যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগের দিন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। গতকাল সোমবার ভোরে চালানো এ হামলায় কিয়েভে অন্তত ১২ জন এবং আশপাশের এলাকায় আরও ছয়জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। আজ মঙ্গলবার দুদিনব্যাপী ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে কিয়েভের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। হামলায় বহু আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহুতল ভবনের ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েন অনেক বাসিন্দা। এই হামলায় একটি পরিবারের সবাই নিহত হন এবং তাদের মরদেহ ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো বলেন, শহরের অন্তত চারটি এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে পোদিলস্কি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ওই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বহুতল ভবনের ওপরের তলা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেন। হামলার সময় রাজধানীর অনেক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করেন।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন, মস্কো ‘আরও একটি বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে’। গত বৃহস্পতিবারও কিয়েভে রাশিয়ার ভয়াবহ হামলায় ৩০ জন নিহত হন। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর রাজধানীতে এটি ছিল তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।
ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন গতকাল জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রবিবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ‘এটাই পুতিনের স্বভাব। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের পরপরই এবং ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগে এ হামলা চালানো হলো।’
গতকালের হামলায় কিয়েভের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দারনিতস্কি এলাকাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সপ্তাহেও এলাকাটি রুশ হামলার শিকার হয়েছিল। ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল রাশিয়ার ছোড়া কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।
ইউক্রেনের ৩৪টি স্থানে ২৯টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৮টি ড্রোন আঘাত হানে। রাশিয়া মোট ৩৫০টির বেশি ড্রোন এবং ৬৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল কিয়েভ। এ হামলার পর কিয়েভ, সুমি, খারকিভ ও দিনিপ্রোপেত্রোভস্কসহ কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কিয়েভে সামরিক শিল্প স্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ‘নিখুঁত দূরপাল্লার অস্ত্র’ ব্যবহার করেছে। তাদের দাবি–রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার জবাব হিসেবেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
ন্যাটো সম্মেলনের প্রধান ইস্যু ইউক্রেন যুদ্ধ
তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইউক্রেন যুদ্ধই হবে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। সেখানে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করবেন জেলেনস্কি। এর আগে দুই নেতা গত শনিবার ফোনে কথা বলেন।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার প্রায় ৯০ মিনিটের ফোনালাপে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আবারও যুদ্ধ বন্ধে সহযোগিতার প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমান মেয়াদের ৫০০ দিনের বেশি সময় পার হয়েছে এবং একাধিক কূটনৈতিক উদ্যোগ সত্ত্বেও শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো পথ খুঁজে পায়নি তার প্রশাসন।
ন্যাটো সম্মেলনের আগে জেলেনস্কি আবারও মিত্র দেশগুলোর কাছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য আরও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কারণেই গতকালের হামলায় কোনো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববাসী বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অংশীদারদের ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।’
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লিয়েনও বলেছেন, ‘ইউক্রেনের জরুরি ভিত্তিতে আরও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ বিষয়টি আমরা আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে আলোচনা করব।’
সূত্র: সিএনএন