ঢাকা ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
মিশরকে অন্যায়ভাবে হারানো হয়েছে: জোহরান মামদানী আবারও ইরানে একের পর এক মার্কিন হামলা স্পেনকে হারিয়ে চমক দেখাতে চান কর্তোয়া টানা বৃষ্টিতে চবিতে সব ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ বেনাপোল ইমিগ্রেশনে আটক ঝিনাইদহ স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি সোনারগাঁয় চেকপোস্টের সামনে ডাকাতি, ৩০ লাখ টাকার স্বর্ণ লুট চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে নিহতের পরিবারের পাশে চসিক মেয়র গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে ইসরায়েল, মনে করেন ৩০ শতাংশ মার্কিন ইহুদি ঘুষ নেওয়ার অপরাধে চীনা সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড ইউক্রেনের ড্রোন ঠেকাতে স্টারলিংকের সিগন্যাল জ্যাম করছে রাশিয়া ছোট সরালির কথা রামগতিতে পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু একই সময়ে দিনের আলোয় বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষ বন্ধু তুমি শত্রু তুমি বৈদ্যুতিক যান আমদানি ও উৎপাদনে নীতিমালা হচ্ছে চবিতে বিষধর সাপের দংশনের শিকার শিক্ষার্থী, জলাবদ্ধতায় ব্যাহত চিকিৎসা চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে সুফল মিলবে কবে? অশ্রুই মেসির জয়ের ভাষা সঞ্চয় লুট, শেষ হলো বাকপ্রতিবন্ধী ববির লড়াই এই আর্জেন্টিনা শুধুই মেসিনির্ভর দক্ষিণ আফ্রিকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, মেয়ে আহত টানা বর্ষণে যশোরে দুর্ভোগ বৃষ্টিতে বন্ধ ট্রেন, কক্সবাজার রেলপথের  সংস্কারের মান নিয়ে প্রশ্ন অজেয় ফ্রান্সের সামনে মরক্কো ফ্রান্সের বিপক্ষে কোনো চমক নয়: ওয়াহবি প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে সাজছে ঢামেক হাসপাতাল সীতাকুণ্ডে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জনজীবন বিপর্যস্ত ময়মনসিংহ নগরী: এত প্রকল্প, তবু কেন জলমগ্ন ‘আর্জেন্টিনা অজেয় নয়’ সুইস কোচের হুংকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর কঠোর হলেও ঘাটতির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

ছোট সরালির কথা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
ছোট সরালির কথা
ছবি: খবরের কাগজ

গত ৬ জুলাই আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার বিভাগের অধীন বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগারের ময়ূরশালার (ময়ূরের খাঁচা) পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটি কমলা দোয়েলের দেখা পেয়ে ওর পিছু নিলাম। তবে সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় ওর ছবি তুলতে পারলাম না। তাই রুমে ফিরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আবারও নিচে নামলাম। কিন্তু অনেক খুঁজেও পাখিটিকে পেলাম না। ওর খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে পাশের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের দিকে গেলাম। কিন্তু ওখানেও খুঁজে পেলাম না। 

মাঠ গবেষণাগারের পেছনে একটি ছোট পুকুর রয়েছে। হঠাৎই মনে হলো গত বছর ওখানে কয়েকটি বুনো হাঁস দেখেছিলাম। এবার ওরা আবার এসেছে কি না, দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। এক মিনিটের মধ্যে পুকুরের সামনে চলে এলাম। পুকুরের ঠিক মাঝখানে পোঁতা খুঁটি দুটিতে দুটি হাঁস বসে থাকতে দেখলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব ওদের কাছ থেকে আড়াল করে কয়েকটি ক্লিক করে চুপচাপ চলে এলাম। এবারও ওদের পুকুরে দেখতে পেয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেল। মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের পুকুর থেকে বেরিয়ে কমলা দোয়েলের খোঁজে আবারও ময়ূরশালার কাছে চলে এলাম।
 
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছোট পুকুরের খুঁটিতে বসা হাঁস দুটি আর কিছু নয়, এ দেশের পরিচিত বুনো হাঁস ছোট সরালি। প্রতিবছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, বাইক্কা বিলসহ অন্যান্য জায়গায় দেখি। তবে সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও তিন-চার বছর ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি। ছোট সরালি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন আবাসিক পাখি। এটি সরাল, শরাল, গেছো হাঁস বা সিঙ্গেল হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Lesser Whistling Duck, Lesser Tree Duck, Indian Whistling Duck বা Javan Whistling Duck। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের এই হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocygna javanica (ডেনড্রোসিগনা জাভানিকা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল হয়ে চীন ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এদের আবাস এলাকা বিস্তৃত।
 
