নরওয়ের বিপক্ষে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিল পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। যে দলকে ঘিরে প্রতি বিশ্বকাপে আলাদা উন্মাদনা তৈরি হয়, সেই ব্রাজিল এবারও প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ। সাম্বা ফুটবলের সেই ঝলক আর তারকাখচিত আধিপত্য–সবকিছুরই যেন আরেকবার করুণ সমাপ্তি ঘটল এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে।
ব্রাজিল সব সময়ই হট ফেবারিট দল। বাংলাদেশের ফুটবল অনুরাগীদের একটি বড় অংশও যুগ যুগ ধরে ব্রাজিলকে সমর্থন করে আসছে। এর মূল কারণ তাদের সাম্বা ফুটবল। কিন্তু বর্তমান ব্রাজিল আর সেই পুরোনো ‘সাম্বা ব্রাজিল’ নয়। ২০০২ সালে তারা সর্বশেষ বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে। সেই দলে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, রবার্তো কার্লোসের মতো একঝাঁক বিশ্বমানের সুপারস্টার ছিলেন। যারা ফুটবলকে শুধু জয়-পরাজয়ের খেলা নয়, বরং শিল্পে রূপান্তর করেছিলেন। এরপর সময় যত এগিয়েছে, পরবর্তী বিশ্বকাপগুলোতে সেই তারকাখ্যাতি ও ধারাবাহিকতা ধীরে ধীরে কমতে দেখা গেছে।
বর্তমান ব্রাজিল দলে কাসেমিরো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো প্রতিভা থাকলেও আগের মতো একঝাঁক সুপারস্টারের উপস্থিতি এখন আর চোখে পড়ে না। সত্যি বলতে, আমাদের দেশে অনেকেই এখন ব্রাজিলকে সমর্থন করে শুধু আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি দল বেছে নেওয়ার মানসিকতা থেকে। একসময়ে যে নান্দনিক ফুটবলের জন্য ব্রাজিল বিশ্বজুড়ে মানুষের হৃদয় জয় করেছিল, সেই ব্রাজিলকে এখন অনেকেরই খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে।
২০১৪ বিশ্বকাপ ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে এক ভয়াবহ মোড়। ঘরের মাঠে সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে সাত গোল হজম করা ম্যাচটি ছিল তাদের জন্য এক অবিশ্বাস্য ধাক্কা। সেই ম্যাচে মাঠে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা। সেই সময় থেকেই ব্রাজিলের পতনের শুরু বলে অনেকে মনে করেন। ওই আসরে জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হলেও পরবর্তী সময়ে তারাও আগের মতো ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। আধুনিক ফুটবলে সুপারস্টার-নির্ভরতার পাশাপাশি দলীয় ভারসাম্যের ঘাটতিই এসব পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়।
নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের ২-১ গোলের এই হারকে শুধু দুর্ভাগ্য বলা যায় না। ফুটবল মূলত গোলের খেলা। যে দল সুযোগ কাজে লাগায়, তারাই জয়ী হয়। ম্যাচে ব্রাজিল তুলনামূলক বেশি সুযোগ তৈরি করলেও নরওয়ে ছিল অনেক বেশি কার্যকর। ফলে ম্যাচ শেষে জয় তুলে নেয় নরওয়ে।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ব্রাজিল শুরুতে পেনাল্টি পায়। ব্রুনো গিমারাইস সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচের গতিপথ ভিন্ন হতে পারত। আবার বদলি হিসেবে নেমে এনদ্রিকও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিলেন, যা থেকে গোল আসেনি। অন্যদিকে নরওয়ে শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছে। ম্যাচের শুরুতেই তাদের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও সেই মুহূর্তটি দলকে আরও উদ্দীপ্ত করে তোলে।
নরওয়ের গোলরক্ষক আরিয়ান হশল নিলাদ শুধু পেনাল্টি রক্ষা করেই থেমে থাকেননি, পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ম্যাচে ধরে রাখেন। অনেকের মতে, তিনিই ছিলেন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। তবে নরওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে আর্লিং হালান্ড। তার শারীরিক শক্তি, গতি এবং দুই পায়ের অসাধারণ শুটিং ক্ষমতা যেকোনো রক্ষণভাগকে ভেঙে দিতে সক্ষম। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে তিনি নিয়মিতই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন। ব্রাজিলের ডিফেন্ডারদের তুলনামূলক উচ্চতার সীমাবদ্ধতা এই ম্যাচে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যার সুযোগ নিয়ে হালান্ড দ্বিতীয় গোলটি করেন।
টুর্নামেন্টজুড়েই ব্রাজিলের পারফরম্যান্স প্রত্যাশা অনুযায়ী ছিল না। নেইমার পুরো ম্যাচ খেলার মতো ফিট ছিলেন না। অনেকের মতে, তার উপস্থিতি মূলত ব্র্যান্ড ভ্যালুর কারণেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ নেইমার না থাকলে ব্রাজিলের আকর্ষণও কিছুটা কমে যায়। মিডফিল্ডে কাসেমিরোও তার সেরা ছন্দে ছিলেন না। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র একমাত্র ব্যতিক্রম হলেও তাকে যথাযথ সাপোর্ট দিতে পারেননি সতীর্থরা। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচেই গোল করার পর প্রতিপক্ষরা তাকে কঠোরভাবে মার্ক করায় তিনি নিজের স্বাভাবিক খেলাও খেলতে ব্যর্থ হন।
ব্রাজিল যদি অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল বা সেমিফাইনাল পর্যন্ত যেতে পারত, তাহলে বিশ্বকাপের উত্তেজনা আরও বাড়ত। তাদের বিদায়ে অনেক দর্শকের কাছেই টুর্নামেন্টের উন্মাদনা কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে।
লেখক: জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার