যখন বন্যার কারণে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘটে, তখন ট্রেনই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে ওঠে। ১৯৯৮ সালে দেশব্যাপী টানা দীর্ঘ বন্যায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল ট্রেন। কিন্তু চট্টগ্রামে গত কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কক্সবাজারের সঙ্গে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পানির কারণে চট্টগ্রামে ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার ঘটনা নিকট অতীতে নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছে, এখানে মূল সমস্যা পানি নয়। রেললাইনে ব্যালাস্ট বা পাথর না থাকার কারণে ট্রেন চলাচল করতে পারছে না। পর্যাপ্ত পাথর না দেওয়ায় রেললাইন নড়বড়ে হয়ে গেছে। লোকোমাস্টাররা (চালক) আর ট্রেন চালাতে সাহস পাচ্ছেন না। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ষোলশহর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথের অনেক জায়গায় পাথর নেই। কোথাও কোথাও পাথর দিয়ে কোনো রকমে মাটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। যা এই রেলপথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ব্যালাস্ট বা পাথরের কাজ কী?
রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, রেললাইনের পাথর বা ব্যালাস্টের প্রধান কাজ হলো ট্রেনের ভার বহন করে তা স্লিপার থেকে মাটির নিচে সমানভাবে ছড়িয়ে দেয়। ট্রেনের ওজনে যাতে মাটি দেবে না যায়, সেজন্য স্লিপারের মাধ্যমে মাটির গভীরে ওজন সমানভাবে হয়ে যায়। পাথরের স্তর ট্রেনের ধাক্কা ও কম্পন শোষণ করার কারণে যাত্রা আরামদায়ক হয় এবং রেলের যন্ত্রাংশের ওপর চাপ কম পড়ে। পাথরের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির পানি সহজেই নিষ্কাশন হয়, আগাছা জন্মাতে পারে না। পাথরগুলো স্লিপারকে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে সঠিক অবস্থানে আটকে রাখে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথের মধ্যে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথ সংস্কারের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় রেলওয়ে কিংবা যাত্রীদের কোনো কাজে আসেনি। বরং পাথরের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া লাইন দিয়ে সঠিক গতিতে ট্রেন চালাতে পারছেন না চালকরা। এতে ট্রেনের গতি কমে যায়। যে কারণে যাত্রী ভোগান্তি চলছিল অনেক দিন ধরে। সর্বশেষ জলাবদ্ধতার কারণে গত মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের পর ঢাকা-কক্সবাজার দ্রুতগতির ট্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০২৩ সালের শেষার্ধে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথটি প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর এই রেলপথের অনুমোদিত গতিবেগ ছিল ৬০ কিলোমিটার। এর আগেও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকা খরচ করে সংস্কার করা হয়। যার অধিকাংশ টাকা খরচ হয় চট্টগ্রামের দোহাজারী অংশে। দুই দফা সংস্কারের পরও কাজের মান অত্যন্ত নিম্ন হওয়ায় ট্রেনের গতিবেগ নির্ধারণ করা হয় ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। যা ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রেনের গতির চেয়ে অনেক কম।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্টেশন মাস্টার ও লোকোমাস্টার খবরের কাগজকে জানান, রেললাইন নড়বড়ে হওয়ার কারণে এতদিন ধরে চট্টগ্রাম-ষোলশহর ও ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথে ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলছিল না। এখন বৃষ্টির কারণে একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। এর জন্য তারা প্রকৌশল বিভাগকেই দায়ী করেন। তারা জানান, রেলওয়েতে যত সংস্কার তত দুর্নীতি। সংস্কার কাজ করে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা খরচ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সেবার মান বাড়ে না। বরং ট্রেনের গতিবেগ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকিও।
পাথর বসানো এবং সংস্কার কাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম বলেন, সংস্কার কাজটি করা হয়েছে কোনোরকমে ট্রেন চলাচলের স্বার্থে। অনিয়মের বিষয় অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঠিকাদার যথাযথভাবে কাজ করেনি বলে তাকে জরিমানা করে কাজ বাতিল করা হয়েছে। পরে অবশ্য রেলওয়ের পক্ষ থেকে সেখানে সংস্কার কাজ করা হয়েছে। নতুন পাথর বসানো হয়েছে। তারপরও ব্যালাস্ট স্বাভাবিক রাখা যায় না। বর্তমানে ওই লাইনে পাঁচ ইঞ্চি ব্যালাস্ট রয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম অনুযায়ী ১০ ইঞ্চি পাথর থাকার কথা। অতীতে বন্যার সময় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ অন্যান্য এলাকায় ট্রেন যোগাযোগ স্বাভাবিক ছিল। এখন কেন নয়–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই লাইনে যে ট্রেন চলছে তা ৬ ইঞ্চি পানিতে চলতে পারবে। সেখানে পানি জমেছে দুই ফুট ৬ ইঞ্চি। পানি ৬ ইঞ্চির নিচে না নামলে ট্রেন চলাচল করতে পারবে না।
প্রধান প্রকৌশলী জানান, এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী ৪৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমান লাইনের পাশ দিয়েই এই লাইন হবে। তবে সেটি নির্মাণ হবে ৫ ফুট উঁচুতে। যাতে কোনো সময় অতিভারী বর্ষণ কিংবা জলাবদ্ধতার কারণে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেদিকটা মাথায় রেখেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বর্তমান দুর্ভোগের জন্য তিনি গত চার দশকের মধ্যে গত দুই দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাতকে দায়ী করে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে। যারা দুই দশক আগে বাড়ি করেছেন তাদের বাড়ির নিচতলা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ছে। তারা তো জানতেন না দুই দশক পরে এমন অবস্থা হবে।