গত ৬ জুলাই আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার বিভাগের অধীন বন্যপ্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ গবেষণাগারের ময়ূরশালার (ময়ূরের খাঁচা) পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটি কমলা দোয়েলের দেখা পেয়ে ওর পিছু নিলাম। তবে সঙ্গে ক্যামেরা না থাকায় ওর ছবি তুলতে পারলাম না। তাই রুমে ফিরে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে আবারও নিচে নামলাম। কিন্তু অনেক খুঁজেও পাখিটিকে পেলাম না। ওর খোঁজে হাঁটতে হাঁটতে পাশের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের দিকে গেলাম। কিন্তু ওখানেও খুঁজে পেলাম না।
মাঠ গবেষণাগারের পেছনে একটি ছোট পুকুর রয়েছে। হঠাৎই মনে হলো গত বছর ওখানে কয়েকটি বুনো হাঁস দেখেছিলাম। এবার ওরা আবার এসেছে কি না, দেখা দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। এক মিনিটের মধ্যে পুকুরের সামনে চলে এলাম। পুকুরের ঠিক মাঝখানে পোঁতা খুঁটি দুটিতে দুটি হাঁস বসে থাকতে দেখলাম। নিজেকে যতটা সম্ভব ওদের কাছ থেকে আড়াল করে কয়েকটি ক্লিক করে চুপচাপ চলে এলাম। এবারও ওদের পুকুরে দেখতে পেয়ে মনটাই ভালো হয়ে গেল। মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ গবেষণাগারের পুকুর থেকে বেরিয়ে কমলা দোয়েলের খোঁজে আবারও ময়ূরশালার কাছে চলে এলাম।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছোট পুকুরের খুঁটিতে বসা হাঁস দুটি আর কিছু নয়, এ দেশের পরিচিত বুনো হাঁস ছোট সরালি। প্রতিবছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেক, বাইক্কা বিলসহ অন্যান্য জায়গায় দেখি। তবে সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও তিন-চার বছর ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি। ছোট সরালি এ দেশের বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন আবাসিক পাখি। এটি সরাল, শরাল, গেছো হাঁস বা সিঙ্গেল হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Lesser Whistling Duck, Lesser Tree Duck, Indian Whistling Duck বা Javan Whistling Duck। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের এই হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Dendrocygna javanica (ডেনড্রোসিগনা জাভানিকা)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল হয়ে চীন ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত এদের আবাস এলাকা বিস্তৃত।
ছোট সরালির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৮-৪২ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৭০-৭৪ সেন্টিমিটার ও ওজন ৪৫০-৫০০ গ্রাম। একনজরে পালক কালচে-বাদামি ও ধূসরাভ। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির হলদে মাথার চাঁদি গাঢ় ধূসর-বাদামি। ঘাড়ের ওপরটা ধূসর-বাদামি। বাদামি গলাটি বড় সরালির চেয়ে খর্বাকার। পিঠে রয়েছে আঁশের মতো দাগ। ওড়ার পালক কালচে। ডানার অগ্রভাগ, কোমর ও লেজ-ঢাকনি উজ্জ্বল তামাটে। বগল হালকা হলদে। বুক, পেট ও তলপেট তামাটে। চোখের পাতা উজ্জ্বল হলুদ ও চোখ ফ্যাকাশে বাদামি। চঞ্চু কালচে-ধূসর। পা ও পায়ের পাতা হালকা নীলচে। আঙুলের পর্দা ও নখ কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের পালক অনুজ্জ্বল ও দেহতল ধূসরাভ-হলুদ।
ওদের বিচরণক্ষেত্র হলো জলাভূমি, হাওর, বিল, পুকুর ও ধানখেত। সচরাচর বড় বড় ঝাঁকে থাকে। নিশাচর হাঁসগুলো রাতে জলমগ্ন জমিতে অল্প ডুব দিয়ে, হেঁটে বা সাঁতার কেটে আহার খোঁজে। জলজ আগাছা, শস্যদানা, মাছ, পোকামাকড় ইত্যাদি খায়। দিনের বেলা গাছে, মাটিতে বা পানিতে বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়। শিস দিয়ে ‘হুই-হুয়ি--হুই-হুয়ি---’ স্বরে ডাকে।
জুন থেকে অক্টোবর প্রজননকাল। এ সময় গাছের গর্ত, নলবন, উলুবন, খেতের আইল বা জলাসংলগ্ন ঘাসবনে বাসা বানায়। ৭ থেকে ১২টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। হাঁসা-হাঁসি উভয়ে মিলেই ডিমে তা দেয়। হাঁসি তা দিতে ব্যস্ত থাকলে হাঁসা বাসা পাহারা দেয়। ডিম ফোটে ২৪-২৫ দিনে। হাঁসা-হাঁসি উভয়েই ছানাদের লালনপালন করে ও পাহারা দেয়। ছানারা ৩৩-৩৫ দিনে উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল ৫-৬ বছর।