চারটি গোল। চারটি মিস। ছয়টি বিশ্বকাপে পেনাল্টি স্পট থেকে লিওনেল মেসির পরিসংখ্যান এটা। আটলান্টায় শেষ ষোলোর ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পর এই পরিসংখ্যান নতুন এক মাত্রা পেয়েছে। মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়, যিনি একই আসরে টাইব্রেকারের বাইরে দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন। এর আগে কোনো খেলোয়াড়ই একটি বিশ্বকাপে নির্ধারিত সময়ে একটির বেশি পেনাল্টি মিস করেননি।
তবু শেষ পর্যন্ত এই দুই মিসের কোনোটিই আর্জেন্টিনার ক্ষতি করতে পারেনি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপপর্বে মেসি ১২তম মিনিটে একটি পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন, যা করলে ম্যাচের অচলাবস্থা ভাঙত। কিন্তু এর পরই তিনি দুটি গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে যান। মিসরের বিপক্ষেও একই চিত্র। নিকোলাস তাগলিয়াফিকো পেনাল্টি আদায় করার সময় আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সমতা ফেরানোর সুযোগ পান মেসি। কিন্তু পেনাল্টি মিস করেন। এর পরও তিনি ঘুরে দাঁড়ান। প্রথমে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে অ্যাসিস্ট করেন, পরে নিজেই সমতাসূচক গোল করেন। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে জিতে যায় আর্জেন্টিনা।
মেসির প্রতিভা এখোনা তার দুর্বলতাকে ছাপিয়ে যায়। কিন্তু কোনো একটি দুর্বলতা যদি বারবার ফিরে আসে, তা হলে এক সময় সেটি আর ব্যতিক্রম থাকে না; বরং এমন একটি ধারা হয়ে ওঠে, যার জন্য প্রতিপক্ষ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারে। এবারের বিশ্বকাপে তার দুটি পেনাল্টি মিসই প্রায় একই চিত্র অনুসরণ করেছে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ভিএআর পর্যালোচনার কারণে পেনাল্টি নেওয়ার আগে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল মেসিকে। কিন্তু নিজের পরিচিত স্টপ-স্টার্ট কৌশল বদলাননি তিনি। ছোট রান-আপ নেন, শেষ কয়েক কদমের আগে সামান্য থামেন এবং গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার আগে নড়বেন, এই অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু শ্লাগার নড়েননি। ফলে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং বল ডান দিকের পোস্টের বাইরে চলে যায়। আটলান্টায়ও প্রায় একই দৃশ্য দেখা যায়। আবারও ধীরগতির রান-আপ। আবারও দেরিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এবার মিসরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবেইর নিজের জায়গায় স্থির থাকেন, মেসির শটের জন্য অপেক্ষা করেন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বল ঠেকিয়ে দেন।
দুই ক্ষেত্রেই গোলরক্ষকরা সফল হন সঠিক অনুমান করে নয়, বরং মেসির খেলায় অংশ না নিয়ে। মেসির পেনাল্টি নেওয়ার ধরন এমনভাবে তৈরি, যাতে গোলরক্ষক যদি আগে ঝাঁপ দেন, তা হলে তিনি সেটার সুযোগ নিতে পারেন। কিন্তু এখন ক্রমেই প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকরা সেই ফাঁদে পা দিচ্ছেন না। এতে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে। মেসির পেনাল্টি মিস কি শুধু তার অনিশ্চয়তাপূর্ণ কৌশলের মূল্য, নাকি সেই অনিশ্চয়তাই এখন পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে গেছে?
