১৯২১ সালের ৮ জুলাই কুমিল্লা থেকে লাকসাম হয়ে প্রথমবার চাঁদপুরে এসেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। রাত কাটিয়েছিলেন শহরের তৎকালীন ডাকবাংলোতে। সেই ঐতিহাসিক সফরের ১০৫ বছর কেটে গেছে। অথচ কবির স্মৃতি সংরক্ষণে সেখানে কোনো স্মৃতিফলক বা প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মী ও গবেষকরা।
সাহিত্য গবেষকদের মতে, চাঁদপুরে আসা কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবনের শুরুর দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সে সময় তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন। চাঁদপুর সফরও ছিল সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
বর্তমানে চাঁদপুর শহরে জাতীয় কবির স্মৃতি বহন করে কেবল ‘কাজী নজরুল ইসলাম সড়ক’। একসময় তার সাহিত্য ও সংগীতচর্চা নিয়ে নজরুল গবেষণা পরিষদ এবং নজরুল সংগীত সম্মেলন পরিষদ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করত। তবে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন তাদের কার্যক্রম অনেকটাই কমে গেছে।
চাঁদপুরের গণমাধ্যমকর্মী মাইনুল ইসলাম জানান, কবি যে ডাকবাংলোতে ছিলেন, সেই সড়কটি তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই ডাকবাংলো থেকে কিছুটা পশ্চিমে রোটারি ভবনের সামনে নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত একটি বড় তথ্যফলক আছে। সেখানে তার চাঁদপুর সফরের সময়, অবস্থান ও নানা স্মৃতিরণাণমূলক তথ্য লেখা ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যফলকটির অর্ধেকের বেশি অংশ ছিঁড়ে যায় এবং লেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, এর ফলে নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব ও নজরুলের চাঁদপুর সফরের ইতিহাস জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এটি সংরক্ষণের কোনো পরিকল্পনা বা উদ্যোগ দেখা যায়নি।
স্থানীয় সাংবাদিক ও কবি ফরিদ হাসান নজরুলের এই সফর নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তিনি ‘কাজী নজরুল ইসলাম ও চাঁদপুর’ নামে একটি বইও প্রকাশ করেছেন। বইটিতে কবির সফর, অবস্থান ও চাঁদপুরের নানা ঐতিহাসিক তথ্য রয়েছে।
ফরিদ হাসান জানান, চাঁদপুরে কবির স্মৃতি বলতে এখন শুধু নজরুল সড়কটিই আছে। তিনি যখন এখানে আসেন, তখন সে সময়ের কোনো মানুষ তার সফরের তথ্য বা স্মৃতি সংরক্ষণ করে যাননি। ফরিদ হাসান তার গবেষণায় কবির সফরসঙ্গী মুজাফ্ফর আহমেদের একটি বর্ণনা পেয়েছেন। সেখানে
উল্লেখ আছে, নজরুল কুমিল্লা থেকে ট্রেনে চাঁদপুরে এসে ডাকবাংলোতে রাত কাটান এবং পরের দিন সকালে চলে যান।
চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির মহাপরিচালক অ্যাডভোকেট কবি রফিকুজ্জামান রণি বলেন, চাঁদপুরের কৃতী সন্তান ও ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে কবির খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সওগাত কার্যালয়ে তাদের সাহিত্য আড্ডার অনেক স্মৃতি আছে। তাই চাঁদপুরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা জাতীয় কবির নামে নামকরণ করলে তার স্মৃতি ধরে রাখতে সুবিধা হবে।
চাঁদপুর বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্রের আহ্বায়ক অভিনেতা শরীফ চৌধুরী বলেন, ‘স্মরণে রাখার মতো একটি সড়ক ছাড়া চাঁদপুরে আর কোনো স্থায়ী স্মারক নেই। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ডাকবাংলো এলাকায় একটি সুন্দর ম্যুরাল বা স্মৃতিফলক তৈরি করা দরকার। তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে যে জাতীয় কবি একসময় এই শহরে এসেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘চাঁদপুরের এমপি ও জেলা প্রশাসন আন্তরিক হলে একটি স্থায়ী স্মারক নির্মাণ করা সম্ভব। আমরা শুধু দিবসভিত্তিক আলোচনা নয়, দীর্ঘস্থায়ী সংরক্ষণমূলক উদ্যোগ দেখতে চাই।’
স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, কবি যে ডাকবাংলোতে ছিলেন সেখানে একটি স্মৃতিফলক ও তার সফরের ইতিহাস তুলে ধরে তথ্য বোর্ড নির্মাণ করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রতিবছর ৮ জুলাই সরকারি উদ্যোগে স্মরণসভার আয়োজন করা হলে নতুন প্রজন্ম চাঁদপুরের এই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শেখ মহিউদ্দিন রাসেল বলেন, ‘বিভিন্ন সূত্রে আমরা জেনেছি কাজী নজরুল ইসলাম চাঁদপুরে এসেছিলেন। সে সময়ের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোটি বর্তমান ডাকবাংলোর পশ্চিম পাশে ছিল। সেটি তখন কুমিল্লা জেলা পরিষদের অধীনে পরিচালিত হতো। তবে ওই সময়ের কোনো পরিদর্শন বই বা সরকারি নথিপত্র এখন আর সংরক্ষিত নেই।’