স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগটুকুও যেন মিলল না পর্তুগালের। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় জয় তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা বাঁচিয়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই উল্লাস বেশিক্ষণ স্থায়ী হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সামনে দাঁড়িয়ে ইউরোপের সবচেয়ে পরিণত, সবচেয়ে ধারাবাহিক দল স্পেন। এক বছর আগেই উয়েফা নেশন্স লিগের ফাইনালে লা রোজাদের হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ইউরোপের ব্রাজিল খ্যাত পর্তুগিজরা। সেই মধুর স্মৃতি সঙ্গী করে ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে ফেবারিট স্পেনের মুখোমুখি হচ্ছে সব সময়ের সমীহ জাগানিয়া দল পর্তুগাল। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে ম্যাচটি শুরু হবে আজ (৬ জুলাই) রাত ১টায়।
ডালাসে বিশ্বকাপের রাত শুধু স্পেন ও পর্তুগালের লড়াই নয়, এটি দুই প্রজন্মেরও মহারণ। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের নতুন বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল। শেষ ষোলোর এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে তাই দুই দলের লড়াইয়ের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে এই দুই তারকার ব্যক্তিগত দ্বৈরথও। রোনালদো মানেই বড় মঞ্চের মানুষ। ক্যারিয়ারের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারবার। বয়স বাড়লেও গোল করার ক্ষুধা, নেতৃত্ব দেওয়ার মানসিকতা এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা এখনো পর্তুগালের সবচেয়ে বড় ভরসা। নকআউট পর্বে তার অভিজ্ঞতাই হতে পারে পর্তুগালের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সে স্বাক্ষর রেখেছেন সি আর সেভেন।
অন্যদিকে মাত্র কিশোর বয়সেই লামিনে ইয়ামাল স্পেনের প্রাণভোমরায় পরিণত হয়েছেন। তার গতি, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার দক্ষতা ইতোমধ্যেই বিশ্ব ফুটবলের নজর কেড়েছে। বড় ম্যাচের চাপকে উপভোগ করাই যেন তার স্বভাব। তবে এবারের বিশ্বকাপে ইয়ামালকে ঠিক তার মতো চেনা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারেননি বার্সা সুপারস্টার। এটাই হয়তো পর্তুগালের জন্য ভয়ের! দেখা যাচ্ছে এই ম্যাচেই জ্বলে উঠলেন ইয়ামাল; আর পুড়ে ছারখার হয়ে গেল পর্তুগিজরা! ম্যাচটি তাই শুধু দুই দলের কৌশলের লড়াই নয়, দুই ভিন্ন দর্শনেরও লড়াই। একদিকে বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসন করা এক কিংবদন্তি, অন্যদিকে আগামী এক যুগের নেতৃত্ব দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা এক তরুণ প্রতিভা। রোনালদো যেখানে অভিজ্ঞতা দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবেন, সেখানে ইয়ামাল গতি ও সাহসী ফুটবলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে চাইবেন।
স্পেনের আক্রমণের বড় শক্তি ইয়ামালের ডান প্রান্তের দৌড়। অন্যদিকে পর্তুগাল রোনালদোর ফিনিশিং এবং বক্সের ভেতরের উপস্থিতির ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করবে। দুই দলের কৌশলও অনেকটাই আবর্তিত হবে এই দুই তারকাকে ঘিরে। একজনকে থামাতে পারলে যেমন প্রতিপক্ষ বড় সুবিধা পাবে, তেমনি একজন জ্বলে উঠলেই ম্যাচের ভাগ্য মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। বিশ্ব ফুটবল বহুবার দেখেছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে নেতৃত্বের পালাবদল। সেই ইতিহাসের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায় এখন ফুটবল বিশ্ব। রোনালদোর অভিজ্ঞতা নাকি ইয়ামালের তারুণ্যের ঝলক? শেষ পর্যন্ত কার হাসি ফুটবে তার উত্তর মিলবে ডালাসের সবুজ ঘাসেই।
কাগজে-কলমে পর্তুগাল নিঃসন্দেহে অন্যতম শক্তিশালী দল। রোনালদোর নেতৃত্বে প্রতিটি পজিশনেই রয়েছে বিশ্বমানের ফুটবলার। কিন্তু মাঠের গল্পটি একেবারেই ভিন্ন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে এক ম্যাচ ছাড়া কোথাও নিজেদের আসল শক্তির পরিচয় দিতে পারেনি তারা। অধিকাংশ ম্যাচেই প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর বদলে লড়াই করে কোনোমতে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছে। গ্রুপ পর্বে দুই ড্র করে কলম্বিয়ার পেছনে থেকে রানার্সআপ হওয়া, এরপর ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে বেঁচে যাওয়া। সবমিলিয়ে পর্তুগালের পারফরম্যান্সে প্রশ্নের সংখ্যা উত্তরকে ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে বিস্ময় জাগিয়েছে মাঝমাঠ। মৌসুমজুড়ে ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনহাদের কাছ থেকে যে নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতার প্রত্যাশা ছিল, তার খুব সামান্যই দেখা গেছে। মাঝমাঠের সেই নিস্তেজতা রক্ষণভাগকেও করেছে নড়বড়ে। পুরো দলের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন কেবল গোলরক্ষক দিয়াগো কোস্টা।
