মৌমাছি মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি
দাঁড়াও না একবার ভাই
ঐ ফুল ফোটে বনে
যাই মধু আহরণে
দাঁড়াবার সময় তো নাই।
নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ‘কাজের আনন্দ’ কবিতার মৌমাছিটির যেন নতুন ঠিকানা হয়েছে বিশ্বকাপের সবুজ মাঠ। চার বছর পরপর ফুটে ওঠা ফুটবলের এই ফুলবাগানে তার ছুটে চলা থামেই না। কারণ সে জানে, সময় কম। যতক্ষণ ফুল আছে, ততক্ষণ মধু সংগ্রহ করতেই হবে। এই বিশ্বকাপে সেই মৌমাছির নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে। আর মধু? সেটি যেন লিওনেল মেসির কাছে সযত্নে জমা থাকা বিশ্বকাপের গোলের ভাণ্ডার।
মেসির ঝুলিতে ২০ গোল। এমবাপ্পের ১৯। মাত্র এক ফোঁটা মধুর দূরত্ব। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে পেনাল্টি থেকে করা একমাত্র গোলটি শুধু ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলেনি। এমবাপ্পেকে আরও কাছে নিয়ে গেছে সেই মধুচাকের, যেখানে এখনো এককভাবে বসে আছেন মেসি। তবে এমবাপ্পে কম যান না। অদম্য এই মৌমাছির চোখে কেবল সামনে ফুটে থাকা ফুল। আজ প্যারাগুয়ে, কাল হয়তো মরক্কো, তার পর হয়তো আরও বড় কিছু। প্রতিটি ম্যাচই তার কাছে নতুন ফুল। প্রতিটি গোল এক ফোঁটা মধু।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে এমবাপ্পের গোলটি ছিল বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ১৫০তম গোল। একই সঙ্গে নকআউট পর্বে তার গোলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১। এই তালিকায় তিনি অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছেন সাবেক ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে। আরও একটি রেকর্ড এখন কেবলই ফরাসি স্ট্রাইকারের। তার মতো তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অন্তত তিনটি করে গোল করার কীর্তি আর কারও নেই।
মৌমাছি মতোই এমবাপ্পে কখনো একটি ফুলে বসে সন্তুষ্ট থাকে না। তিনি জানেন, সামনে আরও ফুল আছে। তাই একটি রেকর্ড ভাঙার পরই ছুটছেন আরেকটির দিকে। একটি গোলের পরই খুঁজছেন পরের গোল। আর মেসি? বহু বছরের শ্রমে গড়ে ওঠা এক বিশাল মধুচাক যেন তার ক্যারিয়ার। অসংখ্য ম্যাচ, অসংখ্য গোল, অসংখ্য স্মৃতি মিলিয়ে তিনি জমিয়েছেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান মধু। সেই ভাণ্ডারে হাত বাড়িয়েছেন অনেকেই। কিন্তু এত দ্রুত এত কাছে পৌঁছাতে পারেননি কেউ। এমবাপ্পে পেরেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই বিশ্বকাপে ১৯ গোল।
দুই জীবন্ত কিংবদন্তির দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই থাকুক, এর সৌন্দর্য অন্য জায়গায়। একজন কিংবদন্তি নিজের সৃষ্টি করা উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আছেন। আরেকজন সেই উচ্চতায় ওঠার সিঁড়ি গুনছেন। একজনের হাতে মধুভরা চাক। আরেকজনের ডানায় অদম্য গতি। এখন এমবাপ্পের সামনে মরক্কো। আর সামনে হয়তো আরও দুটি ম্যাচ। অর্থাৎ সামনে আরও কয়েকটি ফুল। সেই ফুল থেকে আর কতটা মধু সংগ্রহ করবেন ফরাসি তারকা? মেসির মধুচাক কি অক্ষত থাকবে? নাকি বিশ্বকাপের আকাশে সবচেয়ে ব্যস্ত এই মৌমাছিই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মধুর মালিক হয়ে উঠবেন? উত্তরটা সময়ই দেবে।
উনিশ-বিশ
ছয় বিশ্বকাপে মেসির গোল ২০। তিন বিশ্বকাপে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা ১৯।
সমান-সমান
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে সমানে সমান দুই তারকা। দুজনেই ৭টি করে গোল করে গড়ে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।