ছোট সরালির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৪২ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০-৭৪ সেন্টিমিটার ও ওজন ৪৫০-৫০০ গ্রাম। একনজরে পালক কালচে-বাদামি ও ধূসরাভ। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির হলদে মাথার চাঁদি গাঢ় ধূসর-বাদামি। ঘাড়ের ওপরটা ধূসর-বাদামি। বাদামি গলাটি বড় সরালির চেয়ে খর্বাকার। পিঠে রয়েছে আঁশের মতো দাগ। ওড়ার পালক কালচে। ডানার অগ্রভাগ, কোমর ও লেজ-ঢাকনি উজ্জ্বল তামাটে। বগল হালকা হলদে। বুক, পেট ও তলপেট তামাটে। চোখের পাতা উজ্জ্বল হলুদ ও চোখ ফ্যাকাশে বাদামি। চঞ্চু কালচে-ধূসর। পা ও পায়ের পাতা হালকা নীলচে। আঙুলের পর্দা ও নখ কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের পালক অনুজ্জ্বল ও দেহতল ধূসরাভ-হলুদ। 

ওদের বিচরণক্ষেত্র হলো জলাভূমি, হাওর, বিল, পুকুর ও ধানখেত। সচরাচর বড় বড় ঝাঁকে থাকে। নিশাচর হাঁসগুলো রাতে জলমগ্ন জমিতে অল্প ডুব দিয়ে, হেঁটে বা সাঁতার কেটে আহার খোঁজে। জলজ আগাছা, শস্যদানা, মাছ, পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। দিনের বেলা গাছে, মাটিতে বা পানিতে বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়। শিস দিয়ে ‘হুই-হুয়ি--হুই-হুয়ি---’ স্বরে ডাকে।

জুন থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। এ সময় গাছের গর্ত, নলবন, উলুবন, খেতের আইল বা জলাসংলগ্ন ঘাসবনে বাসা বানায়। ৭ থেকে ১২টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। হাঁসা-হাঁসি উভয়ে মিলেই ডিমে তা দেয়। হাঁসি তা দিতে ব্যস্ত থাকলে হাঁসা বাসা পাহারা দেয়। ডিম ফোটে ২৪-২৫ দিনে। হাঁসা-হাঁসি উভয়েই ছানাদের লালনপালন করে ও পাহারা দেয়। ছানারা ৩৩-৩৫ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-৬ বছর।

ছোট সরালির কথা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৬ এএম
আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
ছোট সরালির কথা
ছবি: খবরের কাগজ

গত ৬ জুলাই আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার বিভাগের অধীন বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগারের ময়ূরশালার (ময়ূরের খাঁচা) পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটি কমলা দোয়েলের দেখা পেয়ে ওর পিছু নিলাম। তবে সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় ওর ছবি তুলতে পারলাম না। তাই রুমে ফিরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আবারও নিচে নামলাম। কিন্তু অনেক খুঁজেও পাখিটিকে পেলাম না। ওর খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে পাশের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের দিকে গেলাম। কিন্তু ওখানেও খুঁজে পেলাম না। 

মাঠ গবেষণাগারের পেছনে একটি ছোট পুকুর রয়েছে। হঠাৎই মনে হলো গত বছর ওখানে কয়েকটি বুনো হাঁস দেখেছিলাম। এবার ওরা আবার এসেছে কি না, দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। এক মিনিটের মধ্যে পুকুরের সামনে চলে এলাম। পুকুরের ঠিক মাঝখানে পোঁতা খুঁটি দুটিতে দুটি হাঁস বসে থাকতে দেখলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব ওদের কাছ থেকে আড়াল করে কয়েকটি ক্লিক করে চুপচাপ চলে এলাম। এবারও ওদের পুকুরে দেখতে পেয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেল। মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের পুকুর থেকে বেরিয়ে কমলা দোয়েলের খোঁজে আবারও ময়ূরশালার কাছে চলে এলাম।
 