পেনাল্টির অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য দ্বিতীয় সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। অপটার বিশ্লেষণে মেসির বিশ্বকাপে নেওয়া আটটি পেনাল্টি জনপ্রিয় সেই ধারণার চেয়ে ভিন্ন একটি গল্প বলছে যে তিনি ‘সব সময় ভিন্নভাবে শট নেন।’ তার সফল চারটি পেনাল্টির মধ্যে মাত্র একটি নিচু শটে তার পছন্দের কোণে গেছে। বাকি দুটি গোল, তিনটি সেভ হওয়া পেনাল্টি এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মিস করা শট– সবই প্রায় একই উচ্চতায় এবং গোলপোস্টের একই পাশে গেছে।
মেসি তার রান-আপ, শরীরের ভঙ্গি, এমনকি পায়ের কোন অংশ দিয়ে বল মারবেন, সেটিও বদলান। কিন্তু বলের শেষ গন্তব্য তার খ্যাতির তুলনায় অনেক কম বৈচিত্র্যময়। এমন এক সময়ে, যখন প্রতিটি প্রতিপক্ষের কাছে বিস্তারিত ভিডিও বিশ্লেষণ ও শটের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য থাকে, তখন এই প্রবণতা চিহ্নিত করা এবং তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আরও সহজ হয়ে যায়।
এবার তুলনা করা যাক হ্যারি কেইনের সঙ্গে। ইংল্যান্ড অধিনায়ক নিজের ক্যারিয়ারের ৮৭ শতাংশেরও বেশি পেনাল্টি সফলভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তার কৌশল অনেক সহজ। তিনি সাধারণত গোলরক্ষকের বিপরীত দিকে মাঝারি উচ্চতায় জোরালো শট নেন এবং তার শটের অবস্থানও বেশির ভাগ সময় একটি নির্দিষ্ট কোণেই যায়। কিন্তু কোথায় শট নেবেন, সেটি বদলানোর বদলে কেইন নিজের গতি, ছন্দ এবং শট নেওয়ার আগের রুটিন বদলে গোলরক্ষকদের বিভ্রান্ত করেন।
অন্যদিকে, মেসি প্রায় উল্টোটা করেন। তিনি কৌশল বদলান, কিন্তু বারবার একই জায়গা লক্ষ্য করেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো সময় নির্বাচন। কেইন বা জর্জিনহোর মতো পেনাল্টি শুটাররা অনেক সময় রেফারির বাঁশির পর গোলরক্ষকের নড়াচড়া দেখে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মেসি সাধারণত খুব দ্রুত নিজের শটের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। এতে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তনের সুযোগ কম থাকে এবং অনেক সময় তার উদ্দেশ্য পড়ে ফেলা সহজ হয়ে যায়।
ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবল মিলিয়ে মেসি ১৫০টি পেনাল্টির মধ্যে ১১৬টিতে সফল হয়েছেন। তার সাফল্যের হার প্রায় ৭৭ শতাংশ। সম্মানজনক হলেও, এলিট মানের পেনাল্টি শুটারদের সাফল্যের হারের তুলনায় এটি অনেক কম। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যে ক্যালেন্ডার বছরেই তিনি একটির বেশি পেনাল্টি নিয়েছেন, সেই প্রতিটি বছরেই অন্তত একটি পেনাল্টি মিস করেছেন। এই পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তোলে– মেসি এখনো কেন আর্জেন্টিনার প্রথম পছন্দের পেনাল্টি শুটার?
সবচেয়ে সহজ উত্তরটি বরাবরই একই। কারণ, তিনি লিওনেল মেসি। আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী। বিশ্বকাপজয়ী। এবং সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। সম্ভবত এ কারণেই ১২ গজ দূর থেকে শট নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা কখনো গুরুত্ব দিয়ে অন্য কোনো বিকল্প ভাবেনি। কিন্তু একই বিশ্বকাপে টাইব্রেকারের বাইরে দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম খেলোয়াড় হওয়ার পর, আর নকআউট পর্ব যত এগোচ্ছে ব্যবধানও যত সূক্ষ্ম হচ্ছে, তাতে লিওনেল স্কালোনিকে হয়তো একটি সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।
জুলিয়ান আলভারেজ হতে পারেন শক্তিশালী বিকল্প। আতলেতিকো মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড ক্যারিয়ারে নেওয়া ১৯টি পেনাল্টির মাত্র দুটি মিস করেছেন। নিজের ক্লাবের নির্ধারিত পেনাল্টি শুটারও তিনি। ১১টি স্পট-কিকের মধ্যে ১০টিতেই গোল করেছেন, যা ৯১ শতাংশ সাফল্যের হার। তবে এসবের কোনোটিই মেসির মহত্ত্বকে ছোট করে না। মূলত তার কারণেই আর্জেন্টিনা এখন কোয়ার্টার ফাইনালে। মিসরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পরও তিনি দলকে উদ্ধার করেছেন, যেমনটি করেছিলেন অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও।
এই দলে তার প্রভাব শুধু পেনাল্টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু সামনে যখন কোয়ার্টার ফাইনাল, সম্ভাব্য সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল অপেক্ষা করছে, তখন স্কালোনিকে অন্তত ভেবে দেখতে হবে– আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি এলে ১২ গজ দূর থেকে আর্জেন্টিনার কি ভিন্ন কোনো বিকল্পের প্রয়োজন আছে?