খুব বেশি শট নয়, চোখ ধাঁধানো ফুটবলও নয়। তবু ম্যাচ শেষে হাসি ছিল মরক্কোর মুখেই। কারণ বড় দল হওয়ার পরিচয় সব সময় সৌন্দর্যে নয়, ফলাফলে। কানাডাকে হারিয়ে টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজিত থেকে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা আটলাস লায়ন্সরা এবার জানিয়ে দিল– তাদের স্বপ্ন শুধু ইতিহাস গড়া নয়, বিশ্বকাপ জেতাও।
প্রায় বছর ছুঁতে চলেছে মরক্কোর জয়ের অভ্যাস, যা তাদের নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ৩৪ ম্যাচ অপরাজেয় আফ্রিকার দেশটি। বিশ্বমঞ্চেই বিশ্বরেকর্ড ছোঁয়ার হাতছানি তাদের। আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজেয় থাকার ইতিহাস ইতালির দখলে। তালিকার দুইয়ে আর্জেন্টিনা (৩৬)। এক দলকে ছাড়িয়ে আরেক দলকে ছুঁয়ে ফেললে কিন্তু সেটা আর বিশ্বরেকর্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তখন হয়ে যাবে মরক্বোর বিশ্বজয়!
বিশ্বকাপে এখন কোয়ার্টার ফাইনালের দল মরক্কো। ৩-০ গোলের জয়ে তারা বিদায়ঘণ্টা বাজিয়েছে সহ-আয়োজক কানাডার। এখন কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল, তার পর ফাইনালে অপরাজেয় থাকলেই বাজিমাত। হ্যাঁ, তিন জয় হবে তিনবার এভারেস্ট জয়ের মতোই। যদিও কোনো কিছু অসম্ভব নয়। যে এভারেস্ট একটা সময় অজেয় মনে হতো, সেটাই এখন ৩২ বার জয় করার বিশ্বরেকর্ড নেপালি পর্বতারোহী শেরপার দখলে।
এখন মরক্কোর দরকার সাহসিক যাত্রা অব্যাহত রাখা, যার বীজ বপন হয়েছে গত আসরে। ২০২২ কাতার আসরে খেলেছে সেমিফাইনাল। সেবার স্বপ্নযাত্রায় তাদের রুখে দিয়েছিল ফ্রান্স। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এবার কোয়ার্টার ফাইনালে সেই ফ্রান্সের সামনেই আটলাস লায়ন্সরা। এবার তারা কি পারবের কিলিয়ান এমবাপ্পে-উসমান দেম্বেলের সঙ্গে?
প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক কানাডা ম্যাচে। আগেই বলা হয়েছে, হিউস্টনের ম্যাচটিতে মরক্কোর পারফরম্যান্স খুব একটা নান্দনিক ছিল না। তার পরও জয় আর রেকর্ডের পাতায় তারা। মাত্র ৫টি অনশট নিতে পারে দলটি, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ী কোনো দলের সর্বনিম্ন। এমনকি টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এই ম্যাচের প্রথমার্ধই ছিল প্রথম, যেখানে গোলের সুযোগের চেয়ে হলুদ (৬টি) কার্ডের সংখ্যা ছিল বেশি। তবু দিনশেষে জয় তুলে নিয়েছে মরক্কোই।
সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মরক্কো এখন টানা ৩৪ ম্যাচে অপরাজিত। যদিও এই রেকর্ডের মধ্যে ২০২৬ আফ্রিকা কাপ অব নেশন্সের ফাইনাল জয় নিয়ে কিছুটা আইনি বিতর্ক রয়েছে। সর্বশেষ তারা হেরেছিল ২০২৫ সালের আগস্টে, কেনিয়ার বিপক্ষে আফ্রিকান নেশন্স চ্যাম্পিয়নশিপে। কানাডার বিপক্ষে প্রথম ১৫ মিনিট বেশ চাপে ছিল মরক্কো। গোলরক্ষক বুনো দুর্দান্ত দুটি সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। তবে একবার ছন্দ খুঁজে পাওয়ার পর মরক্কো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কানাডার কোচ জেসি মার্শ ম্যাচের পর স্বীকার করেছেন, ‘মরক্কো কিছুটা নুইয়ে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভেঙে পড়েনি।’
দলের অধিনায়ক ও বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক আশরাফ হাকিমি ছিলেন অদম্য। অন্যদিকে, মিডফিল্ডার ব্রাহিম দিয়াজ দুই গোল করিয়েছেন, যা তাকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট (৪টি) করা আফ্রিকান খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি বলেন, ‘বিশ্বকাপে কঠিন মুহূর্ত আসবেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো আমরা আমাদের খেলার দর্শন পরিবর্তন করিনি। আমরা যখন সেরা ফর্মে থাকি না, তখন আমাদের আরও বেশি ধৈর্যশীল ও কৌশলী হতে হয়।’
কেন মরক্কো এখন শক্তিশালী?
মরক্কোর এই সাফল্যের পেছনে কোনো জাদুর কাঠি নেই, আছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ২০০৯ এবং ২০১৯ সালে রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের উদ্যোগে আধুনিক একাডেমি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ফুটবলে বড় বিনিয়োগ করা হয়েছিল। এই বিনিয়োগের কারণেই আজ আটলাস লায়ন্সরা আফ্রিকা মহাদেশের সেরা দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন লিগে খেলা মেধাবী খেলোয়াড়দের দলে টানার কৌশলও তাদের শক্তিশালী করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখনো পুরোপুরি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়নি মরক্কো। পরবর্তী রাউন্ডে ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। তবে তাদের শক্তিশালী রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দাবিদারে পরিণত করেছে। এবারের বিশ্বকাপে মরক্কোর লক্ষ্য কেবল অংশগ্রহণ নয়, বরং আফ্রিকান দেশ হিসেবে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার ইতিহাস গড়া। কোচ ওয়াহবির ভাষায়, ‘আমরা এখন আর কোনো চমক নই, আমরা একটি ফুটবল পরাশক্তি। এটি কেবল শুরুর যাত্রা মাত্র।’
বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মরক্কোর নকআউট পর্বে জয়ের সংখ্যা চারটি, যা আফ্রিকার বাকি সব দেশের সম্মিলিত জয়ের সমান। আর একটি জয় পেলেই ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলার কীর্তির পুনরাবৃত্তি করবে দলটি।
২০২২ সালে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার পর এবারও একই আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলেছে মরক্কো। কাতারে তাদের সাফল্যকে অনেকে বিস্ময় বলেছিলেন। কিন্তু চলমান বিশ্বকাপে তারা প্রমাণ করছে– এটি আর কোনো রূপকথা নয়, বরং পরিকল্পনা, ধারাবাহিকতা ও সামর্থ্যের বাস্তব প্রতিফলন।