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছোট পুকুরের খুঁটিতে বসা হাঁস দুটি আর কিছু নয়, এ দেশের পরিচিত বুনো হাঁস ছোট সরালি। প্রতিবছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, বাইক্কা বিলসহ অন্যান্য জায়গায় দেখি। তবে সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও তিন-চার বছর ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি। ছোট সরালি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন আবাসিক পাখি। এটি সরাল, শরাল, গেছো হাঁস বা সিঙ্গেল হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Lesser Whistling Duck, Lesser Tree Duck, Indian Whistling Duck বা Javan Whistling Duck। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের এই হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocygna javanica (ডেনড্রোসিগনা জাভানিকা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল হয়ে চীন ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এদের আবাস এলাকা বিস্তৃত।
 
ছোট সরালির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৪২ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০-৭৪ সেন্টিমিটার ও ওজন ৪৫০-৫০০ গ্রাম। একনজরে পালক কালচে-বাদামি ও ধূসরাভ। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির হলদে মাথার চাঁদি গাঢ় ধূসর-বাদামি। ঘাড়ের ওপরটা ধূসর-বাদামি। বাদামি গলাটি বড় সরালির চেয়ে খর্বাকার। পিঠে রয়েছে আঁশের মতো দাগ। ওড়ার পালক কালচে। ডানার অগ্রভাগ, কোমর ও লেজ-ঢাকনি উজ্জ্বল তামাটে। বগল হালকা হলদে। বুক, পেট ও তলপেট তামাটে। চোখের পাতা উজ্জ্বল হলুদ ও চোখ ফ্যাকাশে বাদামি। চঞ্চু কালচে-ধূসর। পা ও পায়ের পাতা হালকা নীলচে। আঙুলের পর্দা ও নখ কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের পালক অনুজ্জ্বল ও দেহতল ধূসরাভ-হলুদ। 

ওদের বিচরণক্ষেত্র হলো জলাভূমি, হাওর, বিল, পুকুর ও ধানখেত। সচরাচর বড় বড় ঝাঁকে থাকে। নিশাচর হাঁসগুলো রাতে জলমগ্ন জমিতে অল্প ডুব দিয়ে, হেঁটে বা সাঁতার কেটে আহার খোঁজে। জলজ আগাছা, শস্যদানা, মাছ, পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। দিনের বেলা গাছে, মাটিতে বা পানিতে বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়। শিস দিয়ে ‘হুই-হুয়ি--হুই-হুয়ি---’ স্বরে ডাকে।

জুন থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। এ সময় গাছের গর্ত, নলবন, উলুবন, খেতের আইল বা জলাসংলগ্ন ঘাসবনে বাসা বানায়। ৭ থেকে ১২টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। হাঁসা-হাঁসি উভয়ে মিলেই ডিমে তা দেয়। হাঁসি তা দিতে ব্যস্ত থাকলে হাঁসা বাসা পাহারা দেয়। ডিম ফোটে ২৪-২৫ দিনে। হাঁসা-হাঁসি উভয়েই ছানাদের লালনপালন করে ও পাহারা দেয়। ছানারা ৩৩-৩৫ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-৬ বছর।

রাতের রানিতে সেজেছে পেকুয়ার পাহাড়

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
রাতের রানিতে সেজেছে পেকুয়ার পাহাড়
ড্রাগন ফুল। ছবি: সংগৃহীত

দিনের আলোয় যাকে দেখে সাধারণ মনে হতে পারে, রাতের আঁধার নামতেই সে রূপ নেয় প্রকৃতির এক অপার্থিব বিস্ময়ে। সূর্য ডোবার পরপরই সবুজ ডালের বুকে ধীরে ধীরে মেলে ধরে ধবধবে সাদা পাপড়ি। রাত যত গভীর হয়, ততই বাড়তে থাকে তার মোহনীয়তা। আবার ভোরের প্রথম আলো ফোটার আগেই নিঃশব্দে ঝরে যায় তার সৌন্দর্যের আয়োজন। ক্ষণস্থায়ী অথচ মুগ্ধতায় ভরা এই ফুলের নাম ড্রাগন ফুল। যাকে অনেকেই ভালোবেসে ডাকেন ‘রাতের রানি’।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শীলখালী, টৈটং ও বারবাকিয়ার পাহাড়ি এলাকায় এখন যেন নেমে এসেছে সাদা ফুলের উৎসব। রাত নামলেই পাহাড়ের ঢালজুড়ে থাকা ড্রাগন বাগানগুলো ভরে উঠছে অসংখ্য সাদা ফুলে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে উঠেছে অসংখ্য আলোকমালা। প্রকৃতির এই ক্ষণিক অথচ অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও ছুটে আসছেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

