২০১০ সালের বর্ষাকাল, মাঠে মাঠে আমন ধানের চারাগুলো কুশি ছেড়ে সোমত্ত হয়ে উঠছে। খুলনার দৌলতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আমার দিনের পর দিন কাটে সেসব ধানখেতের পোকা দেখতে দেখতে। রোজই এক-দুবার চক্কর দিই। হঠাৎ একটা ছোট্ট কালো রঙের চকচকে বিটল চোখে পড়ল।
হাওয়ায় দোলা সবুজ পাতার ওপর তাকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুচকুচে কালো ডানা, আলো পড়ে ঠিকরে উঠছে, প্রায় গোলাকার সেই পোকাটি ছিল লেডিবার্ড বিটল, কালো রং, তাই তাকে বলা হয় কালো লেডিবার্ড বিটল। লেডিবার্ড বিটলদের রং আসলে লাল, কমলা বা হলুদ হয়। কিন্তু কালো কেন? আগ্রহের বশে সেখানে বসে একটা ছোটখাটো পর্যবেক্ষণের কাজেও নেমে পড়লাম যা আসলে গবেষকদের কাজ। কিন্তু আমার কৌতূহল ছিল, কত রকমের লেডি বিটল আসলে এ দেশে আছে, তা খুঁজে দেখা। যখনই কোনো এক প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল দেখতাম তখনই তার ছবি তুলতাম, রাতে রুমে বসে তার স্কেচ করতাম। যখন জানলাম যে, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল আছে তখন সে কাজের উৎসাহে ভাটা পড়ল। বাংলাদেশে কত প্রজাতির আছে, তা জানতে মনে হয় আমার জীবন পার হয়ে যাবে। সাকল্যে মাত্র ১২ প্রজাতির লেডিবার্ড বিটলের ছবি তুলে ও এঁকে সে যাত্রা ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। এ নিয়ে আর কখনো কাজে নামিনি।
গত ২০ জুন চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় চকবাজার থেকে কেবি আমান আলী রোড ধরে নুর বেগম জামে মসজিদ পেরিয়ে হজরত ভোলা শাহ (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বনজঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটি তিতবেগুন ও ফোস্কাবেগুনের গাছ চোখে পড়ল। সেসব গাছের পাতাতেই আবার এত বছর পর দেখতে পেলাম সেই কালো লেডিবার্ড বিটলকে। অন্য লেডিবার্ড বিটলের তুলনায় এদের খুব কমই দেখা যায়। এসব পোকা উত্তর আমেরিকায় বলে লেডিবাগ, যুক্তরাজ্যে বলে লেডিবার্ড। কীটতত্ত্ববিদদের কাছে এরা লেডিবার্ড বিটল বা লেডি বিটল নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে এ পোকাকে লেডি বিটল বলার কারণ হলো, সেখানকার সবচেয়ে সাধারণ একটি লেডি বিটলের চেহারার সঙ্গে সে দেশের একটি ছবিতে আঁকা একজন প্রাচীন রমণীর মিল ছিল। ছবিতে ছিল, সেই প্রাচীন রমণী একটা লাল আলখাল্লা পরে রয়েছেন যার ওপর রয়েছে কালো ফোঁটা। কক্সিনেলা সেপ্টেমপাংটাটা প্রজাতির লেডি বিটলও লাল, আর তার ডানায় রয়েছে সাতটি কালো ফোঁটা। অঙ্কিত সে ছবির প্রাচীন রমণীর পোশাকে ছিল ৭টি ফোঁটা, যা ছিল সাত রকমের আনন্দ ও দুঃখের প্রতীক। সে চিত্রকর্মের সঙ্গে এ প্রজাতির পোকাটির এরূপ সাযুজ্যই তাকে লেডি বিটল নামে পরিচিত করে তোলে। এ প্রজাতির লেডি বিটল এ দেশে সচরাচর দেখা যায়।
কালো লেডি বিটলের সাধারণ ইংরেজি নাম মালয়েশিয়ান লেডিবার্ড বিটল, প্রজাতিগত নাম Chilocorus nigrita ও গোত্র কক্সিনেলিডি। এ জন্য এ গোত্রের পোকাদের অনেকে কক্সিনেলিডি বিটলও বলে। জনৈক ড্যানিশ কীটতত্ত্ববিদ জোহান ক্রিস্টিয়ান ফেব্রিকাস ১৭৯৮ সালে প্রথম এ পোকার প্রজাতিগত নাম ও বিবরণ দেন। তখন এর প্রজাতিগত নাম ছিল Coccinella nigrita।
কালো লেডি বিটল গম্বুজের মতো গোলাকার বা ডিম্বাকার দেহের একটি ক্ষুদ্র পোকা। লেডি বিটলদের আকার মাত্র দশমিক ৮ থেকে ১৮ মিলিমিটার। তবে এর আকার বেশ ছোট, দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩.২ থেকে ৪ মিলিমিটার। চকচকে কালো শক্ত সামনের ডানাজোড়া পুরো দেহকে ঢেকে রাখে, এর তলেই থাকে পাতলা ঝিল্লির মতো দুটি পিছনের ডানা, ওড়ার সময় তা বের হয়। এরা দিনের বেলায় বিচরণ করে ও ওড়ে। প্রয়োজনে এরা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। খাদ্য বা প্রজননের জন্য কোনো কোনো লেডি বিটলের ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়ার রেকর্ড আছে। এমনকি এরা উড়তে উড়তে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচু পর্যন্ত যেতে পারে। এর ডিম মাকু আকৃতির, উজ্জ্বল হলুদ। এককভাবে বা গ্রুপে ২০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, বাচ্চা অবস্থায় থাকে ১২-১৮ দিন, এরপর পুত্তলি দশায় কাটায় ৫-৯ দিন। প্রাপ্তবয়স্ক পোকা বাঁচে ৪-৮ সপ্তাহ। এরা বছরে ৮-১০ বার বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
কালো লেডি বিটল একটি পরভোজী উপকারী পোকা। এরা গাছের বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা যেমন লাল খোস পোকা বা স্কেল ইনসেক্ট, সাদা মাছি, সাইলিড, জাব পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে একটি কালো লেডি বিটল তার সম্পূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড়ে ৫০০টির মতো ক্ষতিকর পোকা খেতে পারে। তাই গবেষক ও বালাই ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা ফসলের এসব বালাই নিয়ন্ত্রণে জৈবিক নিয়ন্ত্রক এজেন্ট বা জীব হিসেবে এর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেই এ পোকার উৎপত্তি। তাই এ পোকাটির ব্যবহারিক গুরুত্ব ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ আছে। বিশেষ করে গ্রিনহাউসে জন্মানো ফসলের কীট দমনে ইতোমধ্যে প্রতি ৫০ বর্গমিটারে মাত্র ৩০টি এই পোকা ছেড়ে সুফল পাওয়া গেছে।