সিরিয়ার সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের পতনের দুই বছর পরও স্থিতিশীলতা ফেরেনি দেশটিতে। নতুন ও পুরোনো হুমকির মুখে দেশটির বর্তমান আহমেদ আল-শারা সরকার যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই নতুন করে কেঁপে উঠল রাজধানী দামেস্ক।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর দামেস্ক সফরের সময় এসব বিস্ফোরণ ঘটে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর ম্যাক্রোঁই প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোনো নেতা, যিনি সিরিয়া সফর করছেন।
হোটেলের কাছেই বিস্ফোরণ
দামেস্কের উমাইয়া মসজিদে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে ম্যাক্রোঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সময় এ হামলা চালানো হয়।
জানা গেছে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের হোটেলের কাছে নিরাপত্তাবাহিনী একটি দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় সেটি বিস্ফোরিত হয়। এর কয়েক মিনিট পরেই ঘটে দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি।
সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে, মঙ্গলবারের এ হামলায় অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন। গত সপ্তাহেও দামেস্কের একটি ক্যাফেতে বোমা বিস্ফোরণে ৯ জন নিহত হন।
হামলার নেপথ্যে কারা?
এখনও কোনো গোষ্ঠী এ হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে বিশ্লেষকদের সন্দেহ আইএসআইএল (আইএসআইএস) এর দিকে। সিরিয়া ও ইরাকে এই গোষ্ঠীর অন্তত তিন হাজার সক্রিয় জঙ্গী রয়েছে।
থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল’ এর ফেলো অ্যারন লুন্ড বলেন, ‘সরকার যখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে এনে বিদেশি বিনিয়োগ ও পর্যটন আকর্ষণের চেষ্টা করছে, তখন রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই হামলাগুলো চরম বিপর্যয় নিয়ে আসছে।’
ত্রিভুজ চ্যালেঞ্জের মুখে আল-শারা সরকার
ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র বিশ্লেষক নানার হাওয়াচের জানান, বর্তমান সরকারের সামনে প্রধানত তিনটি রয়েছে। প্রথমত; দেশের অভ্যন্তর থেকে অতর্কিত হামলা চালিয়ে নতুন শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে আইএসআইএল সেল।
দ্বিতীয়ত; সাবেক শাসক বাশার আল-আসাদের অনুগত বাহিনী এবং ইরানের মদদপুষ্ট শিয়া মিলিশিয়ারা অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সম্প্রতি আসাদের ধনকুবের চাচাতো ভাই রামি মাখলুফ মস্কো থেকে আলাওয়াইট বন্দীদের মুক্তির দাবি জানিয়ে দামেস্ক সরকারকে হুমকি দিয়েছেন।
তৃতীয়ত, দক্ষিণ সীমান্ত ও ড্রুজ-সংখ্যাগরিষ্ঠ সুওয়াইদা অঞ্চলে সরকারি নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে দুর্বল। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সেখানে ড্রুজ ও বেদুইনদের লড়াইয়ে ইসরায়েল ড্রুজদের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় হুমকি ‘ভেতর’ থেকেই
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, আল-শারার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসতে পারে তার সাবেক সহযোগী ও রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে। আসাদকে হঠাতে আল-শারা কট্টরপন্থি 'হায়াত তাহরির আল-শাম'সহ (এইচটিএস) বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করেছিলেন।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম হলেও, তা আল-শারার কট্টরপন্থি সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছে।
নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের ক্যারোলিন রোজ জানান, আল-শারা যদি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং মধ্যপন্থি নীতি অবলম্বন করেন, তবে তার মূল সমর্থক গোষ্ঠী এবং সাবেক এইচটিএস চক্রের ভেতরে থাকা অংশটিই বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিদ্রোহ গড়ে তুলতে পারে।
এ ছাড়াও ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি ও উচ্চ বেকারত্বের বাজারে এই অভ্যন্তরীণ ফাটল সিরিয়াকে নতুন কোনো গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
থিওটোনিয়াস/