আক্রমণভাগেও আলোচনার কেন্দ্রে রোনালদো। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুই গোল করলেও অন্য ম্যাচগুলোতে তাকে অনেক সময় খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে বল জালে জড়িয়েও মিলিমিটারের অফসাইডে গোল হারিয়েছেন, পরে পেনাল্টি থেকে দলকে সমতায় ফিরিয়েছেন। তবু পুরো টুর্নামেন্টে তার প্রভাব প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই ফিকে। তবে পর্তুগালের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড় নন বরং পুরো দলের সমন্বয়। তারকাদের সমাবেশ থাকলেও সেই দলটি এখনো যেন একটি সত্যিকারের ইউনিট হয়ে উঠতে পারেনি। এত এত সমস্যা পরও স্পেনের বিপক্ষে ঐক্যের মালা গেঁথে জয়ের স্বপ্নই বুনছে পর্তুগিজরা।
অন্যদিকে প্রথম ম্যাচের ধাক্কা পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে নিজের চেনা রূপে ফিরেছে স্পেন। বলের দখল, নিখুঁত পাস, তীক্ষণ আক্রমণ আর আত্মবিশ্বাস; সবমিলিয়ে আবারও দেখা মিলছে ইউরোপের চ্যাম্পিয়নদের। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে অনায়াস জয়ের পর এখন স্পেনের সামনে আরও বড় পরীক্ষা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। বিশ্বকাপে অন্যতম ফেভারিট হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র স্পেনকে ঘিরে তৈরি করেছিল নানা প্রশ্ন। সেই সংশয় খুব বেশি দিন টেকেনি। দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে স্পেন জানিয়ে দেয়, তারা পথ হারায়নি। এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের পরিণত জয় তাদের গ্রুপসেরা করেই নকআউট পর্বে তুলে আনে। শেষ বত্রিশে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে যেন দেখা যায় পুরোনো স্পেনকে। ৩-০ গোলের সহজ জয়ে এক মুহূর্তের জন্যও প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফিরতে দেয়নি তারা। মিকেল ওইয়ারসাবালের জোড়া গোল আর পেদ্রো পররোর দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে স্পেনের জয় ছিল নিখুঁত এক শিল্পকর্মের মতো।
এই জয়ের পর স্পেনজুড়ে যেন ফিরে এসেছে পুরোনো উচ্ছ্বাস। দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোও প্রশংসায় ভাসিয়েছে দলটিকে। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার স্বপ্নে ছোটা স্পেন এখন টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল, সেটি বিশ্বকাপেও ধরে রেখেছে তারা। শুরুর দিকে লামিন ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের চোট কিছুটা দুশ্চিন্তা তৈরি করলেও এখন সেই মেঘ অনেকটাই কেটে গেছে। মিকেল ওইয়ারসাবাল ইতোমধ্যেই চার গোল করে দলের আক্রমণের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন। লামিন ইয়ামাল, পেদ্রো পররো ও অ্যালেক্স বায়েনাও গোল করে আক্রমণভাগকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছেন।
সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা অবশ্য স্পেনের সামগ্রিক খেলায়। বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত আক্রমণে ওঠা এবং প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার যে পরিচিত ফুটবল দর্শন, সেটিই আবার দেখা যাচ্ছে। তবে এবার অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় পাস করতে মুখিয়ে আছে স্পেনের সোনালি প্রজন্ম।
মুখোমুখি ও পরিসংখ্যান
ইউরোপের এই দুই প্রতিবেশী দেশের লড়াইকে বলা হয় ‘আইবেরিয়ান ডার্বি’।
১৯২১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ ইতিহাসে দুই দল সর্বমোট ৪১টি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে।
হেড টু হেড
মোট ম্যাচ: ৪১
স্পেনের জয়: ১৮
পর্তুগালের জয়: ৭
ড্র: ১৬
স্পেনের গোল: ৭৭
পর্তুগালের গোল: ৪৫
দুই দলের সবশেষ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২৫ সালের জুন মাসে উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে। যেখানে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় ২-২ গোলে সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে পর্তুগাল ৫-৪ ব্যবধানে জয়লাভ করে।
বিশ্বকাপে মুখোমুখি
ম্যাচ: ২
স্পেনের জয়: ১
পর্তুগালের জয়: ০
ড্র: ১
বিশ্বকাপের মূলপর্বে পর্তুগাল কখনো স্পেনকে হারাতে পারেনি
২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দুই দলের মধ্যকার ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে গণ্য করা হয়। রোমাঞ্চকর সেই ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হয়েছিল। ম্যাচে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করেছিলেন।