ড্রাগন ফলের উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ফুল প্রকৃতির এক বিস্ময়কর রহস্যও বটে। পেকুয়া উপজেলা কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ আলম জানান, ড্রাগন ফুল সাধারণত সন্ধ্যার পর ফোটা শুরু করে এবং গভীর রাতে পূর্ণ বিকশিত হয়। প্রতিটি ফুল মাত্র একটি রাতের জন্য তার সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরাগায়নের কাজ সম্পন্ন হয়, যা পরবর্তীতে ফলে রূপ নেয়। ফলে ড্রাগন চাষিদের কাছে ফুল ফোটার এই রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয় চাষিদের ভাষায়, ড্রাগন ফুল কেবল ফলনের পূর্বাভাস নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য উপহার। ধবধবে সাদা পাপড়িতে মোড়া ফুলগুলো রাতের নিস্তব্ধতায় এমন এক আবহ তৈরি করে, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ক্ষণিকের জন্য ফুটলেও এই ফুলের সৌন্দর্য দীর্ঘদিন ধরে থেকে যায় দর্শনার্থীদের স্মৃতিতে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেকুয়ার পাহাড়ি এলাকায় ড্রাগন চাষের বিস্তার ঘটেছে। সেই সঙ্গে ড্রাগন ফুলের এই অনন্য সৌন্দর্যও হয়ে উঠেছে নতুন এক আকর্ষণ। রাতের অন্ধকারে সাদা ফুলে সেজে ওঠা পাহাড়ি বাগান যেন নীরবে জানিয়ে দেয় প্রকৃতির সবচেয়ে মোহনীয় সৌন্দর্যগুলো কখনো কখনো খুব অল্প সময়ের জন্যই ধরা দেয়, আর সেই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যই মানুষের মনে সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।

রকিবুল হাসান/রিফাত/

মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:২১ এএম
মায়াবী আভার বন পিটুনিয়া
কাচারিঘাটের নার্সারিতে গোলাপি বন পিটুনিয়া। ছবি: লেখক

প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর ও কষ্টসহিষ্ণু ফুল হলো বন পিটুনিয়া। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ruellia simplex, এটি Acanthaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ Mexican Petunia, Mexican Bluebell, Brittons Wild Petunia নামে পরিচিত। এর নামের সঙ্গে বিখ্যাত ‘পিটুনিয়া’ ফুলের মিল থাকলেও এটি কিন্তু প্রকৃত পিটুনিয়া নয়। কেবল ফুলের আকৃতিগত মিলের কারণে একে বন পিটুনিয়া বা মেক্সিকান পিটুনিয়া বলা হয়। এর চোখজুড়ানো বেগুনি, নীল বা গোলাপি আভা যেকোনো বাগানকে মুহূর্তেই সতেজ করে তোলে।

নামেই প্রকাশ পায় এর আদি নিবাস মেক্সিকো, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল এবং দক্ষিণ আমেরিকা। তবে এর চমৎকার অভিযোজনক্ষমতার কারণে এটি বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের বহু ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের গৃহকোণ, ছাদবাগান, সরকারি পার্ক এবং রাস্তার ডিভাইডারে এখন প্রায়ই এই ফুলের দেখা মেলে।

বন পিটুনিয়া বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এর কাণ্ড খাড়া এবং কিছুটা চৌকো আকৃতির হয়। কাণ্ডের রং গাঢ় সবুজ, তবে অনেক সময় এতে বেগুনি বা কালচে রঙের ছোঁয়া দেখা যায়।

এর পাতাগুলো ল্যান্সের মতো (Lance-shaped) লম্বাটে ও সূক্ষ্ম অগ্রভাগযুক্ত হয়। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ রঙের এবং কাণ্ডের বিপরীতমুখী জোড়ায় জোড়ায় বিন্যস্ত থাকে। পাতার শিরাগুলো বেশ স্পষ্ট। 

ডালের ডগায় বা পাতার কোণ থেকে এককভাবে বা থোকায় থোকায় ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা ফানেল বা মাইকের মতো। এর পাঁচটি নরম পাপড়ি থাকে। সাধারণত উজ্জ্বল বেগুনি বা নীলচে বেগুনি রঙের ফুল বেশি দেখা গেলেও এর কিছু প্রজাতিতে গোলাপি কিংবা সাদা রঙের ফুলও ফুটতে দেখা যায়। এই ফুলের একটি দারুণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি ফুল ফোটার পর মাত্র এক দিন বা কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। সাধারণত সকালে ফোটে এবং বিকেলের দিকে ঝরে যায়। তবে গাছটিতে প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণে নতুন ফুল ফোটে যে বাগান কখনোই ফুলশূন্য মনে হয় না। মে থেকে শরৎকাল পর্যন্ত এতে সবচেয়ে বেশি ফুল ফোটে।

