বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, অন্য দেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে সেখানকার বাসিন্দা হতে হবে। তবে এটি সবসময় সত্যি নয়। যদিও অনেক দেশ শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়। তবে আরও কয়েকটি দেশ নির্দিষ্ট শর্তে পর্যটকদেরও এ সুযোগ দিয়ে থাকে।
পর্যটক হিসেবে এ প্রক্রিয়াটি সব সময় দ্রুত হয় না। সাধারণত পাসপোর্ট, বাড়ির ঠিকানার প্রমাণ এবং কর সংক্রান্ত তথ্যের মতো নথি সরবরাহ করতে হয়। কখনো কখনো কেন অ্যাকাউন্টটি প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যাও দিতে হতে পারে। তবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা অনেক ভ্রমণকারীর কল্পনার চেয়ে অনেক সহজ হতে পারে।
ভ্রমণকারীরা কেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন?
নিয়মিত ভ্রমণকারীরা প্রতিবার কেনাকাটার সময় মোটা অঙ্কের আন্তর্জাতিক কার্ড ফি দিয়ে থাকেন। তারা এ অতিরিক্ত ফি এড়াতে অ্যাকাউন্ট করে থাকেন। বিদেশে অবকাশ যাপনের জন্য কিছু ভ্রমণকারীর নিজস্ব বাড়ি থাকে, এ ছাড়াও ডিজিটাল নোম্যাড, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা যারা নিয়মিত বিভিন্ন দেশের মধ্যে যাতায়াত করেন, তারা অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন।
কারণ, স্থানীয় ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকলে নগদ টাকা তোলা, অর্থ স্থানান্তর করা এবং স্থানীয়দের মতো অর্থ পরিশোধ করাও অনেক সহজ হয়ে যায়।
সুইজারল্যান্ড, জর্জিয়া, পর্তুগাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো জনপ্রিয় গন্তব্যগুলো নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে বিদেশিদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা দিয়ে থাকে।
সুইজারল্যান্ড
যখন মানুষ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়ের কথা ভাবে, তখন সাধারণত সবার আগে সুইজারল্যান্ডের কথাই মনে আসে। দেশটি তার স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা এবং বিশ্বমানের ব্যাংকগুলোর জন্য বরাবরই পরিচিত। যদিও সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা আগের মতো সহজ নয়, তবুও অনেক ব্যাংক এখনও বিদেশি দর্শনার্থীসহ অনাবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়।
সুইস ব্যাংকগুলো বিস্তারিত পরিচয় এবং আর্থিক তথ্য যাচাই করে থাকে। কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য বেশ বড় অঙ্কের আমানতও চেয়ে থাকে এবং যারা সুইজারল্যান্ডে বাস করেন না, তাদের কাছ থেকে উচ্চ ফি নিয়ে থাকে।
জর্জিয়া
যদি এমন কোনো দেশ থাকে- যা ডিজিটাল নোম্যাড এবং দীর্ঘমেয়াদী ভ্রমণকারীদের মধ্যে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে, সেটি হলো জর্জিয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি বিদেশিদের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে তুলনামূলক সহজ করার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছে।
জর্জিয়ার বেশ কয়েকটি ব্যাংক অনাবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে, একটি বৈধ পাসপোর্টই প্রধান প্রয়োজনীয় নথি। আপনার জাতীয়তা এবং পছন্দের ব্যাংকের উপর নির্ভর করে, আপনার কাছে কয়েকটি অতিরিক্ত নথি চাওয়া হতে পারে বা একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার দিতে হতে পারে।
পর্তুগাল
পর্যটক, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং দ্বিতীয় বাড়ির মালিকদের (সেকেন্ড হোম) জন্য ইউরোপের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য পর্তুগাল। তাই অনেকেই স্বাভাবিকভাবে একটি স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সিদ্ধান্ত নেন। দেশটি অনাবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়, তবে অন্যান্য কিছু জায়গার তুলনায় আরও বেশি কাগজপত্র প্রয়োজন হবে।
পাসপোর্টের পাশাপাশি, ব্যাংকগুলো সাধারণত একটি পর্তুগিজ ট্যাক্স নম্বর, বাড়ির ঠিকানার প্রমাণ এবং আয় বা কর্মসংস্থান দেখানোর নথি চেয়ে থাকে। কেউ যদি নিয়মিত পর্তুগালে যান, তাহলে একটি অ্যাকাউন্ট খোলা তার সময় এবং অর্থ উভয়ই বাঁচাতে পারে।
সিঙ্গাপুর
বিশ্বজুড়ে অন্যতম নিরাপদ এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুর। এখানকার কিছু ব্যাংক অনাবাসীদেরও অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়। ব্যাংকের উপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয়তা ভিন্ন হয়। বেশিরভাগ ব্যাংকই পাসপোর্ট, অতিরিক্ত পরিচয়পত্র এবং কেনো অ্যাকাউন্টটি খুলতে চান সে সম্পর্কিত তথ্য চাইবে।
আবার কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ন্যূনতম আমানত চাইতে পারে অথবা আপনার আবেদন অনুমোদনের আগে আপনাকে কোনো শাখায় যেতে বলতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসেন এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে যদি তারা ব্যবসার জন্য প্রায়ই সেখানে ভ্রমণ করেন বা তাদের সম্পত্তি থাকে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক অনাবাসীদের সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়। এর জন্য পাসপোর্ট, একটি বৈধ ট্যুরিস্ট ভিসা বা প্রবেশের স্ট্যাম্প এবং সহায়ক আর্থিক নথিপত্রের প্রয়োজন হয়।
আবাসিক অ্যাকাউন্টের তুলনায় অনাবাসিক অ্যাকাউন্টগুলিতে প্রায়শই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, তবে এগুলো আপনাকে স্থানীয়ভাবে অর্থ রাখতে এবং অনেক দৈনন্দিন ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ দেয়।
পানামা
লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে একটি শক্তিশালী খ্যাতি অর্জন করেছে পানামা। এ কারণে বেশ কয়েকটি ব্যাংক বিদেশি দর্শনার্থীসহ অনাবাসীদের জন্য অ্যাকাউন্টের সুযোগ দেয়।
তবে এখানে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। ব্যাংকগুলো পাসপোর্ট, আয়ের প্রমাণ, ব্যাংকিং রেফারেন্স লেটার, পেশাগত রেফারেন্স এবং অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করে এমন নথিপত্র চেয়ে থাকে। ব্যাংকগুলো কঠোর আন্তর্জাতিক আর্থিক নিয়মকানুন অনুসরণ করে তাই এই যাচাই প্রক্রিয়াটি বিস্তারিত হয়।
কোনো দেশ পর্যটকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দিলেই যে সব ব্যাংক আপনার আবেদন গ্রহণ করতে বাধ্য, এমনটা নয়। প্রতিটি ব্যাংক তার নিজস্ব নিয়মকানুন তৈরি করে, এবং সেই নিয়মগুলো যেকোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। ভ্রমণের আগে, আপনি যে ব্যাংকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে সর্বশেষ নিয়মকানুনগুলো জেনে নিন।
[ডিজিটাল নোম্যাড: ডিজিটাল নোম্যাড হলেন সেই পেশাজীবী, যারা ল্যাপটপ এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ব্যবহার করে মুক্তভাবে ভ্রমণ করার পাশাপাশি অনলাইনে কাজ করেন। তারা কোনো নির্দিষ্ট অফিসে বা স্থায়ী ঠিকানায় আবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন দেশ, হোটেল বা কো-ওয়ার্কিং স্পেস থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন।]
থিওটোনিয়াস/অমিয়/