বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে দুই দলের নামের চেয়েও বড় হয়ে ওঠেন দুই ফুটবলার। আজ (৭ জুলাই) আটলান্টায় আর্জেন্টিনা ও মিসরের শেষ ষোলোর লড়াইটিও ঠিক তেমনই। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক লিওনেল মেসি, অন্যদিকে আফ্রিকার ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা মোহাম্মদ সালাহ। একজন শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে, অন্যজন ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে। ৯০ মিনিটের এই লড়াই তাই হয়ে উঠছে দুই কিংবদন্তির আরেকটি বিরল অধ্যায়।
মজার ব্যাপার হলো, আজকের ম্যাচের কয়েক দিন আগেই সালাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিল; লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার ও হ্যারি কেইনের মধ্যে কাকে তিনি নিজের ‘লাস্ট ড্যান্স’-এর সঙ্গী হিসেবে বেছে নেবেন? মিসরের অধিনায়ক এক মুহূর্তও সময় নেননি। হাসিমুখে বলেছিলেন, ‘মেসি।’ কাকতালীয়ভাবে সেই ইচ্ছাই তার পূরণ হয়েছে। তবে একই দলে নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে। দুজনের একজনের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হবে এই ম্যাচেই।
চলতি বিশ্বকাপকে আধুনিক ফুটবলের সোনালি প্রজন্মদের শেষ বিশ্বকাপ বলেই মনে করা হচ্ছে। ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মেসি। অন্যদিকে ৩৪ বছর বয়সী সালাহর ক্ষেত্রেও এটিই শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। ফলে এই ম্যাচ শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের নয়, দুই কিংবদন্তির বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারেরও গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
অবাক করার মতো হলেও সত্যি, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় দুই তারকা হয়েও মেসি ও সালাহ এর আগে মাত্র দুবার মুখোমুখি হয়েছেন। দুটিই ছিল উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ২০১৫ সালে। তখন রোমার হয়ে ধারে খেলছিলেন সালাহ, মেসি বার্সায়। ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল। এরপর ২০১৯ সালের সেমিফাইনালের প্রথম লেগে ক্যাম্প ন্যুতে সালাহর লিভারপুলকে ৩-০ গোলে হারায় বার্সেলোনা। সেদিন জোড়া গোল করেছিলেন মেসি। জাতীয় দলের জার্সিতে এবারই প্রথম দেখা হচ্ছে দুই মহাতারকার।
ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও দুজনই আছেন আলোচনায়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করে এবারের বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা সাতে তুলেছেন মেসি। বিশ্বকাপে তার মোট গোল এখন ২০। ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে দুটি আলাদা বিশ্বকাপে অন্তত সাতটি গোল করার কীর্তিও গড়েছেন তিনি। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও সবার ওপরে রয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
অন্যদিকে গোলের সংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও মিসরের পুরো আক্রমণভাগ ঘুরছে সালাহকে কেন্দ্র করে। এবারের বিশ্বকাপে এক গোল করে তিনি ইতোমধ্যে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা (৩টি)। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে গোল করে দলকে শেষ ষোলোয় তুলেছেন। শুধু গোলই নয়, সৃষ্টিশীল ফুটবলও খেলছেন তিনি। এখন পর্যন্ত ১৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, যা এবারের আসরের সেরাদের মধ্যে অন্যতম।
দলগত বাস্তবতাও দুই তারকার কাঁধে বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই করে ৩-২ গোলের কষ্টার্জিত জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে মেসিও স্বীকার করেছেন, দলের বেশ কিছু ভুল দ্রুত শুধরে নিতে হবে। অন্যদিকে আত্মবিশ্বাসে উজ্জ্বল মিসর বিশ্বাস করে, শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলতে পারলে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষেও অঘটন ঘটানো সম্ভব।
এই ম্যাচে জয়ী দল খেলবে কোয়ার্টার ফাইনালে। তাই শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই একজন এগিয়ে যাবেন শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে, অন্যজন হয়তো বিশ্বকাপকে শেষবারের মতো বিদায় জানাবেন। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তাই আজকের লড়াই শুধু আর্জেন্টিনা বনাম মিসর নয়, এটি মেসি বনাম সালাহরও লড়াই।