বন পিটুনিয়া শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর কিছু বিশেষ পরিবেশগত ও ব্যবহারিক গুরুত্বও রয়েছে। কম যত্নে দারুণ ফলন পাওয়ায় আধুনিক ল্যান্ডস্কেপিং বা বাগান সাজানোর জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ। বর্ডার প্ল্যান্ট (সীমানা ঘেঁষে লাগানো গাছ) হিসেবে কিংবা দলবদ্ধভাবে লাগালে এটি দারুণ এক বেগুনি চাদরের আবহ তৈরি করে।
 
এই উদ্ভিদটি অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির। তীব্র খরা, প্রচণ্ড গরম কিংবা অতিরিক্ত আর্দ্রতা–সব ধরনের প্রতিকূল পরিবেশেই এটি বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এটি সহজে মানিয়ে নেয়। যারা বাগানে খুব বেশি সময় দিতে পারেন না, তাদের জন্য এটি দারুণ পছন্দ।

এর উজ্জ্বল রং এবং মিষ্টি মধু মৌমাছি, প্রজাপতি ও হামিং বার্ডের মতো পরাগায়নকারী পাখিদের ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। ফলে আশপাশের পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম সচল রাখতে এটি সাহায্য করে।

লোকজ চিকিৎসায় রুয়েলিয়া গণের কিছু উদ্ভিদের মূল ও পাতা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, প্রদাহ এবং শ্বাসকষ্ট উপশমে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে, তবে আধুনিক চিকিৎসায় এর ব্যবহার সীমিত।

বন পিটুনিয়ার একটি নেতিবাচক দিক হলো এর দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার ক্ষমতা। এর বীজ ক্যাপসুল ফেটে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্রুত নতুন চারা গজায়। আমেরিকার ফ্লোরিডায় একে আক্রমণাত্মক আগাছা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই বাগানে লাগানোর সময় এটি যেন চারপাশের দেশীয় উদ্ভিদকে গ্রাস না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। টবে বা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে চাষ করা এর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ।

কিছুটা আক্রমণাত্মক স্বভাব থাকা সত্ত্বেও সঠিক নিয়মনীতি ও ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বন পিটুনিয়াকে ঘরের সৌন্দর্যবর্ধনে চমৎকারভাবে ব্যবহার করা যায়। কম পরিশ্রমে দীর্ঘ সময় ধরে ফুলের মায়া উপভোগ করতে চাইলে বন পিটুনিয়ার জুড়ি মেলা ভার।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ 

কালো লেডিবার্ড বিটল

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
কালো লেডিবার্ড বিটল
চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকায় সম্প্রতি দেখা কালো লেডি বিটল। ছবি: লেখক

২০১০ সালের বর্ষাকাল, মাঠে মাঠে আমন ধানের চারাগুলো কুশি ছেড়ে সোমত্ত হয়ে উঠছে। খুলনার দৌলতপুর হর্টিকালচার সেন্টারে আমার দিনের পর দিন কাটে সেসব ধানখেতের পোকা দেখতে দেখতে। রোজই এক-দুবার চক্কর দিই। হঠাৎ একটা ছোট্ট কালো রঙের চকচকে বিটল চোখে পড়ল।

হাওয়ায় দোলা সবুজ পাতার ওপর তাকে বেশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুচকুচে কালো ডানা, আলো পড়ে ঠিকরে উঠছে, প্রায় গোলাকার সেই পোকাটি ছিল লেডিবার্ড বিটল, কালো রং, তাই তাকে বলা হয় কালো লেডিবার্ড বিটল। লেডিবার্ড বিটলদের রং আসলে লাল, কমলা বা হলুদ হয়। কিন্তু কালো কেন? আগ্রহের বশে সেখানে বসে একটা ছোটখাটো পর্যবেক্ষণের কাজেও নেমে পড়লাম যা আসলে গবেষকদের কাজ। কিন্তু আমার কৌতূহল ছিল, কত রকমের লেডি বিটল আসলে এ দেশে আছে, তা খুঁজে দেখা। যখনই কোনো এক প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল দেখতাম তখনই তার ছবি তুলতাম, রাতে রুমে বসে তার স্কেচ করতাম। যখন জানলাম যে, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজার প্রজাতির লেডিবার্ড বিটল আছে তখন সে কাজের উৎসাহে ভাটা পড়ল। বাংলাদেশে কত প্রজাতির আছে, তা জানতে মনে হয় আমার জীবন পার হয়ে যাবে। সাকল্যে মাত্র ১২ প্রজাতির লেডিবার্ড বিটলের ছবি তুলে ও এঁকে সে যাত্রা ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। এ নিয়ে আর কখনো কাজে নামিনি।

