বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি হৃদয়ভাঙা বিদায়। নরওয়ের কাছে হেরে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে রেকর্ড সর্বোচ্চ পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। গ্যালারিজুড়ে হতাশা, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার ঝড়, আর ফুটবলবিশ্বে প্রশ্ন; এবার কি তবে কার্লো আনচেলত্তির অধ্যায়েরও ইতি?
কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) অন্য গল্প লিখতে চাইছে। তাদের বিশ্বাস, একটি পরাজয় কোনো মহান যাত্রার শেষ হতে পারে না। বরং ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে নতুন সাম্রাজ্য। এ কারণেই ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিলের পুনর্গঠনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকছে ইতালিয়ান মহাগুরু আনচেলত্তির কাঁধেই।
শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ স্বপ্ন আবারও অধরা রয়ে গেছে। ২০০২ সালে পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর কেটে গেছে দুই যুগ। কিন্তু ষষ্ঠ শিরোপার অপেক্ষা যেন আরও দীর্ঘই হচ্ছে। নিউইয়র্কের সেই রাতে আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে কেঁপে ওঠে ব্রাজিলের রক্ষণ। শেষ দিকে নেইমার পেনাল্টি থেকে ব্যবধান কমালেও ভাগ্যের চাকা আর ঘোরানো যায়নি। এই ব্যর্থতার পর স্বাভাবিকভাবেই সমালোচনার তীর ছুটে আসে আনচেলত্তির দিকে। অথচ এই মানুষটির জন্যই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছিল ব্রাজিল। একের পর এক অন্তর্বর্তী কোচের অধ্যায় শেষে ২০২৫ সালের মে মাসে স্প্যানিশ পরাশক্তি রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে সেলেসাওদের দায়িত্ব নেন ইউরোপের অন্যতম সফল এই কোচ। তার হাত ধরেই নতুন যুগের স্বপ্ন দেখেছিল ব্রাজিল।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পরও সেই স্বপ্ন থেকে সরে আসছে না সিবিএফ। ফুটবল ডিরেক্টর রদ্রিগো কায়েতানো স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, আনচেলত্তিই থাকবেন ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রধান কোচ। কায়েতানোর ভাষায়, ‘তিনি আমাদের ম্যানেজার এবং এই পুরো চক্রজুড়েই দায়িত্বে থাকবেন। এই বিশ্বকাপে আমাদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্থিতিশীলতার অভাব। আমরা আর সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।’ এ যেন কেবল একজন কোচকে সমর্থন নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল দর্শনের প্রতি অঙ্গীকার। কারণ ব্রাজিল বুঝেছে, বিশ্বকাপ জেতার দল রাতারাতি তৈরি হয় না। প্রয়োজন সময়, ধৈর্য এবং একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।
পরাজয়ের বেদনার মধ্যেও আনচেলত্তি দেখছেন আগামী দিনের সম্ভাবনা, ‘একটি পরাজয় কেবলই নতুন এক রোমাঞ্চকর যাত্রার শুরু। আমাদের উন্নতির ধারা বজায় রাখতে হবে, নতুন পরিকল্পনা করতে হবে। এটাই শেষ নয় বরং নতুন এক চক্রের সূচনা।’ আনচলত্তি বলেন, ‘আজ কষ্টটা অনেক গভীর। কিন্তু আমরা যা গড়ে তুলছি, তার প্রতি আমাদের বিশ্বাস একটুও বদলায়নি। আমরা আমাদের জাতীয় দলের জন্য কাজ করে যাব। সবসময় একসঙ্গে; সবসময় ব্রাজিল।’
ফুটবলের ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, বড় দলগুলোকে সংজ্ঞায়িত করে তাদের পতন নয় বরং পতনের পর ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। ব্রাজিল এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। হেক্সার স্বপ্ন আপাতত ভেঙেছে, কিন্তু বিশ্বাস ভাঙেনি। আর সেই বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্লো আনচেলত্তি। যার হাতে সেলেসাওরা খুঁজছে আগামী দিনের পুনর্জন্মের নকশা। তবে ব্রাজিলের বিদায়ে আনচেলত্তির কিছু সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে দেখছে সিবিএফ। বিশেষ করে ম্যাচের বদলিগুলো নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে। তবে আনচেলত্তির ব্যাখ্যা, দলকে আরও সতেজতা ও আক্রমণে গভীরতা দিতেই তিনি নেইমার ও এন্দ্রিককে মাঠে নামিয়েছিলেন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েও আনচেলত্তির ওপর আস্থা রাখছে সিবিএফ। ২০৩০ সালের শতবর্ষী বিশ্বকাপ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে। আর তার চুক্তিও ইতোমধ্যেই ২০৩০ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা হয়েছে।
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর ব্রাজিলের অনেক সমর্থকই এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। তাদের মতে নেইমার, কাসেমিরোদের প্রজন্মের বিদায়ের সময় এসে গেছে। নতুন করে এমন একটি দল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আবারও বিশ্বমানের মিডফিল্ডার ও ফুলব্যাক উঠে আসবে। যেমনটা একসময় ব্রাজিল নিয়মিত তৈরি করত। এখন ব্রাজিলের সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া কোপা আমেরিকা। তবে সেই আসরেও যদি আনচেলত্তির অধীনে একই ধরনের ব্যর্থতা আসে, তাহলে বছরে প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন পাউন্ড বেতনের চার বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই তার বিদায় ঘটতে পারে বলে মনে করছেন দেশটির ফুটবল বিশ্লেষকরা।