নব্বই দশকের কথা। তখন মফস্বল থেকে ঢাকার জাতীয় দৈনিকে এত সহজে খবর পাঠানো যেত না। তখন ল্যান্ডফোন ডিজিটাল ছিল না। এনালগ লাইনের রিসিভারের ডায়াল ঘুরাতে ঘুরাতে হাত ব্যথা হয়ে যেত, তারপরও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত না। তখনকার সাংবাদিকতা ছিল অত্যন্ত জটিল ও কঠিন কাজ। যে সময়ের কথা বলছি, তখন ফ্যাক্স, ই-মেইল আসেনি। মফস্বলের ফিচার নিউজ হাতে লিখে ডাক বিভাগের খোলা চিঠিতে এক টাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল। আর কারেন্ট নিউজ পাঠানো হতো টেলিফোনে। আমার এলাকার মফস্বলের সংবাদদাতাদের ফোনে নিউজ দেওয়ার জন্য পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেলা টেলিফোন অফিসে যেতে হতো।
সে সময় এনালগের একটি টেলিফোনের লাইন পেতে মানুষ দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে দ্বিধা করত না। তার অন্যতম কারণ হলো–এ অঞ্চলে প্রবাসীর সংখ্যা অনেক বেশি। চাহিদার তুলনা ল্যান্ডফোনের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। ঢাকায় তখন এক মিনিট কথা বলতে খরচ হতো ২০ টাকা। আবার দেশের অন্যান্য বিভাগ ও জেলায় খরচ ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা প্রতি মিনিট। এমন পরিস্থিতিতে ফোনে কারেন্ট নিউজ পাঠাতে গিয়ে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হতো। তবে জেলা টেলিফোন অফিসে যেতে পারলে তারা দয়াবশত বিশেষ ব্যবস্থায় নিউজ পাঠানোর ব্যবস্থাটুকু করে দিতেন। টেলিফোন অফিসের কর্ডের মাধ্যমে তারা সরাসরি ঢাকার টেলিফোন অফিসে লাইন সংযোগ করে তাদের মাধ্যমে পত্রিকার অফিসে লাইন দেওয়া হতো। তাতে সরাসরি লাইন পাওয়া যেত।
সে সময় টেলিফোন সংযোগের ডিমান্ড নোটে সরকারিভাবে খরচ হতো ৮ হাজার ৪০০ টাকা কিন্তু নেওয়া হতো দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। এত টাকা দিয়েও অনেক সময় ফোনের সংযোগ পাওয়া যেত না।
তবে হঠাৎ করেই শুনতে পেলাম এ অফিসে লাইন বাড়ানোর জন্য চীন থেকে ২০০ নতুন সংযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু সেখানে সংযোগের জন্য আবেদন পড়েছে কয়েক হাজার। তাই ২০০ লাইন এলেও সংযোগ পাওয়াটা ছিল অনিশ্চিত।
অল্প খরচে সংযোগের জন্য দেশের টেলিফোন সংসদীয় কমিটির সুপারিশ লাগবে। নইলে লাইন নিতে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হবে। এত টাকা কোথায় পাব? তবে সে সময় আমাদের ২ আসনের সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমেলী আপা হলেন টেলিফোন সংস্থার সংসদীয় বোর্ডের স্থায়ী সদস্য। তার সুপারিশের বদৌলতে একটি টেলিফোন লাইনের গর্বিত মালিক হলাম।
এবার আসা যাক আসল কথায়। লাইন সংযোগ পেয়ে এখন আর বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে আমাকে সংবাদ সংগ্রহ করতে হয় না। তখন জেলার কন্ট্রোল রুমে পুরো জেলার কোথায় কী ঘটছে তার সংবাদ চলে আসত। সেখান থেকেই মূলত আমরা সংবাদ পেতাম। এখন ঘরে বসেই তা পাচ্ছি। কিন্তু আমার ফোনে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে থাকে। একেকটা লাইন সংযোগে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা হওয়ায় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের কর্মকর্তারা নিয়মের অধিক পরিমাণে লাইন সংযোগ দিয়েছিলেন। তাতেই একজনের লাইনের কথা আরেকজনের লাইনে ঢুকে পড়ত। কারও গোপন কথাই আর গোপন থাকত না। তখন একটা লোকাল কলের মূল্য ছিল ২ টাকা। একবার ফোন করে লাইন না কাটা পর্যন্ত কথা বলা যেত। এ সুযোগই নিত কিছু প্রবাসীর স্ত্রী। রিক্তা নামের একটা মেয়ে প্রায়শই আমার লাইনে ঢুকে পড়ত। সে মেয়ে তার খালাতো ভাইয়ের জন্য পাগল। ফোনের সেই আকুতি এখন আমার কানে বাজে। সে হয়তো এখন নানি-দাদি হয়েছেন।
আরো পড়ুন: গাছের গায়ে যে কারণে সাদা রং দেওয়া হয়
ফোন অফিসের কয়েকজন পিয়ন ছিল যারা টেলিফোন অফিসের সুইচ রুম পাহারায় রাতে থাকতেন। তারাই সারা রাত মানুষের কথা আড়ি পেতে শুনতেন। অনেকের সঙ্গে আবার সখ্য পর্যন্ত গড়ে তুলতেন। কাউকে আবার ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা ঘটেছিল। এ নিয়ে টেলিফোনের অনেক বড় কর্মকর্তা পর্যন্ত সে জল গড়িয়েছিল। এখন যেমন একটি ছেলে বা মেয়ে একাধিকজনের সঙ্গে সম্পর্ক করে বেড়ায় সে সময়ও ফোনের ক্রসকানেকশনে শুনতে পেতাম একাধিক মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ঘটনা। প্রযুক্তির সুবিধা যেমন আছে তেমন দুর্ভাবনার বিষয়গুলোও এড়ানো যায় না। তাই মানুষের নৈতিকভাবে ভালো না হলে কেউ তাকে সংশোধন করতে পারে না।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার, মুন্সীগঞ্জ।
তারেক/
.jpg)