গত ২০ জুন চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় চকবাজার থেকে কেবি আমান আলী রোড ধরে নুর বেগম জামে মসজিদ পেরিয়ে হজরত ভোলা শাহ (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। বনজঙ্গল আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে কয়েকটি তিতবেগুন ও ফোস্কাবেগুনের গাছ চোখে পড়ল। সেসব গাছের পাতাতেই আবার এত বছর পর দেখতে পেলাম সেই কালো লেডিবার্ড বিটলকে। অন্য লেডিবার্ড বিটলের তুলনায় এদের খুব কমই দেখা যায়। এসব পোকা উত্তর আমেরিকায় বলে লেডিবাগ, যুক্তরাজ্যে বলে লেডিবার্ড। কীটতত্ত্ববিদদের কাছে এরা লেডিবার্ড বিটল বা লেডি বিটল নামে পরিচিত। যুক্তরাজ্যে এ পোকাকে লেডি বিটল বলার কারণ হলো, সেখানকার সবচেয়ে সাধারণ একটি লেডি বিটলের চেহারার সঙ্গে সে দেশের একটি ছবিতে আঁকা একজন প্রাচীন রমণীর মিল ছিল। ছবিতে ছিল, সেই প্রাচীন রমণী একটা লাল আলখাল্লা পরে রয়েছেন যার ওপর রয়েছে কালো ফোঁটা। কক্সিনেলা সেপ্টেমপাংটাটা প্রজাতির লেডি বিটলও লাল, আর তার ডানায় রয়েছে সাতটি কালো ফোঁটা। অঙ্কিত সে ছবির প্রাচীন রমণীর পোশাকে ছিল ৭টি ফোঁটা, যা ছিল সাত রকমের আনন্দ ও দুঃখের প্রতীক। সে চিত্রকর্মের সঙ্গে এ প্রজাতির পোকাটির এরূপ সাযুজ্যই তাকে লেডি বিটল নামে পরিচিত করে তোলে। এ প্রজাতির লেডি বিটল এ দেশে সচরাচর দেখা যায়। 

কালো লেডি বিটলের সাধারণ ইংরেজি নাম মালয়েশিয়ান লেডিবার্ড বিটল, প্রজাতিগত নাম Chilocorus nigrita  ও গোত্র কক্সিনেলিডি। এ জন্য এ গোত্রের পোকাদের অনেকে কক্সিনেলিডি বিটলও বলে। জনৈক ড্যানিশ কীটতত্ত্ববিদ জোহান ক্রিস্টিয়ান ফেব্রিকাস ১৭৯৮ সালে প্রথম এ পোকার প্রজাতিগত নাম ও বিবরণ দেন। তখন এর প্রজাতিগত নাম ছিল Coccinella nigrita। 

কালো লেডি বিটল গম্বুজের মতো গোলাকার বা ডিম্বাকার দেহের একটি ক্ষুদ্র পোকা। লেডি বিটলদের আকার মাত্র দশমিক ৮ থেকে ১৮ মিলিমিটার। তবে এর আকার বেশ ছোট, দেহের দৈর্ঘ্য মাত্র ৩.২ থেকে ৪ মিলিমিটার। চকচকে কালো শক্ত সামনের ডানাজোড়া পুরো দেহকে ঢেকে রাখে, এর তলেই থাকে পাতলা ঝিল্লির মতো দুটি পিছনের ডানা, ওড়ার সময় তা বের হয়। এরা দিনের বেলায় বিচরণ করে ও ওড়ে। প্রয়োজনে এরা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। খাদ্য বা প্রজননের জন্য কোনো কোনো লেডি বিটলের ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত যাওয়ার রেকর্ড আছে। এমনকি এরা উড়তে উড়তে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচু পর্যন্ত যেতে পারে। এর ডিম মাকু আকৃতির, উজ্জ্বল হলুদ। এককভাবে বা গ্রুপে ২০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, বাচ্চা অবস্থায় থাকে ১২-১৮ দিন, এরপর পুত্তলি দশায় কাটায় ৫-৯ দিন। প্রাপ্তবয়স্ক পোকা বাঁচে ৪-৮ সপ্তাহ। এরা বছরে ৮-১০ বার বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

