বরিশালের বানারীপাড়া ও মহানগরে দায়ের হওয়া দুটি পৃথক মামলা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বানারীপাড়ায় একটি মামলায় দীর্ঘদিন এলাকায় না থাকা ও আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গভীর রাতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
অন্যদিকে বরিশাল মহানগরের একটি নালিশি মামলায় চারজন মৃত ব্যক্তি, কারাগারে থাকা সাবেক এক সংসদ সদস্য, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং বিএনপির ছয় নেতা ও জামায়াতপন্থি এক পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধেও মিছিল, বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে এ ধরনের মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বানারীপাড়া থানায় গত ১৯ জুন রাত ৪টা ৩৫ মিনিটে ইউনিয়ন শ্রমিক দলের নেতা মো. রাসেল বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এতে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের ৪৪০ নেতা-কর্মীর পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সালেক মল্লিক শিমুলকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে গরদ্বার গ্রামে বাদীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো এবং বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের দাবি, মামলায় নামধারী ৪০ আসামির অধিকাংশই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে দীর্ঘদিন এলাকায় নেই। তাদের ও আসামিদের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বানারীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মওলাদ হোসেন সানা ২০২৪ সালের জুনের পর থেকে এলাকায় যাননি। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে এবং তিনি আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনিকেও কয়েক বছর ধরে এলাকায় দেখা যায়নি। একইভাবে পৌর যুবলীগের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, আওয়ামী লীগ কর্মী জসিম মীর, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল হুদা ও ছাত্রলীগের সভাপতি ফোরকান আলী হাওলাদার, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন রায়ও দীর্ঘদিন আত্মগোপনে রয়েছেন। এসব ব্যক্তি কীভাবে ওই রাতের ঘটনায় অংশ নিলেন?
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. একরামুল হক বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি বিস্ফোরণের আলামত পেয়েছেন। মামলার তদন্তের স্বার্থে এর বেশি মন্তব্য করা যাবে না বলে তিনি জানান।
বানারীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজিবর রহমান বলেন, মামলায় আবদুল্লাহ ফকির নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
মামলার অন্যতম আসামি ও সাবেক সংসদ সদস্য মনিরুল ইসলাম মনি বলেন, পুরো ঘটনাটি সাজানো। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানির উদ্দেশ্যেই এ মামলা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার ঘটনার সময় এবং মামলার দায়েরের সময়ের পার্থক্য তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা। আর গভীর রাতে মামলাটি করা হয়েছে, এটিও কি সম্ভব?
একই মামলার আসামি উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সালেক মল্লিক শিমুল বলেন, তিনি মামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না। বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছেন, তাকে আসামি করা হয়েছে। বাদী রাসেলকেও তিনি চেনেন না।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহ আলম মিঞা বলেন, ‘বিষয়টি পরে জেনেছি। তদন্তাধীন মামলা নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে চাই না। তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাই।’
বাদী মো. রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
নালিশি মামলায় মৃত চারজনও আসামি
গত ৫ জুলাই বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল জেলার সাবেক সমন্বয়ক মারজুক আবদুল্লাহ একটি নালিশি মামলা করেন। আদালত অভিযোগটি সরাসরি আমলে না নিয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন।
মামলায় নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের ২৪৮ জন নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১০, ১৬ ও ২২ জুন তারা বরিশাল নগরে মিছিল, সড়ক অবরোধ, বোমা বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নাশকতা চালান। তবে মামলার আসামির তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২১২ নম্বর আসামি খন্দকার রেজাউর রহমান ২০২২ সালের ২২ জানুয়ারি, ১৯৮ নম্বর আসামি আবুল ফারুক হুমায়ুন ২০২৩ সালের ২৫ মার্চ, ২২৫ নম্বর আসামি এইচ এম হাফিজুর রশিদ ২০২১ সালের ১৯ অক্টোবর এবং ১৯৫ নম্বর আসামি মোহাম্মদ আলী হাওলাদার একই বছরের ২৬ জুলাই মারা যান। অথচ তাদের বিরুদ্ধে মিছিলে অংশ নেওয়া ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
১৯৮ নম্বর আসামি মৃত আবুল ফারুক হুমায়ুনের ছেলে শহরিয়ার রিজন আত্মগোপনে থেকে খবরের কাগজকে বলেন, ‘তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আমি গোপনে এসে ককটেল মেরে আবার চলে গেলাম। কিন্তু বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। তিনি কি কবর থেকে উঠে এসে বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন?
