একজন দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যে ফুটবলভক্তদের মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন। অন্যজন একইভাবে আগামীতে বিশ্ব ফুটবল শাসনের বার্তা দিচ্ছেন। পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও স্প্যানিশ সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় মুখোমুখি হবে ইউরোপের দুই জায়ান্ট পর্তুগাল ও স্পেন। যেখানে রোনালদো ও ইয়ামালের মধ্যকার দুই প্রজন্মের দ্বৈরথ দেখতে উন্মুখ ফুটবলপ্রেমীরা।
রোনালদো এখন নিজের ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায়। তবে ৪১ বছর বয়সে এসেও নিজের গোল করার ক্ষুধা কিংবা দলের প্রতি দায়বদ্ধতায় এতটুকু ভাটা পড়তে দেননি তিনি। অন্যদিকে ইয়ামাল এখনো কিশোর। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই নিজের অসাধারণ গতি, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা ও ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য দিয়ে ফুটবলবিশ্বকে মুগ্ধ করছেন। ফলে এই লড়াই কেবল পর্তুগাল ও স্পেনের নয়, এটি অভিজ্ঞতা বনাম তারুণ্য, প্রতিষ্ঠিত কিংবদন্তি বনাম আগামী দিনের সম্ভাব্য মহাতারকারও লড়াই।
ম্যাচটি অবশ্য রোনালদো ও ইয়ামালের জন্য ভিন্ন বাস্তবতার। রোনালদো তার ক্যারিয়ারে অনেক কিছুই জয় করেছেন। শুধু একটি বিশ্বকাপ ট্রফি ছাড়া। বয়স বিবেচনায় অধরা ট্রফিটা ছুঁতে এটিই তার শেষ সুযোগ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিযোগিতার শুরুটা যদিও ভালো ছিল না তার। গ্রুপ পর্বে কঙ্গোর বিপক্ষে পয়েন্ট হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল পর্তুগাল। যে ম্যাচে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন রোনালদো।
এরপর তো চারদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পর্তুগাল দলে রোনালদোর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে থাকে। তবে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে পরের ম্যাচেই ঘুরে দাঁড়ান রোনালদো। জোড়া গোলে দলকে বড় জয় এনে দিয়ে সব সমালোচনার জবাব নেন। নিজেই ঘোষণা করেন, ‘আমি ফিরে এসেছি’। রোনালদো বিশ্বকাপ ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার কীর্তি গড়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলেও সর্বোচ্চ গোলের (২৩২ ম্যাচে ১৪৬ গোল) মালিক তিনি।
এবারের আসরে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচে ৩ গোল করেছেন রোনালদো। সর্বশেষ রাউন্ড অব বত্রিশে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে স্পট কিক থেকে গোল করেন পর্তুগাল অধিনায়ক। ওই ম্যাচটিতে আবার রোনালদোর সঙ্গে লুকা মদ্রিচের দ্বৈরথ দেখতে মুখিয়ে ছিলেন সবাই। অবশ্য ওই দ্বৈরথটা অনেককে আবেগতাড়িত করেছে। কারণ রোনালদো ও মদ্রিচ একসময়ে রিয়াল মাদ্রিদে একসঙ্গে খেলেছেন। দুই বন্ধুর একজনের স্বপ্নযাত্রা থেমেছে দুজনের মুখোমুখি লড়াইয়ে। মদ্রিচ বিদায় নিয়েছেন। টিকে গেছেন রোনালদো। টিকে গিয়ে আল-নাসর তারকা পড়েছেন লামিনে ইয়ামালের সামনে।
বার্সেলোনা তারকা ইয়ামাল নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে এগোচ্ছেন। নিজের দেশকে ১৬ বছর পর ট্রফির স্বাদ দিতে বেশ প্রত্যয়ী তিনি। মাত্রই চোটের ধাক্কা সামলে ওঠায় শুরুর দিকে ম্যাচ টাইম কম পেয়েছেন। তবে চার ম্যাচেই তাকে কমবেশি খেলিয়েছেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। একটি গোলও করেছেন ইয়ামাল। নকআউট পর্বে আসলে স্পেনের স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে এই তরুণ।
রাউন্ড অব বত্রিশে অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে নকআউট ম্যাচ জয়ের স্বাদ পেয়েছে স্পেন। ইউরো চ্যাম্পিয়নরা যাত্রাটা নিশ্চিতভাবেই আরও টানতে চায়। শিরোপার স্বপ্ন পূরণে এর বিকল্পও তো নেই। আবার নিজের ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিতে হলে রোনালদোকেও এই ম্যাচ জিততে হবে।
রোনালদো ও ইয়ামালের এই লড়াই অবশ্য প্রথম নয়। এর আগে ২০২৫ উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালেও মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা। নির্ধারিত সময় ২-২ গোলে শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে জয় পেয়ে শিরোপা জিতে নেয় পর্তুগাল। ওই ম্যাচে দলের হয়ে দ্বিতীয়ার্ধে সমতাসূচক গোল করেছিলেন রোনালদো। সেই ম্যাচটি বিবেচনায় নিয়ে আজকের ম্যাচটি স্পেন বা ইয়ামালের জন্য প্রতিশোধেরও।
নেশনস লিগের ওই ফাইনালের আগে ইয়ামালকে প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন রোনালদো, ‘লামিনে এক কথায় অসাধারণ প্রতিভা। আমি নিশ্চিত ও ভবিষ্যতে একাধিক ট্রফি জিতবে। একাধিক টুর্নামেন্ট জিতবে। ও দুর্দান্ত প্লেয়ার একজন।’
অন্যদিকে রোনালদোর প্রতি ইয়ামালের শ্রদ্ধাবোধ অতীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠেছে। স্পেনের শেষ ষোলো নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আলোচনায় ছিল পর্তুগাল। সেই সময়ই লামিনে ইয়ামালকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শেষ ষোলোতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি কী ভাবছেন? জবাবে তরুণ ফরোয়ার্ড বলেছিলেন, ‘শেষ ষোলোতে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মুখোমুখি? প্রতিপক্ষ পর্তুগাল হোক বা ক্রোয়েশিয়া, সেটা নিয়ে আমার ভাবনা নেই। তবে যদি রোনালদোর বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাই, সেটি অবশ্যই সম্মানের হবে।’
সঙ্গে সম্মানের এই লড়াইটা জেতার লক্ষ্যের কথাই বলেছিলেন ইয়ামাল। আসলে কী হবে? উত্তর জানতে অপেক্ষা আর কিছু সময়ের!