আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচটি ছিল উত্তেজনা, নাটকীয়তা ও রোমাঞ্চে ভরা। আটলান্টায় বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে ৩-২ গোলে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের সার্বিক চিত্র বিবেচনা করলে বলতে হবে, মিসরও অসাধারণ ফুটবল খেলেছে। শেষ পর্যন্ত তারা জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই করেছে।
ফুটবলে অনেক সময় ভাগ্যও বড় ভূমিকা রাখে। এই ম্যাচে ভাগ্য ছিল আর্জেন্টিনার পক্ষে। নইলে ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় মিসরের জয় অসম্ভব কিছু ছিল না।
ইয়াসির ইব্রাহিমের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করেন। ওই মুহূর্তে কিছুটা মানসিক চাপে পড়ে যান আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে তার কিছুটা সময় লেগেছে। অন্যদিকে মিসর নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী দুর্দান্তভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে।
মোস্তাফা জিকোর গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মিসর। এর আগে জিকোর আরেকটি গোল বাতিল হয়। সেই গোলটি বহাল থাকলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। মিসরের জন্য সেটিই হতে পারত ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।
তবে মাত্র ১৩ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল করে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে আর্জেন্টিনা। এই কামব্যাকে মেসির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যদিও আমার মনে হয়েছে, পুরো ম্যাচে মেসির ফিটনেস শতভাগ ছিল না। শুরু থেকেই তাকে আক্রমণভাগের মাঝ বরাবর খেলতে দেখা গেছে। মাঝে মাঝে নিচে নেমে এসে বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমরা মেসির কাছ থেকে যে ধারাবাহিক ড্রিবলিং, গতির পরিবর্তন ও একক প্রচেষ্টায় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত, তা এ ম্যাচে খুব বেশি দেখা যায়নি।
মিসর যখন মাঝমাঠের সেই জায়গাগুলো কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়, তখন মেসি ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেন। আর সেখান থেকেই তিনি ধীরে ধীরে ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর প্রথম গোলের পেছনে মেসির অবদান ছিল। এরপর বক্সে ঢুকে লাউতারো মার্তিনেজকে দারুণ একটি সুযোগ তৈরি করে দেন, যদিও মার্তিনেজ সহজ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি।
পরবর্তীতে মেসি নিজেই একটি দুর্দান্ত ভলিতে গোল করেন। যদিও বলটি প্রতিপক্ষের গায়ে লেগে কিংবা গোলরক্ষকের স্পর্শে বাইরে চলে যেতে পারত, কিন্তু ভাগ্যও এ সময় মেসির সঙ্গে ছিল। আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলে লাউতারো মার্তিনেজের ক্রস এবং এনজো ফার্নান্দেজের হেড ছিল প্রশংসনীয়। দূরের পোস্ট লক্ষ্য করে নেওয়া সেই হেডে গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। তবে ওই সময় সালাহকে ফাউল করা হয়েছে বলে মিসরের পক্ষ থেকে দাবি ওঠে। রেফারি খেলা চালিয়ে গেলেও আমার মনে হয়, এখানে ভিএআর পর্যালোচনা করা উচিত ছিল। ভিএআর দেখে সিদ্ধান্ত নিলে বিতর্কের সুযোগ কমে যেত।
মিসরের একটি গোলও ভিএআর দেখে বাতিল করা হয়েছিল। সেটিতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ওপর ফাউলের বিষয়টি পরিষ্কার ছিল। তাই তৃতীয় গোলের সময়ও একই ধরনের প্রযুক্তিগত যাচাই হলে বিষয়টি আরও স্বচ্ছ হতো।
গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনা তুলনামূলক সহজেই জয় পেয়েছে। তবে শেষ বত্রিশের ম্যাচে কেপ ভার্দে তাদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তায় ঘুরে দাঁড়ায়।
মিসরের বিপক্ষেও আর্জেন্টিনাকে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যে দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে মনে হচ্ছে, দলটি অনেকটাই মেসিনির্ভর। মেসির উপস্থিতিই আর্জেন্টিনাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতা এনে দিচ্ছে। মেসি না থাকলে এই দলের আক্রমণভাগ কতটা কার্যকর থাকবে, সেটি বড় প্রশ্ন।
শেষ আটে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। কেপ ভার্দে ও মিসরের ম্যাচের তুলনায় এই লড়াই কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে মিসরের বিপক্ষে পাওয়া জয় আর্জেন্টিনাকে আত্মবিশ্বাস দেবে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে আর্জেন্টিনার জয় পাওয়াই প্রত্যাশিত।
লেখক: সাবেক ফুটবলার