বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই লাতিন আমেরিকা আর ইউরোপের দাপট। এই দুই মহাদেশকে টপকে আর কোনো মহাদেশে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে প্রভাবশালী হতে পারেনি। বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি একবার ইউরোপে গেলে, আরেকবার যায় লাতিনে। সেই ১৯৩০ সাল থেকে শুরু। সর্বশেষ ২০২২ সাল পর্যন্ত এই ধারার ব্যত্যয় ঘটেনি। এবারও এর বাইরে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণই। কারণ ১৬ দল বাড়িয়ে ফিফা ৪৮ দল করলেও শেষ ষোলোতে ইউরোপ-লাতিনের বাইরে দেশ আছে উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডা, আফ্রিকার মরক্কো ও মিসর। এশিয়ার নেই কোনো প্রতিনিধি।
৩২ দল থেকে ৪৮ দলে উন্নীত হওয়া বিশ্বকাপে রাউন্ড বত্রিশ থেকে বিদায় ঘণ্টা বেজেছে এশিয়ার। গ্রুপ পর্বে ছিল ৯টি দেশ জাপান, কোরিয়া, ইরান, ইরাক, উজবেকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান ও অস্ট্রেলিয়া। রাউন্ড বত্রিশে জায়গা পায় শুধুমাত্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রথম গোল দিয়েও পরে ১-২ গোলে হার মানে জাপান। মিসরের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করার পর টাইব্রেকারে ২-৪ গোলে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়া। এর আগে তারা চারবার ২০০২, ২০১০, ২০১৮ ও ২০২২ সালে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। অস্ট্রেলিয়া এবারের আগে ২০০৬ ও ২০২২ সালে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল।
বিশ্বকাপে এশিয়ার সেরা সাফল্য ছিল ২০০২ সালের আসরে। দুই স্বাগতিকের এক দল হিসেবে কোরিয়া প্রথমবারের মতো সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। সেমিতে তারা জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায়। পরে স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও তারা তুরস্কের কাছে ২-৩ গোলে হেরে চতুর্থ হয়েছিল। এরপর তারা ২০১০ ও ২০২২ সালে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত যেতে পেরেছিল। কোরিয়ার আগে বিশ্বকাপের মঞ্চে এশিয়ার সেরা সাফল্য ছিল ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বে ইতালিকে পেছনে ফেলে উত্তর কোরিয়া এশিয়ার প্রথম দল হিসেবে নকআউট পর্বে সুযোগ করে নিয়েছিল। কোয়ার্টার ফাইনালে তারা ইউসেবিওর পর্তুগালের বিপক্ষে শুরুতেই ৩-০ গোলে এগিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু পরে ইউসেবিও একাই ৪ গোল করলে উত্তর কোরিয়া হার মানে ৫-৩ গোলে। এরপর নকআউট পর্বে দ্বিতীয় দল হিসেবে খেলার সুযোগ পায় সৌদি আরব। ১৯৯৪ সালে আসর বসেছিল যুক্তরাষ্ট্রে। ‘এফ’ গ্রুপে সৌদি আরব গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউট পর্বে উঠে আসে। নকআউট পর্বে সুইডেনের কাছে ১-৩ গোলে বিদায় নেয় সৌদি আরব।
এশিয়ার তুলনায় আফ্রিকার দেশগুলো বেশিবার নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু তাদের সাফল্যও এশিয়ার মতো সর্বোচ্চ সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলা। তাও সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। সেমিতে তারা ফ্রান্সের কাছে ০-২ গোলে হেরে যায়। স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও তারা জিততে পারেনি ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। ১-২ গোলে হেরে চতুর্থ হয়েছিল কোরিয়ার মতো। কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২) ও ঘানা (২০১০)। প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল নাইজেরিয়া খেলেছে তিনবার ১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০১৪ সালে। ২০১৪ সালে আলজেরিয়াও প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল।
এবারের আসরে আফ্রিকা থেকে অংশ নেয় ১০টি দেশ। রাউন্ড বত্রিশে উঠে আসে ৯টি। মরক্কো, মিসর, আলজেরিয়া, ঘানা, ডিআর কঙ্গো, কেপ ভার্দে, আফ্রিকা, আইভরিকোস্ট, সেনেগাল। বাদ পড়ে শুধুমাত্র তিউনিসিয়া। শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে আবার সাত দলই বিদায় নেয়। টিকে থেকে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয় মরক্কো ও মিসর। মরক্কো ইতোমধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। প্রি-কোয়ার্টারে তারা টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়েছে। তারা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে ৯ জুলাই দুর্ধর্ষ ফ্রান্সের বিপক্ষে। তাদেরও দাঁড়ি পড়ে যেতে পারে সেদিনই! প্রি-কোয়ার্টারে মিসর খেলবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আগামীকাল। দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মোহাম্মদ সালাহর মিসরের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। যেখানে টিকে থাকাই কঠিন।