চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বাদামতল এলাকায় হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে আছেন সুভাষ চক্রবর্তী নামে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। অপেক্ষা করছেন বৃষ্টি কমে যাওয়ার। টানা বৃষ্টিতে তার বসতঘর হাঁটুপানিতে তলিয়ে গেছে। কথা হয় সুভাষ নামের সেই ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি। আলমারি, সোফা সব ডুবে গেছে। খাটের ওপর চেয়ার তুলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখেছি। রান্নাঘরের চুলাও পানির নিচে। রান্না করা যাচ্ছে না।
কিন্তু না খেয়ে তো থাকা যায় না। তাই চাল-ডাল নিয়ে প্রতিবেশীর ঘরে রান্না করছি।’ শুধু সুভাষ চক্রবর্তী নন, টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অতিবর্ষণের পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে জনজীবন।
বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আলিম বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পুরো এলাকায় দুর্ভোগ নেমে এসেছে। অনেকের বসতঘর ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। এমন টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পরিস্থিতি আগে খুব কমই দেখা গেছে।’ একই কথা বলেন জাহেদ নামের আরেক বাসিন্দা।
টানা বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি উঠেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, পৌর এলাকার নামার বাজার ডুবে গেছে। এতে সৈয়দপুর, মুরাদপুর ইউনিয়নের ১০-১২ গ্রামের হাজারও মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। এদিকে উপজেলার সৈয়দপুর, বারৈয়ারঢালা, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া এলাকার বিভিন্ন সড়কে ও বসতঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া সলিমপুর ইউনিয়নের লতিফপুর, ভাটিয়ারী ইউনিয়নের রেলস্টেশন এলাকা, সোনাইছড়ি ইউনিয়নের অন্তত তিনটি গ্রাম, কুমিরা ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম এবং পৌরসভার সোবহানবাগসহ কয়েকটি ওয়ার্ডে পানি উঠেছে। এদিকে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অতিবর্ষণের ফলে উপজেলার আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় চলাচলের একটি সড়ক ভেঙে পড়েছে। একই অবস্থা ভাটিয়ারী ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের জঙ্গল ভাটিয়ারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫২টি পরিবারের মধ্যে ১২০টিরও বেশি ঘরে পানি ঢুকেছে। প্রবল স্রোতের কারণে নিরাপদ স্থানে যেতে পারেননি এসব পরিবারের সদস্যরা। বাধ্য হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় কৃষকদের টংঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।
ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রহমত উল্লাহ বলেন, ‘জঙ্গল ভাটিয়ারী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় প্রতিবছরই ভারী বর্ষণে তাদের দুর্ভোগ হয়। পাহাড়ি ঢল নামলে ঘর ছেড়ে পাহাড়ের উঁচু স্থানে আশ্রয় নিতে হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য একটি বিদ্যালয় খোলা রাখা হয়েছে।’
সীতাকুণ্ড আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে গত রবিবার ৫৯ মিলিমিটার, সোমবার ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়।
সীতাকুণ্ড আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইমরান বলেন, ‘গত এক দিনে ১৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আরও এক দিন ভারী বৃষ্টি হতে পারে। আগামী শুক্রবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।’
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘একটানা বর্ষণের ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এক-দুই ঘণ্টা বৃষ্টি না হলে অধিকাংশ জায়গার পানি নেমে যাবে। কোথাও স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জঙ্গল সলিমপুরসহ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতিদের সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। এসব এলাকায় ত্রাণ সহায়তাও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’