কালো লেডি বিটল একটি পরভোজী উপকারী পোকা। এরা গাছের বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকা যেমন লাল খোস পোকা বা স্কেল ইনসেক্ট, সাদা মাছি, সাইলিড, জাব পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে একটি কালো লেডি বিটল তার সম্পূর্ণ বৃদ্ধি পর্যায়ে গড়ে ৫০০টির মতো ক্ষতিকর পোকা খেতে পারে। তাই গবেষক ও বালাই ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা ফসলের এসব বালাই নিয়ন্ত্রণে জৈবিক নিয়ন্ত্রক এজেন্ট বা জীব হিসেবে এর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন। ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেই এ পোকার উৎপত্তি। তাই এ পোকাটির ব্যবহারিক গুরুত্ব ও বংশবৃদ্ধি নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার সুযোগ আছে। বিশেষ করে গ্রিনহাউসে জন্মানো ফসলের কীট দমনে ইতোমধ্যে প্রতি ৫০ বর্গমিটারে মাত্র ৩০টি এই পোকা ছেড়ে সুফল পাওয়া গেছে।

উদাস করা বাবলা ফুল

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
উদাস করা বাবলা ফুল
বাগেরহাটের মোংলার কাছে পথের ধারে ফোটা বাবলা ফুল। ছবি: লেখক

‘বাবলা ফুলে নাক-ছাবি তার,
গায় শাড়ি নীল অপরাজিতার,
চলেছি সেই অজানিতার
উদাস পরশ পেতে।’

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘অ-কেজোর গান’-এর পঙ্‌ক্তিগুলো শুধু একটি ফুলের সৌন্দর্যের বর্ণনা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর মুগ্ধতার প্রকাশ। সেই একই মুগ্ধতা যেন আজও পথিকের মনে দোলা দেয়। খুলনা থেকে মোংলার পথে যেতে যেতে রাস্তার ধারে হলুদ বাবলা ফুলে সেজে থাকা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো কবির সেই ‘উদাস পরশ’ আজও বাতাসে ভেসে বেড়ায়। নজরুলের কল্পনার সেই বাবলা ফুল যেন বাস্তবের প্রকৃতিতেই আমাকে থামতে বাধ্য করল। দৃশ্যটা যেন কোনো জলরঙে আঁকা ছবি। রাস্তার ধারে বাবলা গাছগুলোর ডালপালায় যেন হলুদ হীরা মানিক জ্বলছে। প্রবল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সে রূপের আধার। তেঁতুল পাতার মতো চিরল চিরল পাতার ফাঁকে থোকায় থোকায় ফোটা ছোট্ট ছোট্ট কদমের মতো গোল গোল তুলির মতো ফুল, বাতাসে দুলে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পথিক ও মৌমাছিদের। গাছের ব্যাকগ্রাউন্ডে মাছের ঘের, দূরে গ্রামীণ বনভূমির কালচে-সবুজ প্রান্তরেখা। সে রেখা থেকে উঠে গেলে মেঘমাখা পাখিওড়া নীলাভ আকাশ।

মাছের ঘের পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানে থাকা একটা ছোট্ট মাচান ঘর, জলে তার ছায়া পড়েছে। এ দৃশ্য যেকোনো শিল্পীর কাছেই মনোমুগ্ধকর, ইজেল আর রঙতুলি নিয়ে বসে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হতেই পারে। মন ভরে সে দৃশ্য ও বাবলা ফুলের ছবি তুললাম। কিছু ছবি বাতাসের ধাক্কায় ডি-ফোকাসড হয়ে গেল। কিছুই করার নেই। সে কারণেই তার মধ্যেও যেন আমি এক প্রকৃতির সুমধুর সুরধ্বনি শুনতে পেলাম–বাবলা পাতায় তানপুরার তানের মতো বাতাসের শন শন শোঁ শোঁ সেই উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর। প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে শিল্পী, আলোকচিত্রী, সংগীতজ্ঞ থাকবে আর কবি থাকবে না, তা কী করে হয়? কবি কাজী নজরুল ইসলামও যেন বাবলা ফুলের সে আহ্বান শুনতে পেয়েছিলেন, উদাস হয়েছিলেন সে আমন্ত্রণে। বাবলা ফুলের সে সৌন্দর্যে হয়তো কোনো গ্রাম্য তরুণীও সেদিন মুগ্ধ হয়ে আবদার করেছিলেন কবির কাছে–‘কুস্মী রঙ শাড়ি, চুড়ি বেলোয়ারি/ কিনে দে হাট থেকে, এনে দে মাঠ থেকে/ বাবলা ফুল, আমের মুকুল, নৈলে রাঁধব না, বাঁধব না চুল\’ বাবলা ফুলকে না পেলে তার কেমন অভিমান হতে পারে তা অনুমান করা যায় নজরুলের এ গানে।

