শরীয়তপুরের জাজিরায় আবর্জনার ভাগাড়ের কারণে একটি বিদ্যালয়ের পাঠদান চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ নাক চেপে, কেউ মুখে রুমাল ধরে ক্লাস করে। অবস্থা এতই ভয়াবহ যে, শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালা বন্ধ রেখে পাঠদান করাতে হয়। এতেও নিস্তার মেলে না। আবর্জনা পচা গন্ধে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। কেউ বমি করে, কারও ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিনদিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষকরা জানিয়েছেন, একাধিকবার নিষেধ করার পরও পার্শ্ববর্তী বাজারের ময়লা ফেলা বন্ধ করা যাচ্ছে না। সাইনবোর্ড টাঙানোর পরও স্থানীয়রা এখানে এসে মূত্রত্যাগ করে।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের কাজিরহাট ডুবিসায়বর বন্দর এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ডুবিসায়বর হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ছয়জন শিক্ষক ও ২৩৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কয়েক বছর পর থেকেই আশপাশে ও মাঠসংলগ্ন এলাকায় হাটের ময়লা-আবর্জনা ফেলা শুরু হয়। পরে চারদিকে প্রাচীর নির্মাণ করা হলেও বিদ্যালয়ের পেছনের অংশ স্থায়ী ভাগাড়ে পরিণত হয়। বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের এই দুর্গন্ধের মাঝেই ক্লাস করতে হয়। অনেক সময় দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র হয় যে, শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে শ্রেণিকক্ষের দরজা-জানালা বন্ধ রেখে পাঠদান করান।
তবে গরম বাড়লে রোদের তাপে আবর্জনা দ্রুত পচে যায়, তখন ক্লাসের দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও নিস্তার মেলে না। শিক্ষার্থীদের কেউ হাত দিয়ে নাক চেপে, কেউ রুমাল ব্যবহার করে ক্লাস করে। অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তাকে স্কুল ছেড়ে বাড়ি যেতে হয়। আবর্জনার গন্ধ শিক্ষার্থীদের পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও কমে কমছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দরজা-জানালা বন্ধ করে ক্লাস চলছে। অনেক শিক্ষার্থী জানালার পাশের বেঞ্চ এড়িয়ে অন্যগুলোতে বসে আছে। বিদ্যালয়ের পেছনে ‘প্রসাব করা নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড থাকলেও স্থানীয়রা তা মানেন না। একাধিক ব্যক্তিকে তখন মূত্রত্যাগ করতে দেখা যায়।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী জিসান বলে, ‘যখন জানালা খোলা থাকে তখন আমাদের ক্লাস করতে অনেক কষ্ট হয়। আশপাশের ও বাজারের মানুষ আমাদের বিদ্যালয়ের পাশে ময়লা ফেলেন। আমরা দুর্গন্ধের নাক চেপে ক্লাস করি। গন্ধের কারণে মাঝেমধ্যে আমাদের অনেক বমি হয়, মাথা ঘোরে।’
তাসফিয়া নামে আরেক শিক্ষার্থী বলে, ‘গন্ধের কারণে সবসময় দরজা-জানালা বন্ধ রাখতে হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। এমন দুর্গন্ধের কারণে আমাদের অনেক বন্ধু এই স্কুল ছেড়ে অন্য স্কুলে চলে গেছে। আমরা চাই এখান থেকে ময়লার ভাগাড়টি সরিয়ে নেওয়া হোক।’
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অস্বাস্থ্যকর এই পরিবেশে ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকদেরও প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তারা জানিয়েছেন, বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নবনীতা দাস বলেন, ‘ময়লার গন্ধে অনেক সময় ক্লাস নেওয়া যায় না। রোদ বা বৃষ্টির সময় দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যায়। আমরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও যেখানে এই পরিবেশ সহ্য করতে পারি না, সেখানে ছোট শিশুদের জন্য এটি কতটা ভয়াবহ, তা সহজেই বোঝা যায়। স্কুল থেকে দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।’
প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগে বলেন, ‘এই ভাগাড়ের কারণে শিক্ষার্থীরা শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে এখানে ভর্তি করাতে চান না। যারা অন্য স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য রাখেন না, তারাই বাধ্য হয়ে এখানে সন্তানদের পাঠান। বহুবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই পাইনি। দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।’
এ ব্যাপারে জাজিরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়টির দূষিত পরিবেশ শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর স্বার্থে দ্রুত ময়লার ভাগাড় সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব। উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাব।’
জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-ইমরান বলেন, ‘আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। যদি বাস্তব চিত্র এমন হয়, তাহলে এটি দুঃখজনক। আমি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’