টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ক্যাম্পাস কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ক্যাম্পাসজুড়ে জলাবদ্ধতা, প্রবল বাতাসে গাছ উপড়ে পড়া, অভ্যন্তরীণ সড়ক ধসে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৮ ও ৯ জুলাই সকল লেভেল ও টার্মের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল ও অভ্যন্তরীণ সড়কের পাশে বৃষ্টির পানি জমে রয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের মাঠ প্রায় সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সড়ক ও ফুটপাতের পার্থক্য বোঝার উপায় নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাচল করতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
এদিকে প্রবল বাতাসে উপাচার্য ভবনের সামনের একটি সড়কে বড় একটি গাছ উপড়ে পড়ে। এতে ওই পথে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং পুরো এলাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, টানা বর্ষণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন অভ্যন্তরীণ সড়কের একটি অংশ প্রায় দেড় ফুট দেবে গেছে। সড়কের নিচে থাকা কালভার্টের ওপর ধস নামায় ঝুঁকি এড়াতে ধসে পড়া অংশ বাঁশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে এবং রাতে সতর্কতার জন্য সেখানে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে ওই সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকাতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় শহর থেকে প্রতিদিন যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরাও পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি কমে যায়, কোথাও কোথাও যোগাযোগও বিঘ্নিত হয়। এর প্রভাব পড়ে ক্লাস ও পরীক্ষায়। নির্ধারিত সময়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন এবং বিভিন্ন বিভাগে উপস্থিতির হারও ছিল স্বাভাবিক দিনের তুলনায় অনেক কম।
পুরকৌশল বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দেবজিৎ দাস গুপ্ত বলেন, “শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসতে আজ অনেক কষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে থাকায় যাতায়াত অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন।”
পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, “সড়কটি আমাদের হলসংলগ্ন হওয়ায় এটি গুরুত্বপূর্ণ চলাচলের পথ। বিকল্প সড়ক দিয়ে যেতে হলে অনেকটা ঘুরে যেতে হয়। আমরা আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেবে।”
এদিকে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বুধবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ৮ ও ৯ জুলাই সকল বিভাগের সকল লেভেল ও টার্মের ক্লাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৭ জুলাই প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী লেভেল-১, টার্ম-২ পরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচি বহাল থাকবে। তবে অন্যান্য লেভেল ও টার্মের পরীক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নিজ উদ্যোগে গ্রহণ করবে।
স্থাপত্য বিভাগের দ্বিতীয় শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী চিরন্তন কুমার সরকার বলেন, “প্রশাসনের উচিত আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। আগ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিশেষ করে শহর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের এ বৃষ্টিতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়টি আমাদের জানালে সংশ্লিষ্ট ডিনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় একাডেমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। উপড়ে পড়া গাছটি আবহাওয়া অনুকূলে এলেই দ্রুত সরিয়ে ফেলা হবে।”
সড়ক ধসের বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে বড় ধরনের কাজ করতে হবে। এখন বৃষ্টির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। বৃষ্টি থামলে আগে দেখতে হবে কালভার্টের ভিত্তি ঠিক আছে কিনা। ভিত্তি অক্ষত থাকলে দ্রুত মাটি ভরাট করে সংস্কার করা যাবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন পরিকল্পনা নিতে হবে। যেহেতু এই সড়ক দিয়ে কয়েকটি ছাত্রাবাসের শিক্ষার্থীরা চলাচল করে, তাই দ্রুত সংস্কারের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।”
ছুটি বাড়ানোর সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “আবহাওয়া পরিস্থিতি একই রকম থাকলে ছুটি বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামীকাল কিংবা শুক্রবার থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগামী রোববার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালু হবে বলে আশা করছি।”
উল্লেখ্য, টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণে চুয়েট ক্যাম্পাসে জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত ক্ষতি ও যোগাযোগ বিঘ্নিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সাময়িকভাবে সকল ক্লাস স্থগিত করেছে।
ইবাদ হোসেন/এসএন