বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেখানে শুধু দুটি দল নয়-মুখোমুখি দাঁড়ায় ইতিহাস, আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন। সিয়াটলের লুমেন ফিল্ডে ঠিক তেমনই এক লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শক্তিশালী দল বেলজিয়াম। জয় পেলে পুরস্কার হিসেবে মিলবে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। আর পরাজিত হলে এবারের জন্য থেমে যাবে বিশ্বকাপের পথচলা। শেষ ষোলোর ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৬টায়।
এবারের আসরের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এবার ইতিহাস নতুন করে লেখার সুযোগ। ২০০২ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ আটে ওঠার স্বপ্ন দেখছে তারা। যদিও বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাফল্য ১৯৩০ সালে। সে সময় তারা তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নকআউট পর্বের বাধা পেরোতে পারেনি মার্কিনিরা। ২০১০, ২০১৪ ও ২০২২-টানা তিন আসরেই শেষ ষোলোতে বিদায় নিতে হয় তাদের।
এবার অবশ্য প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্যারাগুয়ে ও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে আসর শুরু করে তারা। এরপর তুরস্কের বিপক্ষে হারলেও ‘ডি’ গ্রুপের সেরা হয়ে নকআউটে উঠে আসে। শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রি-কোয়ার্টারে জায়গা করে নিয়েছে মরিসিও পচেত্তিনোর দল। তবে এখন অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। কারণ, প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম পরিসংখ্যানেও অনেক এগিয়ে। দুই দলের আগের সাত দেখায় ছয়টিতেই জয় পেয়েছে রেড ডেভিলসরা। যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র জয়টি এসেছিল ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে। সর্বশেষ চলতি বছরের মার্চে প্রীতি ম্যাচেও বেলজিয়াম ৫-২ গোলের বড় জয় তুলে নিয়েছিল। ফলে আত্মবিশ্বাসের পাল্লা কিছুটা হলেও ইউরোপীয় দলটির দিকেই ঝুঁকে।
তবে এবারের আসরে এখন পর্যন্ত বেলজিয়ামের যাত্রাকে সহজ বলার উপায় নেই। যদিও ‘জি’ গ্রুপ থেকে সেরা হয়ে নকআউটে উঠে তারা। তবে মিসর ও ইরানের বিপক্ষে পয়েন্ট হারিয়ে একটা সময় পর্যন্ত প্রবল চাপে ছিল দলটি। পরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বড় জয়ে গ্রুপসেরা হয় তারা। শেষ বত্রিশে সেনেগালের বিপক্ষে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে রুডি গার্সিয়ার দল। ম্যাচের ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও রোমেলু লুকাকু ও ইউরি তিলেমানসের দ্রুত দুটি গোলে সমতায় ফেরে তারা। এরপর অতিরিক্ত সময়ের ১২০তম মিনিটে ইউরি তিলেমানসের স্পক টিকে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় নিশ্চিত করে দলটি।
আজকের লড়াইয়ের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে ফরোয়ার্ড ফলারিন বালোগুনের অনুপস্থিতি। বসনিয়ার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখায় তিন গোল করা এই স্ট্রাইকারকে নিষেধাজ্ঞার কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হবে। তার জায়গায় আক্রমণের দায়িত্ব নিতে পারেন রিকার্ডো পেপি। এ ছাড়া দলের ভরসা থাকবেন অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ, টাইলার অ্যাডামস ও সার্জিনিও ডেস্ট।
অন্যদিকে বেলজিয়ামের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর, লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড পুরোপুরি ফিট। মাঝমাঠে কেভিন ডি ব্রুইনে ও উইংয়ে জেরেমি ডোকুর গতি আবারও বড় অস্ত্র হতে পারে। অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু সম্ভবত শুরুতে বেঞ্চে থাকবেন, পরে ‘সুপার সাব’ হিসেবে মাঠে আসবেন। রক্ষণভাগে জেনো ডেবাস্টের খেলা এখনো অনিশ্চিত। স্বাগতিক সমর্থকদের গর্জনে লুমেন ফিল্ড নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি শক্তি জোগাবে। বেলজিয়ামের শক্তি নিজেদের অভিজ্ঞতা, আক্রমণভাগের বৈচিত্র্য এবং বড় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা।
প্রতিপক্ষকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোচ পচেত্তিনো বলেন, ‘স্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম হয় বড় সুযোগ থেকে। এখন আমাদের সামনে সেই সুযোগ। আমরা নিজেদের মাঠে খেলছি, সমর্থকদের বিশ্বাস অনুভব করছি। এই ম্যাচটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।’ দলটির ডিফেন্ডার সার্জিনো ডেস্ট বলেন, ‘আমরা জানি, বেলজিয়াম দারুণ দল। তাদের বিপক্ষে নিজেদের সেরাটা খেলতে হবে।’ বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া বলেন, ‘সেনেগালের বিপক্ষে আমরা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস হারাইনি। একটি গোল করার পরই ম্যাচের গতিপথ বদলে যায়। সেই মানসিক শক্তিই আমাদের এগিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষেও একই আত্মবিশ্বাস নিয়ে নামব।’ দলটির ডিফেন্ডার মাক্সিম ডি কিউপের বলেন, ‘প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে খেলতে। গত মার্চে ৫-২ গোলে জয় পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু সেই ফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। এখনকার যুক্তরাষ্ট্র অনেক ভালো দল।’
এই ম্যাচের বিজয়ী দল কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল ও স্পেন ম্যাচে জয়ী দলের মুখোমুখি হবে।