এ ছাড়া মামলার ২ নম্বর আসামি সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ এবং ১৫১ নম্বর আসামি অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম খোকন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া ১ নম্বর আসামি সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ১২ নম্বর আসামি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম জাহাঙ্গীর হোসেন আত্মগোপনে রয়েছেন। ৩ নম্বর আসামি সজ্জাত সেরনিয়াবাত ভারতে অবস্থান করছেন। এ ছাড়া মামলার এজাহারভুক্ত অধিকাংশ আসামিই দীর্ঘ দুই বছর ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। দুই বছর তাদের এলাকায় দেখা যায়নি।
একই মামলায় ১৭১ নম্বর আসামি করা হয়েছে বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্য ও সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর মজিদা বোরহানকে। ১৪৯ নম্বরে রয়েছেন নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. ইউনুস। ১৫৮ নম্বরে রয়েছেন ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও ওই ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হক মাসুম। ১৬৩ নম্বরে রয়েছেন ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর হুমায়ন কবির, ১৬৫ নম্বরে সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর রাশিদা পারভীন এবং ১৭৪ নম্বরে সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর সেলিনা আক্তার।
এ ছাড়া ৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) নেতা এইচ এম রফিকুল বাড়ির স্ত্রী কাজী আফরোজাকে।
বরিশাল জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে আমার মা, ১৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির বর্তমান উপদেষ্টা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক নারী কাউন্সিলর মজিদা বোরহানকে। তাকে কী হিসেবে আসামি করা হয়েছে, সেটি জানার জন্য বাদীর সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি।’
কাজী আফরোজা বলেন, ‘মামলার কাগজ সাজিয়ে আমার কাছে লোক পাঠানো হয়েছিল। মোটা অঙ্কের টাকা দিলে মামলায় নাম থাকবে না, এমন প্রস্তাব দেওয়া হয়। যেহেতু আমি আওয়ামী লীগ করি না এবং আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ডেও ছিলাম না, তাই টাকা দিইনি। এখন দেখি, আমার নামও আসামির তালিকায় দেওয়া হয়েছে।’
বরিশাল মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব মীর জাহিদুল কবির বলেন, ‘শুনেছি, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইউনুস মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর জিয়াউল হক মাসুমসহ আরও কয়েকজন বিএনপি নেতাকেও এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছে।’
বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার আশিক সাঈদ বলেন, ‘বোমা-ককটেল ফাটিয়ে মিছিল হলে আমরা অবশ্যই জানতাম। অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেনি। আদালত যেহেতু তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করব।’
অভিযোগের বিষয়ে মারজুক আবদুল্লাহ বলেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নগরে মিছিল করেছেন এবং বোমা ও ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। এসব ঘটনার ভিত্তিতেই তিনি মামলা করেছেন। আসামির তালিকায় মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, সাক্ষীদের তথ্য অনুযায়ী তালিকা করা হয়েছে। কোনো ভুল থাকলে পরে সংশোধন করা হবে।
এদিকে দুটি মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক দাবি করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এর নিন্দা জানিয়েছেন এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ফৌজদারি মামলায় এজাহার বা অভিযোগপত্রে মৃত ব্যক্তি, ঘটনার সময় কারাগারে থাকা ব্যক্তি কিংবা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার বাস্তবসম্মত সুযোগ ছিল না–এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হলে তা তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ও মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাজু হাওলাদার পলাশ বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী আদালত কোনো নালিশি মামলা সরাসরি গ্রহণ না করে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা, আসামিদের অবস্থান, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি, আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সঙ্গে বাস্তবতার অমিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, কোনো মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে নিরপরাধ ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে—এমনটি প্রমাণিত হলে তা আদালতের দৃষ্টিতে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একইভাবে তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব হলো কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে সব তথ্যপ্রমাণ যাচাই করে আদালতে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন দাখিল করা।