রাজধানীর মুরগিটোলা মোড়ে জুতা চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। এতে আহত হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও আমার দেশ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিমন ইসলাম।
সোমবার (৬ জুলাই) মধ্যরাতে পুরান ঢাকার মুরগিটোলা মোড়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, জবির আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী কালন মিয়া আশরাফুল ও তার রুমমেট শাদমান মাহমুদ ডিস্টিলারি রোডের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন। বাসার পানির লাইন নষ্ট হলে বাড়ির মালিক স্থানীয় প্লাম্বার অপূর্ব হাসান রনি মাইকেলকে দিয়ে তা মেরামত করান। অভিযোগ অনুযায়ী, রাতে মাইকেল অতিরিক্ত ২০০ টাকা দাবি করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, তার পারিশ্রমিক আগেই বাড়িওয়ালাকে দেওয়া হয়েছে। পরে আশরাফুল বাসার সামনে রাখা নিজের জুতা খুঁজে না পেয়ে মাইকেলের কাছে জিজ্ঞাসা করতে গেলে মুরগিটোলা মোড়ে উভয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
এরপর স্থানীয় কয়েকজন সেখানে এসে আশরাফুল ও তার রুমমেটকে মারধর করেন। লোহার রিং দিয়ে আঘাতে আশরাফুলের চোখের নিচে গুরুতর জখম হয়। পরে তাকে আটকে রেখে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ শিক্ষার্থী মুরগিটোলা এলাকায় জড়ো হন। হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একটি বাসা ঘেরাও করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্তদের বের করে আনতে গেলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পুলিশের দাবি, কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের হেফাজত থেকে অভিযুক্তদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করা হয়।
আহত সাংবাদিক লিমন ইসলাম বলেন, আমি ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহের জন্য ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলাম। এ সময় এক পুলিশ সদস্য আমার ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সাংবাদিক এবং আমার দেশ পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিই। কিন্তু পরিচয় দেওয়ার পর তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকজন পুলিশ আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে নির্বিচারে লাঠিপেটা শুরু করে। আমি পিছু হটতে হটতে এক পর্যায়ে রাস্তায় পড়ে যাই। এরপরও তারা আমাকে ঘিরে গণহারে লাঠিচার্জ করতে থাকে। পরে কয়েকজন জবি শিক্ষার্থী এসে আমাকে তাদের হাত থেকে সরিয়ে নেয়। ততক্ষণে আমার নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করে। পরে সহপাঠীরা আমাকে ন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, আমার ফোনের তথ্য-উপাত্ত বা পুলিশি হামলার ভিডিও থাকতে পারে এই আশঙ্কা থেকেই হয়তো তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফোনের জায়গাতেই সজোরে আঘাত করেছে। এতে আমার মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ ভেঙে যায়।
সংঘর্ষের ঘটনার পর জবি শিক্ষার্থীরা পুলিশের লাঠিচার্জের প্রতিবাদে রাত আড়াইটার দিকে মুরগিটোলা মোড় অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।
ঘটনার পর প্লাম্বার অপূর্ব হাসান রনি মাইকেল ও আশিকুর রহমান আশিককে হেফাজতে নেয় পুলিশ। এছাড়াও ৭ জুলাই (মঙ্গলবার) ভোরে কালন মিয়া আশরাফুল বাদী হয়ে গেন্ডারিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩২৫, ৩৪২, ৩০৭, ৫০৬ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
এবিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. নাসির উদ্দীন বলেন, আমি খোঁজ নিয়েছি। শিক্ষার্থীরা পুলিশের কাছ থেকে অভিযুক্তদের ছিনিয়ে নিয়ে মারতে চাইলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিচার্জ করে এবং অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনে। আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডেমরা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মীর মুহসিন মাসুদ বলেন, কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের হেফাজত থেকে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই পুলিশকে লাঠিপেটা করতে হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মুজাহিদ বিল্লাহ/এসএন