বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই যেন নতুন ইতিহাস লেখার মঞ্চ। একটি জয় স্বপ্নকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, আর একটি পরাজয় মুহূর্তেই শেষ করে দেয় দীর্ঘ প্রস্তুতি ও প্রত্যাশার সব গল্প। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি এবার সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়া। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের বিখ্যাত বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুই দল।
মুরাত ইয়াকিনের সুইজারল্যান্ড শুরুটা করেছিল কিছুটা হতাশাজনকভাবে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে কাতারের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র তাদের আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা দিয়েছিল। তবে এরপর যেন সম্পূর্ণ বদলে যায় সুইসদের চেহারা। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর সহ-স্বাগতিক কানাডাকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে গ্রুপ ‘বি’ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই নকআউটে ওঠে তারা।
শেষ বত্রিশের লড়াইয়েও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড। আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে তারা। বিশেষ করে তরুণ মিডফিল্ডার জোহান মানজাম্বি দারুণ ছন্দে রয়েছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই ব্রিল এম্বোলোর গোলটি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পাশাপাশি রুবিন ভার্গাসও আক্রমণে গতি ও সৃজনশীলতা এনে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছেন।
অন্যদিকে কলম্বিয়া বিশ্বকাপে এসেছে দুর্দান্ত ছন্দ নিয়ে। নেস্তর লরেঞ্জোর দল সর্বশেষ ছয় ম্যাচে পাঁচটি জয় পেয়েছে, একটি ম্যাচ ড্র করেছে। সেই ড্রটিও ছিল গ্রুপ পর্বে পর্তুগালের বিপক্ষে গোলশূন্য।
গ্রুপ ‘কে’ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে ওঠা কলম্বিয়া শেষ বত্রিশে ঘানাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলো নিশ্চিত করেছে। ম্যাচের শুরুতেই অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার জন কর্দোবা চোটে মাঠ ছাড়লেও দল ছন্দ হারায়নি। বদলি হিসেবে নেমে লুইস সুয়ারেজ জয়সূচক গোলের পাস বাড়িয়ে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছেন।
তবে কর্দোবার চোট কলম্বিয়ার জন্য বড় ধাক্কা। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপের বাকি অংশ থেকেই ছিটকে গেছেন তিনি। রক্ষণে দারুণ আত্মবিশ্বাসী কলম্বিয়া। টানা তিন ম্যাচে কোনো গোল হজম করেনি লাতিন আমেরিকার দলটি। এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মাত্র একবারই তাদের জালে বল জড়িয়েছে, সেটিও ছিল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে।
অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডও কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছে চোট নিয়ে। মিডফিল্ডার মিশেল এবিশার এবং ডিফেন্ডার লুকা ইয়াকেজ, দুজনই পেশির চোটে পুরো দলের সঙ্গে অনুশীলন করতে পারেননি। তারা খেলতে না পারলে মাঝমাঠে অধিনায়ক গ্রানিত জাকা ও রেমো ফ্রয়লার জুটির ওপরই ভরসা রাখবেন ইয়াকিন। আর রক্ষণে দায়িত্ব সামলাবেন ম্যানুয়েল আকাঞ্জি ও নিকো এলভেদি।
পরিসংখ্যান বলছে, দুই দলই নিজেদের সেরা সময় পার করছে। সুইজারল্যান্ড টানা তিনটি জয় নিয়ে মাঠে নামছে, আর কলম্বিয়া অপরাজিত ধারাবাহিকতার সঙ্গে রক্ষণে দেখিয়েছে অসাধারণ দৃঢ়তা। ফলে ভ্যাঙ্কুভারের এই লড়াইয়ে সামান্য ভুলও হয়ে উঠতে পারে বিদায়ের কারণ।
একদিকে সুইসদের শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল, অন্যদিকে কলম্বিয়ার গতিময় আক্রমণ ও আত্মবিশ্বাসী রক্ষণ- দুই ভিন্ন দর্শনের এই লড়াই তাই শেষ ষোলোর অন্যতম আকর্ষণীয় ম্যাচ হওয়ার সব উপাদানই বহন করছে। শেষ পর্যন্ত কারা শেষ আটের টিকিট নিশ্চিত করবে, তার উত্তর মিলবে ৯০ মিনিট কিংবা প্রয়োজন হলে তারও বেশি সময়ের কঠিন পরীক্ষার পর।
সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেছেন, তরুণ মিডফিল্ডার জোহান মানজাম্বি দলের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। দ্রুত ট্রানজিশন, সৃজনশীলতা এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার সক্ষমতার কারণে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছেন। তবে ইয়াকিন জোর দিয়েছেন দলগত পারফরম্যান্সের ওপর। তার ভাষায়, সুইজারল্যান্ডের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং সঠিক সময়ে সুযোগ কাজে লাগানো। আলজেরিয়ার বিপক্ষে জয়কে তিনি ‘পরিণত ও সংহত একটি পারফরম্যান্স’ বলে উল্লেখ করেন।
সুইজারল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রানিত জাকা বলেন, ‘ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলীয় সংহতিই সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা একটা দল হিসেবে খেলে সাফল্য নিয়ে আসব।’
কলম্বিয়ার কোচ নেস্তর লরেঞ্জো বলেন, নকআউট পর্বে ছোট ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর সেই লিড ধরে রাখার মানসিকতা ও শৃঙ্খলাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। তার মতে, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষেও একই মনোযোগ ও সংগঠিত ফুটবল খেলতে হবে।
কলম্বিয়ার অধিনায়ক হামেস রদ্রিগেস বলেন, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, এখানে ভুল করার সুযোগ নেই। একটা ভুল সবকিছু শেষ করে দিতে পারে। সতর্ক হয়েই লড়তে হবে।