বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে খানিকটা বেকায়দায় পড়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। আর্থিক সংকটে থাকলেও ঘোষণা অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করতে হচ্ছে। তবে ঠিক কোন মাস থেকে সরকারি কর্মচারীদের হাতে নতুন কাঠামোর বেতন তুলে দিতে পারবে, তা নিয়ে সরকারি নীতিনির্ধারকরা গত কয়েক দিন দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
সূত্র জানায়, গতকালও (৬ জুলাই) সচিব কমিটির বৈঠকে পে-স্কেল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আরও কয়েক ধাপ পার করে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন সরকারি কর্মচারীদের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। সচিব কমিটির সুপারিশে কিছু কাটছাঁটের কথা বলা হয়েছে। সুপারিশে গ্রেডগুলোতে মূল বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এবং ভাতাদিতে পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
গতকালের সচিব কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হলে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা হতে পারে। সেসব অসুবিধা মিনিমাইজ করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে আজ (গতকাল) সচিব কমিটি। প্রথম ধাপে মূল বেতন বৃদ্ধি করা হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করা হবে। তবে ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন দেখিয়ে সে হিসেবে বেতন-ভাতাদিসহ সময়মতো পাওনা পরিশোধ করা হবে।
অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সচিব কমিটি আমাদের এখনো সুপারিশমালা জমা দেয়নি। তাদের হয়তো আরও কিছু সময়ের প্রয়োজন। তাই নতুন এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য আরও হয়তো কিছু সময় লাগবে। তবে দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে এক বা দুই ধাপে হয়তো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সচিব কমিটি সে বিষয়টিও দেখছে। এখানে তিন ধাপ পর্যন্তও প্রয়োজন হতে পারে। তবে আমরা চাই বেতন বাড়ানোর সুবিধা দ্রুত একসঙ্গে সবার কাছে পৌঁছে দিতে। আর এ জন্য কাজ চলছে।’
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, দেশের অর্থনীতির এখন ভঙ্গুর দশা। রপ্তানি আয়ের ধারা নিম্নমুখী। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তলানিতে। বিনিয়োগ বাড়ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা কমছে না। রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে রেকর্ড করেছে। ব্যাংকের ঋণে নির্ভরতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে একবারে সব সুবিধা দিয়ে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য অনেক বড় চাপ হয়ে যাবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে সরকারকে বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বেশ চাপে পড়তে হবে। বিশেষ করে যখন রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান অর্থনীতির বিশ্লেষক ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি আছে। পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন সরকারের জন্য সহনীয় হবে। তবে ধাপে ধাপে এ কাজ বাস্তবায়ন করতে গেলে টাকা খরচ হবে বেশি। চাকরিজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে।
এর আগে এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অনেক দিন ধরে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয় না। এদিকে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো কার্যকর করতে সরকার কাজ করছে। ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাসিক বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্র্যাচুইটি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পরিচালিত হয়। ফলে বেসিক বেতনকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে কার্যকর করতে গেলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেটাও বেশ জটিল কাজ। গতকালের সভায় এসব বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বাড়তে পারে ৬০-৭০ শতাংশ আর দশম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৯০-১০০ শতাংশ।
গতকালের বৈঠকে পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া বাস্তবায়নের সময়সূচি, পর্যায়ক্রমিক বেতন সমন্বয় এবং বিভিন্ন ক্যাডার ও শ্রেণির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়গুলো নিয়েও কথা হয়। ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর মূল বেতন কার্যকর এবং ভাতা ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল মালেক খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০১৫ সালের পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় অধিকাংশ কাজ ম্যানুয়ালি করা হতো। বর্তমানে পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারনির্ভর। যদি ধাপে ধাপে দেওয়া হয় অর্থাৎ ৫০ বা ৬০ শতাংশ বেসিক দেওয়া হয় এবং পরে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর করা হয়, তাহলে দুই দফায় পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। একযোগে এ পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল। তাই সম্পূর্ণ বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়নের দাবি ও পরামর্শ দিয়েছি।’
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাই কমিশনের সুপারিশ করা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাকি ৫০ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে নতুন ভাতা কার্যকর করার পরিকল্পনা ছিল।
তবে বাস্তবায়নের হিসাব করতে গিয়ে দেখা যায়, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বর্তমান মূল বেতন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কমিশনের সুপারিশের মাত্র অর্ধেক কার্যকর করলে প্রকৃত বেতন বৃদ্ধি খুবই সামান্য হবে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মোট বেতন কমে যাওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিন ধাপের পরিবর্তে এবার দুই ধাপে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন মূল বেতন এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শুরু থেকে নতুন ভাতা কার্যকর করা হবে।
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়।
কমিশন ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে প্রতিটি গ্রেডেই উল্লেখযোগ্য হারে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
এ ছাড়া বৈশাখী ভাতা বর্তমান ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতা চালু এবং নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ি ভাড়া ভাতা দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল কমিশনের প্রতিবেদনে।
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, দ্বিতীয় গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা এবং চতুর্থ গ্রেডে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত করার সুপারিশ ছিল।
তবে বর্তমান সচিব কমিটি কমিশনের বেশ কয়েকটি সুপারিশে পরিবর্তনের পক্ষে মত দেয়। বিশেষ করে বিভিন্ন ভাতা ও অতিরিক্ত সুবিধার ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। কুক, মালী ও গাড়িসংক্রান্ত ভাতাসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কিছু সুবিধা আগের মতো রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।