গ্রামের বনজঙ্গলে, রাস্তার ধারে, বাঁধের উপরে গ্রীষ্মের শেষ থেকে শরৎ পর্যন্তই বাবলা ফুলের এ শোভা দেখা যায়। শহরে এ শোভা বিরল। বাবলা ফুলের শুধু কি শোভাই আছে? প্রাচীন শাস্ত্র অথর্ববেদে বাবলার নাম বর্ব্বুর। সে গাছটি সম্পর্কে একটি সুক্তে বলা হয়েছে–‘বর্ব্বুর পৃথিবীর রস শোষণ করেই জন্মগ্রহণ করছে। অর্থাৎ মরুস্থলেও সে জন্মগ্রহণ করে। একে জলসেচ দিতে হয় না। এর রস পৃথিবীর জঠরাগ্নিকেও শোষণ করে। অত্যগ্নি তাপ ও বহুঋতুর আবির্ভাবেও স্তব্ধতা প্রাপ্ত হয়ে রস পান করে।’ জলসেচ না, এর নিজের রসই তাকে বাঁচিয়ে রাখে। খরা, শৈত্য, উষ্ণতা, লবণাক্ততা, ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা–সব প্রতিকূলতাকে জয় করে সে টিকে থাকে। কি বরেন্দ্রভূমি, কি মরুভূমি, কি উপকূলে নদীর পাড়, সব জায়গাতেই বাবলা যেন এক সর্বংসহা বৃক্ষ। 

আবার আত্মরক্ষায়ও বাবলা ওস্তাদ। চারা গাছগুলো যাতে ছাগল-গরু মুড়ে খেতে না পারে, সেজন্য খুব বেশি কাঁটা গজায়। কাঁটাগুলো আলপিনের মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাবলার কাঁটা আলপিনের মতো ব্যবহৃত হতো বলে শোনা যায়। এ গাছের অনেক ঔষধি গুণও আছে। বাবলার পঞ্চাঙ্গ (মূলের ছাল, গাছের ছাল, পাতা, ফুল ও ফল) একসঙ্গে নিয়ে তা আটগুণ পানিতে সিদ্ধ করে গলা পিচের মতো ঘনসার তৈরি করা হয় যা দাঁতের মাড়ি ফোলা, মচকা ব্যথা, প্রবল কাশি, প্রদর ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কাঠ খুব শক্ত, তাই লাঙল আর গরুর গাড়ির চাকাও তৈরি করা হয় বাবলা কাঠ দিয়ে। এ গাছ যে বন্ধ্যা মাটিতে জন্মে, গাছের গুণে ধীরে ধীরে সে মাটিও উর্বর হয়ে ওঠে।

বাবলা একটি বহুবর্ষজীবী দ্রুত বর্ধনশীল চিরসবুজ প্রকৃতির বৃক্ষ। গাছ ৫ থেকে ২০ মিটার লম্বা হয়। প্রচুর ডালপালা হয় ও তরুণ গাছের ডালপালা তীক্ষ্ণ কাঁটায় ভরা, বয়স্ক গাছের কাণ্ডে কাঁটা থাকে না। বাকল ধূসর ও অমসৃণ, কাঠ শক্ত। চিরুনির দাঁতের মতো পত্রকগুলো পত্রদণ্ডের দুপাশে সাজানো থাকে, ঘনভাবে পাতাগুলো থাকে। বসন্তে নতুন পাতা গজায় ও গ্রীষ্ম থেকে হেমন্ত পর্যন্ত ফুল ফোটে। গোলাকার ছোট্ট বলের মতো পুষ্পমঞ্জরিতে অসংখ্য ফুল ফোটে, রং হলুদ। ফল শিমের মতো, খোসার রং ধূসর-সাদা, রোমশ। ফলের ভেতর বীজ থাকে। বীজ থেকে চারা হয়। বাবলার ইংরেজি নাম থর্ন মাইমোসা ও ইজিপশিয়ান একাশিয়া। ইংরেজিতে একে কেউ কেউ বাবুলও বলেন। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Vachellia nilotica (পূর্ব নাম Acacia arabica, Acacia nilotica) ও গোত্র ফ্যাবেসি।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