্জামান মন্টি বলেন, ‘করোনার সময় নিপা কয়েন দিয়ে টাওয়ার তৈরি করে প্রথমবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান। এরপর চপস্টিক দিয়ে এক মিনিটে ২৭টি ভাতের দানা খেয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এবার দ্রুততম সময়ে কাগজের স্নো-ফ্লেক তৈরি করে তৃতীয়বারও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছেন। এতে আমরা খুব আনন্দিত। ভবিষ্যতেও তার প্রতিটি উদ্যোগে আগের মতোই পাশে থাকব।’
বরিশালের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জিহাদ রানা বলেন, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের প্রকাশিত তথ্য ও অন্যান্য উন্মুক্ত অনলাইন তথ্যভান্ডার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান গিনেস রেকর্ড অর্জন করলেও নুসরাত জাহান নিপা ছাড়া অন্য কোনো বাংলাদেশি নারী তিনবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখাননি।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একাধিকবার গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো বাংলাদেশিদের মধ্যে ফ্রিস্টাইল ফুটবলার কনক কর্মকার ১৫টি রেকর্ড নিয়ে শীর্ষে রয়েছেন। নুসরাত জাহান নিপার নামে রয়েছে তিনটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। কয়েন স্ট্যাকিংয়ের ব্যক্তিগত ও দলগত বিভাগে আবদুল্লাহ আল নোমান অন্তত তিনটি রেকর্ড অর্জন করেছেন। মাগুরার মাহমুদুল হাসান দুটি রেকর্ড গড়েছেন ফুটবল ও বাস্কেটবল আর্ম রোল বিভাগে। এ ছাড়া রাসেল ইসলাম, জোবেরা রহমান লিনু এবং আশিক চৌধুরী একটি করে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের অধিকারী।
তবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তালিকা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও হালনাগাদ হয়। তাই এখানে শুধু যাচাইযোগ্য ব্যক্তিগত রেকর্ডগুলোই উল্লেখ করা হয়েছে; দলগত বা প্রাতিষ্ঠানিক রেকর্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।