ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে ইশতিয়াক আহম্মেদ প্রান্ত (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। গত ২১ জুন সকাল ৮টার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। অথচ ওই দিন ‘সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে’ তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়, যার কপি গতকাল (৫ জুলাই) সাংবাদিকদের হাতে আসে। সেখানে কিছু অসংগতি দেখা যায়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, তাকে ২০ জুন দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ইশতিয়াক নিজে ‘প্যান্টের ডান পকেট থেকে গাঁজা বের করে দেন’। অভিযান চালানো ডিবির এসআই আহাদুজ্জামান ‘চর্টলাইটের আলোর’ সাহায্যে জব্দ তালিকা তৈরি করেন। অথচ ইশতিয়াক আহম্মেদের গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, দিনের আলোয় পুলিশ তাকে আটক করছে। এ ছাড়া ইশতিয়াক তখন লুঙ্গি পরা ছিলেন। এমনকি ঘটনাস্থলে না থাকা ব্যক্তিদের জোর করে মামলায় সাক্ষী করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন রাত ২টা ১০ মিনিটে ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে আসামি (ইশতিয়াক) পালানোর চেষ্টা করেন। ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাকে ধরে ফেলেন। এ সময় এই মামলার সাক্ষী মধুখালী মরিচবাজার এলাকার বিনয় কুমার সাহা (৬২), সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার মৌতলা ইউনিয়নের পানিয়া গ্রামের বাসিন্দা (বর্তমান ঠিকানা: নূরুজ্জামান বোর্ডিং হাউস মধুখালী মরিচবাজার) আলমগীর হোসেন (৪২), ডিবির এএসআই হাজিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আসামি স্বীকার করেন তার হেফাজতে গাঁজা আছে। তখন তিনি (ইশতিয়াক) তার প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় ১০০ গ্রাম গাঁজা নিজ হাতে বের করে দেন।
এলাকাবাসী, ইশতিয়াকের স্বজন ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০ জুন শনিবার বিকেল ৫টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মধুখালী উপজেলার পশ্চিম গোন্দারদিয়া মহল্লায় ইশতিয়াকের বাড়ির সামনে থেকে ডিবি পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে আটক ও গাঁজা উদ্ধার করা নিয়ে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওর ফুটেজ নিশ্চিত করে, ঘটনাটি রাতের নয়, দিনের বেলার।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, পুলিশ ইশতিয়াককে থাপ্পড় দিচ্ছে। পুলিশ সদস্যরাই তার দেহ তল্লাশি করছেন। পরে ইশতিয়াকের পাশে একটি পড়ে থাকা বস্তু দেখে ডিবি সদস্যদের বলতে শোনা যায়, ‘এই যে এক পোটলা।’
মামলার সাক্ষী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মামলায় পুলিশ যে স্থানের কথা উল্লেখ করেছে, আমি সেখানে ছিলাম না। ২০ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আমি স্থানীয় বিনয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওই সময় দুই-তিনটি মোটরসাইকেলে করে তারা আসেন। তখন আমার পরিচয় জানতে চান। বাড়ির ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার লিপিবদ্ধ করেন। আমাকে বলেন, দুটো মোটরসাইকেল দেখেছেন কি না। আমি হ্যাঁ জবাব দিলে তারা একটি কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলেন। পরে আমি জানতে পারি আমাকে মাদক মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।’
আরেক সাক্ষী বিনয় সাহার মোবাইলে কল করা হলে তার ছেলে বাধন সাহা রিসিভ করেন। তিনি বলেন, ‘উল্লিখিত সময়ে আমার বাবা মরিচবাজারের ভেতরে এক কোনায় অবস্থিত একটি দোকানে ছিলেন। এটি ঘটনাস্থল থেকে বেশ দূরে। ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্তকে ধরেছে তার বাড়ির সামনে থেকে। আমাদের দোকান মরিচবাজারের ভেতরে। বাবা দোকানে ছিলেন, পরে পুলিশ আসে। পুলিশ বাবাকে সাক্ষী হতে বলে। বাবা স্বাক্ষর করতে রাজি হননি। একপর্যায়ে জোর করে কাগজে বাবার স্বাক্ষর নেওয়া হয়।’
গত ২৩ জুন দুপুরে এক অফিস আদেশে ফরিদপুর ডিবির তৎকালীন ওসি সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। তাই তার বক্তব্য জানা যায়নি। এ ছাড়া মামলার বাদী ডিবির এসআই মো. আহাদুজ্জামানের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মধুখালী থানার ওসি সুকদেব রায় বলেন, ‘গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ এজাহার লিখে দিয়েছে, আমরা তা গত ২১ জুন (শনিবার) সকাল সোয়া ৬টায় মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছি। এজাহারের ভাষায় আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তারা যেভাবে লিখেছে, সেভাবে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, প্রান্ত ফরিদপুর আইন কলেজের একজন শিক্ষার্থী ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন।