কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন পেয়ে আসা ইসরায়েলের প্রতি জনমতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকানদের ৩০ শতাংশ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ ধারণা আরও প্রবল, আর রিপাবলিকানদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ পরিচালিত জরিপটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের প্রায় তিন বছর পর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও প্রজন্মগত বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে।
জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক মনে করেন, গাজার যুদ্ধে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এ হার প্রায় অর্ধেক। মাত্র ২০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ইসরায়েল গণহত্যা চালায়নি। আর প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা বলেছেন, এ বিষয়ে মত দেওয়ার মতো যথেষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই।
মার্কিন ইহুদিদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩০ শতাংশ ইহুদি উত্তরদাতা বলেছেন, ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। তবে ৪৯ শতাংশ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইসরায়েল বরাবরই গাজায় গণহত্যা বা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন মেনেই হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিমান হামলার আগে বেসামরিক লোকজনকে সতর্ক করা, মানবিক সহায়তা প্রবেশে সহযোগিতা এবং লোকজনকে হামাসের মানবঢাল ব্যবহারের বিষয়টিও তারা তুলে ধরে।
ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানে বড় পরিবর্তন
জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলবিষয়ক অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে ৫৮ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ। নতুন জরিপে অংশ নেওয়া ইহুদি ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও ৫১ শতাংশ একই মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে ৬২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের যথেষ্ট সমর্থন দিচ্ছে না। ২০২৪ সালে এ হার ছিল ৪৯ শতাংশ। বিশেষ করে ৪৫ বছরের কম বয়সী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ফিলিস্তিনপন্থি মনোভাব বেশি থাকলেও বয়স্ক ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও একই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।
রিপাবলিকানদের অবস্থান তুলনামূলক স্থিতিশীল
রিপাবলিকানদের মাত্র ১৩ শতাংশ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে দেখছেন। তরুণ রিপাবলিকানদের মধ্যে এ মত তুলনামূলক বেশি। সামগ্রিকভাবে ৬০ শতাংশ রিপাবলিকান মনে করেন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সমর্থন ‘যথাযথ’। মাত্র ২০ শতাংশের মতো রিপাবলিকান মনে করেন, ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে।
তবে ২০২৪ সালের তুলনায় ইসরায়েলের প্রতি আরও বেশি সমর্থনের দাবি করা রিপাবলিকানদের হার ৩৯ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন কমছে
জরিপে আরও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নাগরিক এখনো ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সম্পর্কে নিশ্চিত মত দিতে পারেননি। যারা মতামত দিয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের প্রাথমিক সামরিক প্রতিক্রিয়াকে ন্যায্য বলে মনে করেন। চলমান সামরিক অভিযানকে অধিকাংশই সমর্থন করছেন না।
ইহুদি মার্কিনিদের প্রায় ৭৫ শতাংশ ইসরায়েলের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াকে সমর্থন করলেও চলমান অভিযানের ক্ষেত্রে সেই সমর্থন নেমে এসেছে প্রায় ৪০ শতাংশে।
নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তায় ধস
জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমেছে। মাত্র ২০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক তার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। বিপরীতে ৩৮ শতাংশ নেতিবাচক মত দিয়েছেন, আর ৪১ শতাংশ বলেছেন, মত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য তাদের কাছে নেই। নেতানিয়াহুর প্রতি ইহুদি মার্কিনিদের অসন্তোষ বেশি। প্রায় ৬০ শতাংশ তার বিষয়ে নেতিবাচক মত দিয়েছেন।
জোহরান মামদানির প্রতি ইতিবাচক অনেক ডেমোক্র্যাট
ইসরায়েলের কড়া সমালোচক নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি সম্পর্কে ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইতিবাচক মত প্রকাশ করেছেন। ২৮ শতাংশ নেতিবাচক মত দিয়েছেন এবং ৪৪ শতাংশ কোনো মত দেননি। ডেমোক্র্যাটদের প্রায় অর্ধেক মামদানির প্রতি ইতিবাচক, যেখানে মাত্র ১০ শতাংশের মতো তার বিষয়ে নেতিবাচক মত দিয়েছেন।
অগ্রাধিকার অর্থনীতি
জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক আমেরিকান ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে অধিকাংশ ভোটারের প্রধান উদ্বেগ অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি। অনেক উত্তরদাতার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের চেয়ে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল