চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক ক্যানটিন সংস্কারে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ক্যানটিনটি সংস্কারের জন্য যে উন্নত মানের উপকরণ ও নির্মাণসামগ্রীর কথা উল্লেখ থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি।
জানা যায়, চবির আলাওল হল ও এ এফ রহমান হলের মাঝে অবস্থিত ক্যানটিনটি সংস্কারে বরাদ্দ করা হয়েছে ১৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাক্কলিত বরাদ্দের খরচ আর মূল কাজের খরচ ও মানে বিস্তর ফারাক রয়েছে। দেড় মাস আগে ক্যানটিন সংস্কারের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো পুরো কাজ শেষ হয়নি। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বরাদ্দ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় ১ হাজার ২০০ বর্গফুট ছাদের ঢালাইয়ের জন্য ২ টন রডের বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু ঠিকাদাররা জানান, এতে রড ব্যবহার করা হয়েছে অর্ধেকেরও কম। এ ভবনে ২ হাজার ৪৫ বর্গফুটের টাইলসের বরাদ্দ রাখা হলেও দেখা যায় ছাদের আয়তনই মাত্র ১ হাজার ২০০ বর্গফুট। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উল্লিখিত পরিমাণ টাইলস এখানে লাগানো হয়নি।
শুধু টাইলস বা রডেই নয়। দরজা, লাইট, সিভিল ওয়ার্ক, স্যানিটারি ওয়ার্ক, ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্ক–প্রতিটি কাজেই মিলেছে বরাদ্দের সঙ্গে গরমিলের তথ্য। জানা যায়, কার্যাদেশ অনুযায়ী ছয়টি তামার পানির ট্যাপ স্থাপনের জন্য ৫ হাজার ৯৩৪ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও অভিযোগ অনুযায়ী সেখানে প্রতিটি মাত্র ১০০ টাকা মূল্যের প্লাস্টিকের ট্যাপ ব্যবহার করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্প প্রকৌশলী রিয়াদ বলেন, ‘আমি তামার ট্যাপ লাগাতে নিষেধ করেছি। কারণ এগুলো চুরি হয়ে যায়।’
এ ছাড়া ড্রেনের পাইপের মুখে জালি লাগানোর জন্য ৩২৭ টাকা বরাদ্দ থাকলেও যে জালি ব্যবহার করা হয়েছে তার বাজারমূল্য ১০০ টাকার বেশি নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্যানটিনের রান্নাঘরে নতুন একটি কিচেন সিংক স্থাপনের জন্য বরাদ্দ থাকলেও সরেজমিনে কোনো সিংকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তিনটি আয়নার জন্য ৭ হাজার ৭০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও পাওয়া গেছে মাত্র একটি আয়না। একইভাবে কার্যাদেশে গ্লাস শেলফ স্থাপনের কথা থাকলেও তা লাগানো হয়নি।
ভবনের বাইরের দেয়ালে অ্যাক্রিলিক রং করার জন্য ৪৯ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হলেও অভিযোগ আছে সংস্কারকাজ শেষ না হতেই এখনি খসে পড়ছে রঙের আস্তর।
এসব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরে গেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং অভিযোগ অস্বীকার করেন। চাপের মুখে প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ কার্যাদেশ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সরবরাহ করেন। নথি দেওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনারা এগুলো বুঝবেন না। পরে ঠিকাদার এলে বুঝিয়ে দেবেন।’
এদিকে গত ৮ মার্চ প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকায় কাজটির টেন্ডার পায় হাফিজা এন্টারপ্রাইজ। কাজটির তদারকির দায়িত্ব পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তা এমদাদুল হক রিয়াদ, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আজমের ওপর এবং ইলেকট্রনিক কাজের তদারকিতে ছিলেন মোহাম্মদ মহসিন উদ্দীন।
হাফিজা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াদের সঙ্গে কথা বললে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কাজ বিলম্বের ব্যাখ্যা দেন। তবে নিম্নমানের কাজ তার অজ্ঞাতবশত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে আলাওল ও এফ রহমান হল সংসদের নির্বাচিত জিএস তামিম চৌধুরী ও নুরুন্নবী হাসান বলেন, কার্যাদেশে উল্লিখিত কাজের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল তারা পাননি। নথিতে যা উল্লেখ রয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন না হলে তারা এ ধরনের কাজ গ্রহণ করবেন না।
বন্ধ হয়ে থাকা ক্যানটিনের বিষয়ে আলাওল হলের প্রভোস্ট জামালুল আকবর চৌধুরী বলেন, ‘আমি সম্প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। যদি দুর্নীতির প্রমাণ পাই, তাহলে এ কাজের অর্থছাড়সংক্রান্ত নথিতে স্বাক্ষর করব না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা দুর্নীতির প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করি না। দুর্নীতির সামান্যতম প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে চবির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, ‘দুর্নীতির বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমি অবশ্যই এটি খতিয়ে দেখব। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১ জুলাই দুপুরে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে আলাওল হলের প্রভোস্ট ক্যানটিনটি খুলে দেন।